Skip to main content
Internet Archive's 25th Anniversary Logo

Full text of "Tridhara - 8th ed. ত্রিধারা - ৮ম সং"

See other formats


ত্রিধার]। ৯. 


শ্রীচন্দ্রনাথ বনু প্রণীত। 


. ঠ্রথম রঃ ২ 


71127 ০০ 


কলিকাতা, 
২*১নং কর্ণওয়াঁলিন্‌ সীট, বেঙ্গল মেডিকেল লাইব্রেরী হইতে 
শ্রীগুরুদাস চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত । 
২ নং গোয়াবাগান ্ট্ী, ভিক্টোরিয়া প্রেসে, 
শ্রীমণিমোহন রক্ষিত দারা! মুদ্রিত । 
দন ১২৯৭ নাল। 


মূল্য এক টাকা! মাত্র ॥ 


উৎসর্গ। 


যাছু! | 
তুমি পড়িবে বলিয়া! যে প্রবন্ধটি দিলাম দেই 
প্রবন্ধটি একবার পড়িও। আমি স্থুখী হইব । 
এখন কোথায় আছ ঠিক জানি না। যেখানেই 
থাক, আশীর্ববাদ করি এবার দীর্ঘজীবী হইও। 


«নং রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায়ের ই্রীট । 
১১ই মাঘ, ১২৯৭ সাল। 


কলিকাতা । ] 


সুচীপত্র। 


ডি না + 


ই: 2 রদ 94 
প্রথম ধারা। এ. 
অনন্ত মহ 7486 262 
পাখিটি কোথায় গেল? **, 2 নর ১০ 
ছায়া ,.. মে নি ১৬ 
বউ কথা কও ** ০ ২৭ 
দুইটি হিন্দু পড়ী হু 5 ৩৩ 
সুখের হাট ও সৌন্দর্যের মেলা ... ন ৪৫ 
ইন্ড্রিয়ের আকাঙ্কা .** ৪ ৪ রা 
দ্বিতীয় ধার! । 
কেতাব কীট ... রে ৬৭ 
শ্লেচ্ছ পণ্ডিতের কথা ২ ১০ ৭৩ 
জীবনের কথা ... ৮৩ 
তৃতীয় ধারা । 
সিদ্ধিদাতা গণেশ *** রি টুন ৯১ 
বাঙ্গালির প্রকুত কাঁজ ৯৭ 
ৰর্ণভেদ ও জাতীয় চরিত্র তত **:১%১ 
দেব-ধন্মী মানব টি রঃ ১১৬ 
গাপপুণ্য ১, তত ০ ০০১২৯ 
পরিশিষ্ট । 
জন্ত-ধন্মী মানব ১৪১ 








প্রথম ধারা। 


1 বধ 
ছিরে 


কালের গতি অবিরাম । কাল কেবল চলিতেছে । কবে 
কোথায় চলিতে আরম্ভ করিয়াছে কেহ জানে না, কেহ কহিতে 
পারে না। কিন্তু সকলেই দেখে চলিতেছে-কেবলই চলি- 
তেছে। আবার শুধু চলিতেছে ?--তীষণ বেগে চলিতেছে ! 

কাল চলিতেছে_সক্ষে সঙ্গে বিশ্বব্রক্মাণ্ড ঢলিতেছে_- 
অথবা বিশ্বত্রদ্ষাও সঙ্গে লইয়া কাল চলিতেছে। যেন কালের 
বেগে বেগপ্রাপ্ত হইয়া সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বত্হ্মাও ভীষণ বেগে চলি- 
তেছে! একবার যে এক জায়গায় ছুই দও দাঁড়াইয়া দেখিব 
কাল কেমন, বিশ্বত্রন্দাওড কেমন, তাহার যো নাই। দীড়াইব 
কেমন করিয়! আমিও যে কালের সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ বেগে 
চলিভেছি। কালের স্রোতে ভাপিতে ভাসিতে যাই, আর কত 
কি দেখি। কিন্তু হায়! এই মাত্র যাহা দেখিয়াছি তাহা আর 
দেখিতে গাই না-_কালের ভীবণ ভ্রোতে তাহা কোথায় চলিয় 
গেল দেখিতে পাই না, আমিই বা কোথায় চলিয়া আসিলাম 
বুঝিতে পারি না! অতএব কালও দেখিতে পাই না, কাল- 
আোতে প্রবাহিত বিশ্বব্ন্ষাণ্ডও দেখিতে পাই না! বড়ই ছুঃখ__ 
ক্ষোভের সীম! নাই ! 

কবি বলেন ক্ষোভ করিও না-তোমার মনের ছুঃখ ঘুচাইব। 
দেখ দেখি-- 


ত্রিধারা। 





পৃথিবীর এ মধ্য প্রদেশে _ ষথায় প্রকৃতির নমন্ত অনুরাগ 
ূ্ণমাত্ৰায় প্রস্টিত, গ্রজ্লিত--কেমন একটি ল্ুন্দর, স্বচ্ছ, 
জ্ুগভীর সরোবর পড়িয়া রহিকনাছে! সরোবরে তরঙ্গ নাই-, 
কেবল মাত্র উহার জল একটু উষ্ণ । উহা! এত গভীর, কিন্ত 
উহার তলদেশ পর্ধা্ত যেন চক্ষের নিকটেই পড়িয়া রহিয়াছে । 
উহার তলদেশে পাক কি কর্দম কি বালুকা কিছুই দৃষ্ট হয় 
না-দৃষ্ট হয় কেবল এ উচ্চ উষ্ণ আলোকময় দীপ্তিপূর্ণ সান্ধ্যা 
কাশের দিন্দুরসদৃশ ঘোরতর অন্থরাগ ।- ভ্রম হয়, এ সিন্দর- 
সম অনুরাগ আকাশে না সরোবরে । 

অমন অনেক দেখিয়াছ__কিন্ত এমন দেখিয়াছ কি 1-+ 

এ উচ্চ উষ্ণ সাদ্ধ্যাকাশের সি্দুররাগ ঘুচিয়া গিয়াছে 
যেখানে সিন্দ,ররাগ ছিল, সেখানে এখন মেঘরাশিতে যেন 
আগুন লাগিয়াছে_-ঝড়ে নেই জলভ্ত মেঘরাশি ভীষণভাবে 
ভীষণ বেগে ছুটাছুটি হুড়াছুড়ি মারামারি করিতেছে । কিন্ত সেই 
সুন্দর স্বচ্ছ সরোবর তেমনি স্থির_উহ্াতে একটি তরঙ্গ নাই, 
উহার জলের এতটুকু আন্দোলন নাই, উহার বারিরাশি যেন 
এ উন্মত্ত জলভ্ত মেঘরাশি বুকে করিয়া মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তেমনি 
নিঃশব ও নিষ্পন ! 

বল দেখি এ-তুফানের এই-সরোবর যে দেখে সে আর উহা 
ভুলিতে পারে কি-_পৃথিবী দেখিলে পৃথিবী আর উহা! ভুলিতে 
পারে কি-বিশ্বত্রক্মাগ্ড দেখিলে বিশ্বত্রন্মাওড আর উহা ভুলিতে 
পারেকি ?বল দেখি_ এ-তৃফানের এ-সরোবর যে দেখে,সে উহা 
অন্ত কাল দেখে কি না? বল দেখি, এই মুহুর্তের এই সরো- 
বর অনস্ত কাল কিন? বল দেখি- এই মুহূর্তে অনন্ত কাল 


অনস্ত মুহূর্ত । ৩ 


প্রবিষ্ট হইয়াছে কি না_-কালের অনস্ত আোত অবরুদ্ধ হইয়াছে 
কি না-যে কাল বিশ্বব্রন্মীকে লইয়া কেবলই চলে, সে কাল 
বিশ্বব্রক্ষাডকে ল্‌ইয়া একবার অনস্ত কাঁলের জন্য দ্াড়াইয়াছে 
কি না? বল দেখি-_এই মুহূর্ত অনস্ত মূহ্র্ত কি না? এখন শুন__ 
70850275972. 00031) (16163 120160) 19961697) 

10100 80000 1010 
40 00100002620) : 006 700. 8102]] 000159 21] অ০]1, 


0%9110, 410 2০: ৪01০ 06 009৮ ? 
7798 1010? 
0. 7/7151%11 %0% 79৫00 2০, ৫৪ %/0% ০৮01-[7296৭5. 
19৫069- [79 010 7006 ০21] 5100251১097 10) 0)6 10879: 
19 07975 01519107516 05 1074 800.085310 ? 
1728, 4 00096 90002] ০০০৩) 7 ০০] 0০ 79001 
0 20206 61300 100 00০ 10৬0 1 1১827. 69 083910, 


017... 7179 00. 07107860209 ! 


7928. 15 1010 ? 
0%%. 406 70 159 ? 
41025. 1056১ 05 0৩ ৪000? 

100. সুঞচ ১০, 09 19669070050 10170) 


207 03 [00100 ০ঠ 0০900077200 1100 30209) 
1)6])0610 095510 2 013 0০৮০:01790, 
1968. [টা 100 6০6] ] 000 81 ০00৮ 


0. 70990 ? 
4703. ছাট 10৭? 
0৮. 1065111 [87179 77. 
7728. [17959 7006 0938:৮+0 (1019. 


40৫. [101,015 ০৪] 10061১6 109119570 10 
৬০10৪, 


ঃ ত্রিধারা। 





[1০9৮9 1 80010 ৩০০: ] ওঠ 1 77113 501] 00001) 
11159 0067 2106009, 9109 দা 66])9- 
0. 0 91], 0951]! 
[1 079৮ 079 ০2৮) ০০1৭ 89910. সা10। 01002178 66218) 
70০01) 0:01) 979 £113 ০০1৫ 0:09 ৪ 0:0900119 :-- 
98৮ ০ 7 51011 
7069. 7 সঃ] 006 3625 60 ০0670 700, 
[ 99%7, 
“নু জা] 0০% ৪/ট 6০ ০0000 5০০৮-ইহাতেই তৃফানের 
সেই অপূর্ব্ব সরোবর-_ইহাই সেই অনন্ত মুহূর্ত । 
আর এক জন কবি কি দেখাইতেছেন দেখ দেখি_- 
অত্যুচ্চ অভ্রভেদী হিমাচলের কোলে শান্ত শব্হীন সৌন্দরঘ্য- 
ময় বনপ্রদেশ। তথায় স্বচ্ছ শুভ্রসলিল! মালিনী নদী নিঃশবে 
প্রবাহিত1-_মালিনীর পার্থে পুণ্যবান্‌ খধির পবিত্র আশ্রম। 
আশ্রম নিস্তৰ-যেন যোগীর ন্যায় যোগমগ্র। হঠাৎ বিদ্যুদু 
বৎ বক্রধধ্বনি হইল-_. 


অয়মহং ভোঃ 
হিমাচল, মীলিনী, বৃক্ষ, বন, বাঘু, পশু, পক্ষী, খষি, খষি- 
কুমার, খধিকন্যা, সেই গভীর নিস্তব্ধতাসকলই চমকিয়] 
উঠিল। কেবল চমকিল না--একখানি ক্ষুদ্র কুটারে একটি ক্ষুদ্র 
বালিকা! 
দেখিয়! বজ্জের ক্রোধ বাঁড়িল। বজ্র হিমাচল, মালিনী, 
বৃক্ষ, বন, বায়ু সমস্ত বিদীর্ণ করিয়া গর্জিতে লাগিল--. 
বিচিত্তয়ন্তী ঘমনন্যমানসা 
তপোধনং বেৎসি ন মামুপস্থিতম্‌। 


অনস্ত মুহুর্ত । ৫ 





ন্মরিষ্যতি ত্বাং নন বোধিতোইপি মন্‌ 
কথাং প্রমন্তঃ প্রথমং কুতামিব ॥ ] 

সব বিদীর্ণ হইল__হইল ন] কেবল সেই ক্ষুদ্র কুটারে সেই . 
ক্ষুদ্র বালিকা! বালিকা তথন ত্রন্াগাস্তরে বিলীন। বজও সে 
বিলীনতা! বিদীর্ণ করিতে পারিল না। বালিকা যেমন তাহার 
্রন্মাণ্ডে বিলীন, বন্রুও ভেমনি সেই বালিকার বিলীনতাঁয় বিলীন 
হইয়া গেল! 

বল দেখি-বাঁলিকার এই বিলীনতায় বজ্রের এই বিলীনতা 
দেখিলে বিশ্বত্হ্দাও সেই সংযুক্ত বিলীনভায় অনন্তকাল বিলীন 
হইরা থাকে কি না-_যে কাল কেবলই চলে, দেই কাল মেই 
বিলীনতায় অনন্তকাল বিলীন হইয়া থাকে কি না? বল দেখি-- 
যে মৃহার্তে বালিকার এই বিলীনতাঁয় এই ভীষণ বঙ্কে বিলীন ; 
হইতে দেখি, সে মুহর অনন্ত মুহুত হর যায় কি না? 

সেই কবি সীতা! দেবার দিকে অঙ্গ,নি নির্দেশ করিয়া কি 
বলিতেছেন শুন _ 

পীত| নিতান্তই রাম-লইয়া--লীত। নিতান্তই রাম-সর্বন্থ । 
সেই জনাই সীতা ছায়ার নায় রামের অন্থুগামিনী-__যেখানে 
রাম, সেইখানেই সীতা-_দুখে কষ্ট বিপদ, কিছুতেই ভ্রক্ষেপ 
নাই__রাজপুরী তুচ্ছ করিয়া শীতা অরথ্যবাসিনী, অশোকবনে 
বমিয়! সীতা দৃদ্ধ্ব রাক্ষসকুলবিনাশিনী। রাম ব্যতীত সীতা 
জীবন্মৃতা__রাম ধ্যান, রাম জ্ঞান, রামমাত্র সার। তাই রামের 
জন্য সীভা ত্রিলৌকসমীপে অগ্নিপরীক্ষ। দিয়াছেন--তাঁই আবার 
হৃদয়ে রামকে ধরিয়া সিংহাদন ছাড়িয়া বনবাঁসযন্ত্রণী ভোগ 
করিয়াছেন । আজ আবার দর্বলোকসমক্ষে রাম বলিতেছেন_, 





শি ত্রিধারা। 





পরীক্ষা! দেও। এতও কিসয়? সীতার আর সহিল না! 
তাহার জ্ঞান বুদ্ধি হৃদয় সকলই ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হইয়া গেল। 
তিনি আর তিনি থাকিতে পারিলেন না। বলিলেন-যদি 
আমি কায়মনোবাক্যে পতি হইতে বিচলিত হইয়া না থাকি, 
তবে দেবি বিশ্বস্তরে ! আমাকে অস্তহিত কর ।” সীতা পতি হইতে 
বিচলিত হন নাই, কিন্ত আজ দেবতাঁদের নিকট যাহা চাঁহিতে- 
ছেন তাহ! পাইলে তিনি যে তাহার সেই পতিকে হারাইবেন, 
সেই পতিকে যে দেখিতে পাইবেন না,সে জ্ঞান তাহার গিয়াছে। 
ফলে, আজ সীতারপী ব্রদ্মাও মেরুদও হারাইয়! দিক-হাঁরা, পথ- 
হারা, আপন-হারা। তবুও কিন্তু ব্রন্ম-হাঁরা নয় ! 

না সীতামস্কমারোপ্য তর্তৃপ্রণিহিতেক্ষণীম্‌। 

মামেতি ব্যাহরত্যেব তন্মিন্‌ প1তালমভ্যগাৎ্থ ॥ 

তখন মীতার নয়নদ্বয় পতির প্রতি স্থিরীকৃত, বন্ুদ্ধরা 
সীতাকে ক্রোড়ে লইলেন, এবং রাম, “না” “না,” ইহা বলিতে 
না বলিতেই রসাতলে প্রবেশ করিলেন। 

“তখন সীতার নয়ন্দর পতির প্রতি স্থিরীকৃত 1” ব্রহ্মাণ্ডের 
মেরুদণ্ড ভাঙ্গিয়া গিয়াছে, ব্রক্মাও চূর্ণ হইয়া গিয়াছে, তবুও 
ব্রহ্মা আপন ত্রন্ষকে আগেও যেমন এখনও তেমনি হৃদয় 
ভরিয়া! ধরিয়! রহিয়াছে ! এই অপূর্ব ব্রন্মাণ্ড দেখিয়া বিশ্বত্রক্ষাও 
অনস্তকাল স্তত্তিত-_মহাঁকাল বিম্ময়ে অচল । এই অপূর্ব ব্রক্মাও 
একটি অনন্ত মুহূর্ত! 

আর একজন কবি কি কহিতেছেন শুন দেখি-- 

একটি কাল ছোট সুন্দর মেরে-_নাম ভ্রমর । ভ্রমরটি এমনি 
ছোট যে বোধ হয় যেন একটি অঙ্গুলির টিপনিতেই মরিয়া 


অনস্ত মুহূর্ত। ৭ 


যায়। কিন্তু এই ক্ষুদ্র ভ্রমরের ক্ষুদ্র প্রাণে প্রেমের সমুদ্র-_অনস্ত, 
অতলম্পর্শ। সে সমুদ্রের যেখানে খোজ--দেখিবে কেবল 
গোবিনলাল। কিন্তু গোবিন্দলাল পাপী। তাই এই স্ষত্র 
ভ্রমরের তেজ নিধৃহ শার্দংলের তেজ অপেক্ষাও বেশি । গোঁবিন্দ- 
লাল মুষ্টিভিক্ষা চাহিতে আসিয়াছে--বলিলে তখন সে প্রাণ 
পর্ধাস্ত বলি দিতে পাঁরে, পণ পর্য্যস্ত বলি দিতে পারে। তবুও 
ত রাগ পড়িল না-তেজ কমিল না। এত তেজ এত রাগ 
দেখিলে যেন রাগ হয় । 

কিন্তু ইহা বা কি দেখিলে? দেখিবে ত এইবার দেখ । ক্ষুত্্র 
ভ্রমরের অন্তিমকাল উপস্থিত। ভ্রমর এখন গোবিন্দলালের 
জন্য লালাপ্লিত--একটিবাঁর মাত্র গোবিন্দলালকে দেখিবার জন্য 
ছট ফট. করিতেছে । গোবিন্দলাল দেখা দিতে আসিয়াছে__ 
আপনি আসে নাই, ডাকিয়! আনিয়াছে তাই আসিয়াছে । 
ভ্রমর সে কথা শুনিয়াছে! গোবিন্দলালকে দেখিয়া! ভ্রমরের 
মৃত্যুযন্ত্রণী ঘুচিয়া গেল-ত্রমরের সাত বৎসরের হ্ৃদয়াগ্নি নিভিয়া 
গেল-ত্রমরের ইহকাল পরকান সার্থক হইল। তবুও ভ্রমর 
বলিল--'আশীর্বাদ করিও যেন জন্মান্তরে স্তুখী হই'--বলিয়! 
ব্রমর মরিয়া গেল ! ভ্রমরের উপর এত যে রাগ হইয়াছিল তাহা 
কোথায় চলিয়া গেল। ভ্রমরের জন্য প্রাণ কাদিয়া উঠিল। 
কিন্ত হৃদয়ে যত দুঃখ উপজিল, হৃদয় তাহার সহস্রগুণ বিস্ময়ে 
পূরিয়া উঠিল । যে গোবিন্দলালকে না দেখিতে পাইয়া ভ্রমর 
আজ মৃত্যুশয্যার, সেই গোবিন্দলালকে এ-েন মৃত্যু-মুহর্তে ইহ- 
জন্মের মতন একটিবার দেখিতে পাইয়াঁও ভ্রমর বলিল কি না-- 
1'যেন জন্মাস্তরে সুখী হই' ! এ সেই আগেকার মতন কাটা কাটা 





৮ ত্রিধারা 


৯১৮ 


কথা নয় বটে, এ কাঁতরভার কথা। কিন্তু ইহাতেও ত সেই 
আগেকার তেজ, আগেকার কঠোরতা আছে। এ কথা 
শুনিলে কানা পায় বটে, কিন্ত এ কথাও যে পাপীর কাছে তাহার 
পাপের কথা -পাপীর প্রতি পাপের জন্য তিরক্ষারের কথা। 
মিছরির ছুরি যাহাকে বলে, এ কথা যে তাহাই । ভ্রমরের সব 
ভাঙ্গিয়াছে_-অস্থি, ইন্দ্রিয়, মস্তিষ্ক, দেহ, মন, বিশ্বত্রহ্গাওড সব 
ভাঙ্গিয়াছে, কিন্ত সে গোবিন্দলালও ভাঙ্গে নাই, আর গোবিন্দ- 
লাঁলের প্রতি সে কঠোরতাও ভাঙ্গে নাই ! বল দেখি_-এই বিষম 
দৃশ্য দেখিয়া! বিশ্বত্রক্ষাও স্তম্ভিত হইয়া যায় কি না, মহাকাল 
থমকিয়া দাড়ায় কিনা? এখন বুঝিলাম ভ্রমরের রাগ, ভ্রমরের 
তেজ-দর্পও নয়, অহঙ্কারও নয়» প্রেমের অভিমান ও পুণোর 
কঠোরতা । আর সে অভিমান কি ?-_না, প্রেমের আকাঙ্ষ। 
পূর্ণ হইল না বলিয়া, ভালবাসার পাত্রকে পাপ স্পর্শ করিল 
বলিয়া মরমের যন্ত্রণ1। সে যন্ত্রণা কিছুতেই খুচে না, ঘুচে 
কেবল অসন্পূর্ণকে পূর্ণ দেখিলে-_পাপীকে নিষ্পাপ দেখিলে । 
তাই, গোবিন্দলাল অসম্পূর্ণ বলিয়া, মরিতে মরিতে ও ভ্রমর 
তাহার প্রতি তেমনি কঠোর। পুণ্যের কঠোরতা বিষম কঠো- 
রতা_এতটুকু অসম্পূর্ণত। থাকিতে পুধ্যের কঠোরতা যায় না। 
পুণ্য দেয়ও যোল আনা, চায়ও যোল আনা, কাগক্তান্তিটিও 
ছাড়ে না। লেশমাত্র পাপ বা অনম্পূর্ণতা থাকিতে প্রেমময় 
ভগবানকে পাওয়। যায় না। ভ্রঘরের এই বিষম কঠোরতা সেই 
প্রেমময়ের কঠোরত|। কিন্তু সে কঠোরতা কেবলই কঠোর 
নয়_সে কঠোরতা করুণে-কঠোর | অসম্পূর্ণতা যন্ত্রণার কারণ 
বলিয়। পুণ্য অসন্পূর্ণতার প্রতি এত কঠোর। পুণ্যের কঠো- 








অনন্ত মূহ্র্ত। ৯ 


রত করণে-কঠোর। তাই আজ পুণ্যবতী গোবিনলালকে 
আপনার যন্ত্রণার কথা বলিয়া তাহার আশীর্বাদ লইয়া বিশ্বরক্মাও 
কীদাইয়। চলিয়া গেল। ধর্ম বুক খুলিরা আপন যন্ত্রণা দেখা- 
ইয়া বলিয়! গেল, পৃথিবীর যন্ত্রণা ঘুচাইও-পূর্ণ হইবে ও পৃজ্য 
হইবে। তাই দেখিয়া বিশ্বত্রক্মাওড অনন্তকাল বিদ্মিত ও ভক্তি- 
পূর্ণ চিত্তে সাশ্র নয়নে ভ্রমরের পুজা ক'রল আর স্বয়ং কাল যেন 
তাহা দেখিবার জন্য অনন্তকাল দীড়াইয়া রহিল! ভ্রমরের এ 
মৃত্যু-মুহূর্ত সত্যই একটি অনন্ত মুহূর্ত ! 

এইরূপে আমাদের কবিগণ কালের গতি রোধ করেন এবং 
অনন্ত কালকে মুহূর্ত কালে প্রবিষ্ট করাইয়া দেন। কালের 
ভঙ্গি ভ্রকুটা আদি নষ্ট করিরাই তাহার! কালকে বাঁধিয়া ফেলেন। 
তাহারা দেখেন যে ঈশ্বরের কাছে কালের জকুটা ভঙ্গি কিছুই 
নাই_ ঈশ্বর অনস্তকালেও যা মুহূর্ত কালেও তাই।-ঈশ্বর 
অনন্ত মুহূর্ত । সেই চরমাদর্শ শিরোপরি রাখিয়া তাহারা 
সাহিত্যে অনন্ত মুহুত্ত স্ষ্টি করেন_বুঝি বা! তাহাদের ইচ্ছা ষে 
মান্থষ যেন এতই উচ্চ, এতই ঈশ্বর-সর্শ হয় যে কালে তাহার 
বিপধ্যয় ন! ঘটে, আর যখনি তাহাকে দেখা যায় তখনি তাহাকে 
যেন পূর্ণ দেখা যাঁয়_তখনি যেন তাহার সমস্তটা দেখা যায় । 
কবির সাহিত্য বড় জিনিস । কবির কাহিনী বড়ই গুঢ়। ব্রন্ষা- 
ওের মহাঁকবির উপানক না হইলে কবির সাহিত্য, কবির 
কাহিনী বুঝা ভার। 


পাঁখিটি কোথায় গেল ? 





দ্বারে একটি পাখী। বন্ধু নয়, ভিখারী নয়, অতিথি নয়, 
একটি পাখী । আমি কখনও পাখী পুধি নাই_-তবে আমার 
দ্বারে পাখী কেন? মানুষটিকে জিজ্ঞাসা করিলাম_“এখানে 
পাখী আনিলে কেন? সে বলিল-_“পাখী পুধিবেন কি?" 
আমি কখনও পাখী পুষি নাই । পাখী পুষিতে কখনও সাধও 
হয় নাই। যদি বা কখনও পাখী পুধিবার কথা মনে করিয়াছি 
বা কাহাকেও পাখী পুধিতে দেখিয়াছি তখনই ভাবিয়াছি-- 
বনের পাখী বনে থাকিলেই ভাল থাকে-যে অনন্ত আকাশে 
উড়িয়। বেড়ায় তাহাকে ক্ষুদ্র খাচায় পুরিলে সে বড়ই ক্লেশ 
পায়। এই ভাবিয়া কখনও পাখী পুষি নাই এবং কাহাকেও 
পুধিতে দেখিলে ছুখে বৈ সুখ পাই নাই। কিস্ত মানুষটি 
যখন আবার বলিল--'পাখী পুষিবেন কি ?--কি জানি কেন, 
মনটা কেমন হইয়া! গেল, মনে হইল বুঝি আমি পাখিটিকে না 
লইলে মান্ষটি তাহাকে কতই কষ্ট দিবে__পাখিটিকে ধরিয়া কত 
কষ্টই দিয়াছে--অনায়ামে অবলীলাক্রমে অপূর্ব-আনন্দভরে 
পাখীটিকে ধরিয়া কত কষ্টই দিয়াছে__-আঁবার অনায়াসে অব- 
লীলাক্রমে অপূর্ব-আননতরে তাহাকে আরো কত কষ্ট দিবে। 
এই ভাবিয়া মনটা কেমন হইয়| গেল। তায় আবার দেখিলাম 
যে পাখিটি যেন নিজাঁব হইয়াছে, ভাল করিয়া ধুকিতেও 
পারিতেছে নাভয়ে জড়দড় হইয়াছে, বুঝিবা কতই আকুল 
হইয়াছে, বুঝিবা তাহার ক্ষুত্র ক কতই শুকাইয়া উঠিয়াছে! 


পাখীটী কোথায় গেল? ১১ 





বড় ছুঃখ হইল। আমি বলিলাম--পুষিব। মানুষটি বলিল, 
আটটি পয়না পাইলেই পাখীটি দি। পাখীটি যেন ধুঁকিতেও 
পারিতেছে নার দাম করিতে গেলে বা মারা যায়। তৎ- 
ক্ষণাৎ আটটি পয়সা দিয়া পাখীটি লইলাম এবং এক প্রতি- 
বাসীর নিকট হইতে একটা খাচা লইয়া পাখীটিকে তাহাতে 
রাখিয়া ছুগ্ধ ছাতু ও জল খাইতে দিলাম । দিয়া তাহার 
মুখের দিকে চাহিয়া! বসিয়া রছিলাম। অনেকক্ষণ বসিয়] 
রহিলাম। তবু পাখীটি খাইল না। অর্ধ মুক্রিত নেত্রে আস্তে 
আস্তে ধূকিতে লাগিল। মনে হইল বুঝি আমাকে দুষজুন 
ভাবিয়া ভয়ে খাইতেছে না । একটু সরিয়া গেলাম । পাখাঁটি 
আমাকে আর দেখিতে পাইল না । খানিক পরেই একটু ছাতু 
ও জল খাইল। আমি বুঝিলাম__আমাকে ছুষমুন ভাবিয়াই 
এতক্ষণ খার নাই। কিন্তু ছুষমুনের ঘরে ছুষ মুনের সামগ্রী 
খাইল ত। আমি তাহার এত ন্ুখ এত সামগ্রী হরণ করিয়াছি 
কিন্ত আমার ঘরে আমার জিনিস থাইল ত। পেটের দায় 
এমনি দাঁয়। পেটের মতন যন্ত্রণা জগতে আর নাই-__-পেটই 
তজগতে এত কলঙ্কের মূল। আমার পাখী পেটের যন্ত্রণা 
তুচ্ছ করিতে পাঁরিল না__-পেটের জন্য ছুষ মুনের জিনিস খাইয়। 
কলঙ্কে ভুবিল । বুঝিলাম আমাদের ন্যায় পাখীও ক্ষুন্্, পাখীও 
ছুর্বল। পাখীর উপর মায়া হইল। সে দিন আর পাখীর 
কাছে গেলাম না। প্রাতে উঠিয়া দেখি পাখী দিব্য খাঁওয়া- 
দাওয়া করিয়াছে। ছাতুর বাটিতে ছাতু প্রায় নাই, জলের 
বাটিতে জলও কিছু কম এবং খাঁচার নীচে মেজের উপর কিছু 
ছাতুর গুড়! এবং হ্ুই চারি ফৌঁট] জল পড়িয়া আছে। বড় 


১ ত্রিধারা 





জাহলাদ হইল। পাবীর কাছে গেলাম-। পাখী সরিয়! খাচার 
এক কোনে গিয়া বদিল। প্রায় এক ঘণ্টা কাঁল সেইখানে 
দড়াইয়া রহিলাম | পাঁখীও সেই এক ঘণ্টা কাল সেই কোণে 
বসিয়া রহিল কিছু খাইল না । আমি সরিয়। আপিলাম-_পাখীও 
খাইতে লাগিল। তখন আবার ভাঁবিলাম--পাথী আমাকে 
গ্রথনও ছুষমুন ভাবিয়া খাইতেছে নাঁ। ভাল, এমন করিয়া 
খাওয়াইতেছি তবুও পাখী আঁমাকে ছুষষুন ভাঁবিতেছে? 
ভাবিবে না তকি? নর্ধন্থ কাঁড়িয়। লইয়া কেবল পেটে খাইতে 
দিতেছি বলিয়া কি সে আমাকে পুষ্পচন্দন দিয়! পূজা! করিবে? 
পেটটা কফি এতই বড়? তবে কেন পাখী আমাকে ছুষ মুন 
ভাবিবে ন1? কিন্ত মন হই আঁর যাই হই, আমি পাখীকে 
পয়সা দিয়া কিনিয়াছি ত বটে; তবে কেন পাঁখী আমার 
হয় না? মানুষকে পয়সা দিলে মান্য ত মানুষের হয়; মাহ্ষকে 
পয়সা দিলে মাগষ ত মাহ্গষের মন যেগায়, গোলামি করে, 
গুণগান করে, সবই করেও) মানুষকে পয়সা দিলে মানুষ ত 
মানুষকে গতর দেয়, মানমর্ধ্যাদা দেয়, পুণ্যধর্শ্শ দেয়, সব দেয় । 
পাখীকে পয়সা দিয়! কিনিলাম তবে কেন পাখী আমার হয় না, 
আমাকে কিছু দেয় না? কিছুই মীমাংসা করিতে পারিলাম 
না। বোধ হইল বুঝি পাখী নীচ জন্ত, পয়সার মাহাস্ম্য জানে 
না, পয়সার জন্য সব করা যাঁয় সব দেওয়1 যায়, এ উচ্চ মাঁনব- 
নীতি বুঝিতে পারে না । আরে! ছুই চারি দিন গেল । আবার 
একবার পাখীর কাঁছে গেলাম । দেখি সেখানে আমার একটি 
ছোট ছেলে বসিয়া আছে। পাখী আমাকে দেখিয়া আর 
তেমন করিষা সরিয়া গেল না। ছেলেটিকে কোলে করিয়া 


পাখীটী কোথায় গেল? ১৩ 





আমি তাহার সহিত পাখীর কথ! কছিতে লাগিলাম। পাখী 
খাইতে লাগিল । বুঝিলাম পাখী খাচা চিনিয়াছে। মনে ছুঃখ 
উথলিয়! উঠিল । অনস্ত আকাশে উড়িয়া উড়িয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া 
উঠিয়া উঠিয়া নামিয়া নামিয়া। যার আশ. মিটে না, কেন 
তাহাকে, হায়! হার! কেন তাহাকে ক্ষুত্র খাচায় পুরিলাম! 
কেন তাহাকে ক্ষুদ্র খাচা চিনাইলাম ! কেন তাহাকে অনস্ত 
ভূলাইলাম ! এ মহাপাতক কেন করিলাম ! ছুই এক দ্িন বড়ই 
কষ্টে গেল। এক একবার মনে হইতে লাগিল পাঁখীকে উড়াইয় 
দ্ি। একবার খাচার দ্বার খুলিয়া দিলাম । পাখী উড়িয়া 
গিয়া একটা জানালার উপর বলিল । আবার মনটা কেমন 
করিতে লাগিল-_পাখী পালায় ভাবিয়া! প্রাণটা কেমন হইয়! 
গেল-_অমনি পাঁখীকে ধরিয়া আবার খাঁচায় পুরিলাম । আপনার 
কাছে আপনি হারিলাম | কেন হারিলাম বুঝিতে পারিলাম না । 
সত্য সত্যই কি মহাঁপাতক করিলাম ? 

এক দিন ছেলেগুলিকে লইয়া! পাখীর কাছে বসিলায়। 
পাখী যেন কতই আহ্লাদিত হইয়া! খাঁচার ভিতর লাফালাফি 
করিতে লাগিল এবং একবার এ ছেলেটির দিকে একবার ও 
ছেলেটির দিকে যাইতে লাঁগিল। আমরা সকলে আহ্লাকে 
হো হো করিয়া হাসিতে লাগিলাম এবং করতালি দিতে 
লাগিলাম। পাখী ভয় পাইল না_-তেমনি লাফালাফি করিতে 
লাগ্িল। আমি একটু ছাতু লইয়া পাথীকে খাইতে দিলাম-- 
পাখী থাইল না। আমার একটি ছেলে একটু ছাতু লইয়া 
খাইতে দিল, পাখী টুপ্‌ করিয়া খাইয়া ফেলিল। মনে হইল 
আমার ছেলেগুলির সহিত পাখীর ভ্রাতৃভাব হইয়াছে--ছেলে- 


১৪ ত্রিধার! 


গুলিকে বলিলাম, উটি তোমাদের ভাই। সেই দিন হইতে 
পাখীটিও আমার ছেলে হইল । পাখীটকে আমার হৃদয়ের 
খীচায় পুরিলাম। সে খাঁচার সীম] নাই, অর্গলযুক্ত দার নাই, 
আশে পাশে মাথায় পায় ঠেকে এমন কাটির কাঠাম নাই। 
পাখীকে সেই অলীম অনস্ত অতলম্পর্শ খাচাঁয় পুরিলাম। মহা- 
পাতকের ভয় কোথায় চলিয়া গেল। মন আনন্দে মজিয়া 
উঠিল । পাখীও আর তাঁহার বাশের খাঁচায় এখানে ওখানে 
ঠোঁট গলাইয়া পালাইবার চেষ্টা করে না। এখন বাঁশের 
খাচার দ্বার খুলিয়! রাখি, পাখী উড়িয়া! যায় না। খাঁচার দার 
খুলিয়। রাখিলে পাখী এক আধবার আমার কাছে আমে, এক 
আধবার আমার ছেলেদের কাছে আসে । আবার নাচিতে 
নাচিতে ধাচার ভিতর গিয়া বসে । খীচা এখন পাখীকে বড় 
মিষ্ট লাগে। খাচার এখন আর নীম! নাই, খাঁচা এখন অপীম 
অনভ্ত অতলম্পর্শ। খাচার এখন আর কাটির কাঠাম নাই__ 
আশে পাশে মাথায় পায় লাগে এমন কাটির বেড়া নাই। খাঁচা 
এখন পাখীর বড় সখের বড় সাঁধের ঘর । পাখী এখন খাঁচার 
নেশায় ভোর ৷ আমি এখন পাখীর নহিত কত কথা কই, পাখীও 
আমার সহিত কত কথা কয়--যেন কত আদরের, কত আব্দারের 
কথা কর, কত চেনা দেশের কথা কয়, কত অচেনা দেশের কথ। 
কয়, কত হাসে, কত কীদে, কত গান গায়, কত বকে, কত্ত 
ঝগড়া করে, কত অভিমান করে, কত ভাঁৰ করে,কত ভ্রকুটি করে, 
কত ভগ্ডামি করে। পাথীকে আমি কত রকম করিয়! দেখি, 
পাখীও আমাকে কত রকম করিয়া দেখে । পাখীর খীচা 
খুলিয়া দ্ি। পাখী আসিয়া আমার কাধের উপরে বনে, আমার 





পাখীটী কোথায় গেল? ১৫ 


হাতের উপর বপিয় ছাতু খায় । আমি এখন আর পাখীর সে 
ছ্ষজুন নই । আমি এখন পাখীতে মজিয়াছি, পাখীও এখন 
আমাতে মজিয়াছে। এখন অনম্ত আকাশ স্থদয়ের অনস্তত্বে 
ডুবিয়া গিয়াছে_-পাখী এখন আর অনস্ত আকাশ থোজে না, 
তাহার অনভ্ত-আকাশের তৃষ্ণা আর নাই। নে এখন আকা- 
শের অনস্তত্ব ভুলিয়া হৃদয়ের অনস্তত্বে মিলাইয়া গিয়াছে । 
অনভ্ত-বিশব হৃদয়ের ভিতর বিন্দু অপেক্ষাও বিন্দু। বিশ্ববিন্দু 
হৃদয়ের কাছে কোন্‌ ছার? কিন্ত হৃদয়ের ভিতর অনস্ত বিশ্ব 
ও অনভ্ত হৃদয় । হৃদয় বিশ্ব-দ্রাবক, বিশ্বের বিশ্ব। আমার 
পাখী নেই বিশ্বের বিশ্বে পশিয়াছে। তাহার কি আর সেই 
তুচ্ছ অনস্ত-আকাশের কথা মনে থাকে? 

আহা ! আমার সে পাখী আর নাই ! আজ চারিদিন হইল 
আমার নে পাখী মরিয়া গিয়াছে! মরিয়া কোথায় গিয়াছে? 
কে বলিবে কোথায় গিয়াছে ? কিন্ত আমি দিব্য চক্ষে দেখি- 
তেছি, হাড়ে হাড়ে অনুভব করিতেছি যে পে মরিয়া অনন্ত 
হইয়াছে। আজ আমি যেখানে যে রঙ. দেখি সেখানে 
সেই রঙে আমার সেই পাঁখী দেখিতে পাই । যেখানে যে চোকু 
দেখি সেখানে সেই চোকে আমার দেই পাখী দেখিতে পাই। 
যেখানে যে ঠোঁট দেখি সেখানে সেই ঠোটে আমার সেই পাখী 
দেখিতে পাই। আজ আমি চন্দ্র হুধ্য নক্ষত্র অগ্রি বায়ু জল 
হিম তাপ পাহাড় পর্বত ধূল! বালি বৃক্ষ লতা ফস ফুল পশু 
পক্ষী কীট পতঙ্গ নর নারী মকলেতেই আমার দেই পাখী 
দেখিতেছি, হাড়ে হাড়ে আমার সেই পাখী অনুভব করিতেছি । 
আজ অনন্ত বিশ্বে আমার সেই পাখী ছাড় আর কিছুই নাই। 


১৬ ত্রিধারা 


আজ আমিও আমার সেই পাখী-ময়, এই অন্ত বিশ্বও সেই 
পাখী-ময়। তাই আমিও আজ কি মধুময়,আমার অন্ত বিশ্বও কি 
মধুময়! আমার ক্ষুদ্র পাখী আজ অনন্ত কায়া ধারণ করিয়া 
অনস্তব্যাপী হইয়া পড়িয়াছে। আমার এক ফোঁটা পাখী আজ 
অপূর্ব শ্রী এবং অনৃপম সৌনার্ধ্য লাভ করিয়া অনস্ত বিশ্ব ভরিয়া 
রহিয়াছে । তাইতে অনস্ত বিশ্বও অপূর্ব শ্রী এবং অনুপম 
সৌনর্ষ্যে শোভিত হইয়1 উঠিয়াছে। ভাগ্যে সেই এক ফে"টা 
গাখীতে মজিয়াছিলাম, তাইত আজ অনস্ত বিশ্ব দেখিলাম, 
অনন্ত বিশ্বে মজিলাম এবং অনন্ত বিশ্ব আঁমাতে মজিল। তাইত 
আজ অনন্ত হইলাম। তাইত আজ বুঝিলাম যে ফোটার 
ভিতরেই বিশ্ব ফোটে, ফোঁটা অনস্তেরও অনস্ত। 

আমার গাখী আছে বৈ কি। কিন্ত আমার ছোট ছেলেগুলি 
আমাকে এক একবার জিজ্ঞাসা করে-_-পাখীটা কোথায় 
গেল ? 

৫ই চৈত্র, ১২৯২। 


ছায়।। 


ছায়া কিছুই নয়, অতি অসার, অতি অপদার্থ-+]5 0৪৮ % 
90500৭, ইহা! ছায়া মাত্র, কিছুই নয়। সকলেই এই কথা 
বলে। সব দেশে সকল সময়ে সকল লোকেই এই কথা বলে। 
কথাটা কি ঠিক? বোধ হয় না । 

ছায়! কিছুই নয়, তবে কি যাহার ছায়া তাহাই নব, তাহাই 
বিশেষ-কিছু? তাহা ত বুঝিতে পারি না। বৃক্ষের ছায়া যেন কিছুই 


ছায়া। ১৭ 
পাগল? 


নয়? কিন্তু বৃক্ষই বাকি? ছায়াতে যেন কিছুই নাই, কিন্ত 
বৃক্ষেতেই বা কি আছে? বৃক্ষে কিছু থাক. আর নাই থাক আমি 
মানষ আমি সে-কিছুর কিছুই ত জানি না। তবে আমার 
সন্বন্ধে বৃক্ষ কিছুই নয় বলিলে দোঁষ কি? তুমি বলিবে যে বৃক্ষ 
কি তাহা না জানিলেও বৃক্ষ যে কিছুই নয় একথা! বলা যায় না, 
কেন না উহা আমাদের ইন্ড্রিয়ের উপলব্ধির বিষয়, চোকে দেখ] 
যায়, স্পর্শে কোন-একটা-কিছু বলিয়া অনুভূত হয়। কিন্ত 
ছাঁয়াও ত আমাদের ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধির বিষয়_-ঢোঁকে দেখা 
ধায়। তবে বৃক্ষ এবং বৃক্ষের ছায়ায় প্রভেদ কি? ফল কথা, 
ছায়া যদি কিছু না হয় তবে বৃক্ষও কিছু নয়। তবে কিছু-নয় 
বলিয়া ছায়াকে এত অবজ্ঞ। কর কেন? 
আদল কথা এই যে ছায়ার মণ্তন জিনিস পৃথিবীতে বুঝি 
আর নাই, ছায়ার মতন রহস্য পৃথিবীতে অই আছে। পৃথি- 
বীর পৃথিবীত্ব পরিবর্তনে । পরিবর্তন লইয়াই পৃথিবী । রৌদ্রের 
পর মেঘ, মেঘের পর ঝড়, কড়ের পর বু, বৃষ্টির পর বন্যা_- 
বাল্যের পর যৌবন, যৌবনের পর প্রৌটাবস্থা, প্রৌঢাবস্থার 
পর বার্ধক্য_গ্রীক্মের পর বর্ধা, বর্ধার পর শরৎ, শরতের 
পর হেমন্ত, হেমন্তের পর শীত, শীতের পর বসন্ত--রাত্রির পর 
দিবস, দিবসের পর রান্রি-ইহাই পৃথিবীর পৃথিবীত্ব । এ পরি- 
বর্ভন বদ্ধ হউক পৃথিবীও অদৃশ্য হইবে। কিন্ত পৃথিবীতে 
যত কিছু আছে সকলের মধ্যে ছায়ায় যত পরিবর্তন দেখি, 
আর কিছুতে তত দেখি না। হৃর্্যোদয় হইলে পর যেখার্নে 
ইচ্ছা সেইখানে বসিয়া! দেখিও ছায়ার কত খেলা এবং কি চমৎ- 
কার খেলাই হইতেছে! মুহূ্ পূর্বে যে ছায়াটা দীর্ঘ ছিল, 


১৮ পু ত্রিধারা 


সেট ক্ষুদ্র হইয়। পড়িয়াছে, যে ছায়াটা সৌজ] ছিল সেট। 
বাঁকা হইয়া গিয়াছে, যে ছায়াটা উর্দমুখী ছিল সেটা অধোমুখী 
হইয়াছে, যে ছাঁয়াটা একলণ ছিল সেটা পাঁচটার সঙ্গে মিশিয়৷ 
কোলাকুলি করিতেছে। মুহূর্ত পূর্বে ষে ছায়াটার শুধু দুইটা 
হস্ত ছিল সেটার দুইটা পাও হইয়াছে, যে ছারাঁটার মাথা ছিল না 
সেটা একটা বৃহৎ মাথায় একটা বৃহ পাগড়ি বাঁধিয়াছে,যে ছায়াটা! 
উলঙ্গ ছিল সেট? কতকগুল! কাপড় পরিয়াছে,যে ছায়া কাঙ্গা- 
লিনী ছিল সেটা নানা আভরণে ভূষিতা হইয়াছে, যে ছায়াটা 
বন্ধ্যা ছিল সে দিব্য একটা হুষ্পুষ্ট ছেলে পাইয়৷ তাহাকে কোলে 
করিয়া রহিয়াছে। এত পরিবর্তনের এত পরিপাটি, এত 
সুন্দর, এত কল্পনাময় খেলা আর কিছুতেই দেখিতে পাই না। 
এ খেলা দেখিতে দেখিতে সব ভুলিয়া যাই-_বাড়ীঘর স্ত্রীপুত্র 
ধনজন আত্মপর লব ভুলিয়া যাই-_ভুলিয়া এই খেলায় খেলিতে 
থাকি, খেলিতে খেলিতে ভ্রম হয় যে ন্বয়ং কল্পনার সহিত খেলি- 
তেছি। তখন কল্পনার রূপ দেখি, আকার দেখি, হৃদয় দেখি, 
প্রাণ দেখি, স্বরূপ দেখি--দেখিতে দেখিতে কল্পনায় কল্পন। 
হইয়া যাই। এত অন্ন আয়াসে, এত অল্প সময়ে, এত অন্ন 
সাধনায় আর কোঁন রকমেই এত কর্পনাময় হইতে পারি না 
সেক্সপীয়র পড়িয়াও নয়, শেলী পড়িয়াও নয়, কিছু দেখিয়া, কিছু 
পড়িয়া নয়। ছায়াতে কল্পনার পূর্ণ এবং বড়ই প্রসন্ন মুভি 
আছে। দেখিলে দেখিতে পাইবে । ছায়া কিছুই নয় এমন 
কথা কি বলিতে আছে? 

পৃথিবীতে যত জিনিস আছে সকলের অপেক্ষা ছায়া বেশী 
আধ্যাত্মিক ভাবাপন্ন। যে মানুষ প্রক্কৃত উন্নতি লাভ করিয়াছে, 


ছাঁয়।। ১৪ 





যাহার মনোবৃত্তি সকল সমুচিত কত প্রাপ্ত হইয়াছে যাহার 
দৃষ্টি স্থল নয়, স্ক্ষ, অর্থাৎ যে চর্চক্ষের সহিত মানসচচ্ষু সংযোগ 
নাকরিয়া কোন জিনিস দেখে না, দে একট] ফুল দেখিবার 
সময় ফুলে যে রঙট! চর্-চক্ষে দেখা যাঁয় সে রঙটা দেখে না» 
সে রঙটাকে মনে মনে আর এক রকম করিয়া লইয়া! দেখে. 
একটা! পাতা দেখিবার সময় পাতার যে আকৃতি চর্-চক্ষে দেখা 
যায় সে আকুতি দেখে না, মে আকৃতিকে মনে মনে আর এক 
রকম করিয়৷ লইয়া দেখে, ইত্যার্দি। অর্থাৎ সে একটা রঙ- 
বিশেষের বাঁ আক্ুৃতি-বিশেষের বিশেষতটুকু দেখে না, সকল 
রঙের এবং সকল আকৃতির যে নারমর্শটুক তাহার কল্পনায় 
প্রবেশ করিয়াছে সেই সার মর্শের সংযোগে সেই রঙ-বিশেষ 
বা আকুৃতি-বিশেষ দেখে। এই রকম করিয়! দেখিলে নে একটি 
বস্ততে অনেক বস্ত দেখে, একটি রঙে বা আকৃতিতে অনেক 
রঙ বা আকৃতি দেখে। বস্ত-বিশেষের বিশেষত্ব তাহার দৃষ্টিকে 
আবদ্ধ করিয়া! রাখিতে পারে না, সে বস্ত-বিশেষের সীমা অতি- 
ক্রম করিয়া অসীমে প্রবেশ করে, বলিতে গেলে তাহার চর্ম 
চক্ষের পাত! বন্ধ হইয়া আইসে-সে মানসচক্ষের দ্বারা বাহা- 
জগৎকে মানসজগত্ে পরিণত করিয়া ফেলে । এই রকম 
করিয়া দেখিলেই বাহজগৎ্ দেখা হয়, শুধু চর্মমচক্ষে দেখিলে 
বাহবস্ত-বিশেষ দেখা হয় মাত্র, বাহাজগৎ দেখ! হয় না। বাহ- 
জগত বাহ্যবস্তর সমষ্টি । সে সমষ্টি দেখিবার প্রকৃত চক্ষু চর্মচক্ষু 
নয়, মানসিক চক্ষু; প্রকৃত শক্তি ইন্দ্রিয় নয়, আনম্ম!। ছায়াও 
চর্্চক্ষে দেখিবার জিনিস নয়, মানস চক্ষে দেখিবার জিনিস। 
বুক্ষের ছায়ায় বৃক্ষের আকার আছে মাত্র--বৃক্ষের ত্বকের ফাটা- 


২5 ত্রিধারা। 





ফুটো, টিপিঢাঁপি, আটাঁশেয়ালা, উইপিপড়া কিছুই নাই, বৃক্ষের 
পাতার ভাল রঙ মন্দ রঙ কিছুই নাই, বৃক্ষের ফুলের কি গৌরব 
কি মলিনতা কিছুই নাই। অতএব বৃক্ষের ছায়ায় শুধু বৃক্ষের 
আকার আছে মাত্র-এবং সে আকার বড়ই বিশুদ্ধ, বড়ই 
সু্ম, যেন একথানি ছায়া, একথানি স্বপ্ন, একটি কল্পনাময় 
কল্পনা, আত্মার ন্যায় শুদ্ধ এবং স্থক্ম। বৃক্ষের ছায়া বৃক্ষের 
কাম ক্রোধ লোভ মোহ মাৎসর্ধ্য বিবর্জিত_বৃক্ষের থক, 
সুন্দর, শুদ্ধ, স্বপ্নবৎ বৃক্ষত্ব মাত্র। সে ছায়া হুর্যালোকে দেখিও, 
বত গার দেখিও, পরম জ্ঞান, পরম আনন্দ লাভ করিবে। 
কিন্ত স্থির বায়ুতে একবার জ্যোত্স্নীলোকেও দেখিও | জ্যোৎ- 
ন্নালোকে সে ছায়া দেখিলে পাগল হইয়| যাইবে-_-সে ছাঁয়! 
জ্যোতস্লালোকে এতই কল্পনারূপী, এতই তাঁবরূপী, এতই আত্ম" 
রূপী। সে আলোকে সেছায়াকে কোন-কিছুর ছারা বলিয়া 
মনে হয় নাঁ_মনে হয় বুঝি সে ছায়া ইচ্ছাময়ের সাধের একটি 
স্বতন্ত্র স্থষ্টি। সে ছাঁয়! দেখিলে বাহাজগৎ ভুলিয়া যাইতে হয় । 
সে ছায়া না দেখিলে আধ্যাম্বক জগৎ কাহাঁকে বলে বুঝিতে 
পারা যায় না। জড় হইতে আত্মার প্রভেদ যদি বুঝিতে চাঁও 
তবে সেই বৃক্ষ হইতে বৃক্ষের সেই ছায়ায় প্রবেশ করিও । 
ছায়! কিছুই নয় এমন কথ! কি বলিতে আছে? 

যে ছায়ার কথা বলিতেছি সে ছায়া যে একেবারেই চোকে 
দেখিবার জিনিস নয় এমন কথা বলি না। প্রতিভা সম্পন্ন 
চিত্রকরের চিত্র য্দি চোঁকে দেখিবার জিনিস হয় তবেনে 
ছায়াও চোকে দেখিবার জিনিন। অথচ চোকে দেখিবার 
জিনিস চোকে দেখিলে লোভ লালসা প্রভৃতি যে রকম চিত- 


] ছায়া। হ১ 
'নিকার জনয থাকে, সে ছায়া দেখিলে সেরকম কিছু হয় না। 
বরং চিত্ত বিকৃতাবস্থায় থাকিলে মে ছায়৷ দেখিয়া চিত্ত সুস্থ 
নুনির্শল এবং পবিত্রভাব প্রাপ্ত হয়। যেবস্ত দেখিলে চিত্ত 
বিচলিত ন! হইয়। স্ুষ্টির ও সংযত হয় সেই বস্তই চৌকে দেখ! 
উচিত । যে ছায়ার কথা বলিতেছি সে ছায়! সেই রকমের বস্ত। 
কিন্তু সে ছায়। বুঝি কেহ এখনও ভাল করিয়া দেখে নাই এবং 
বোধ হয় কোন দেশে প্রতিভাঁশালী চিত্রকর এখনও সে ছায়া 
মানবজাতির শিক্ষা, সুখ এবং আনন্দ বর্নার্থ অতুল কৌশলে 
চিত্রিত করেন নাই। এ দেশে ভাল চিত্র বা চিত্রশাল! 
নাই_ইউরোপে আছে। কিন্তু যেছায়ার কথা বলিতেছি 
ইউরোপের চিত্রশালায় সে ছায়ার চিত্র আছে কি নাঁজানি না। 
বোধ হয় নাই। মহামতি রঞ্গিণের গ্রন্থেও মে ছায়ার চিত্রের 
কথা পড়ি নাই। সে ছায়ার চিত্র কি হইবে না? যদিহয় বোধ 
হয় ভারতেই হইবে । যে দেশের লোক নির্মল, নিলিপগ্ত আত্মার 
কথা বুঝে কেবল সেই দেশেই সে চিত্র চিত্রিত হওয়া সম্ভব । 
লোকে বলে ছায়া কিছুই নয়। এক হিসাবে ছায়৷ কিছু 
নয়ই বটে, কেন ন! ছায়ার আকার আছে মাত্র, শরীর নাই, 
সৌরভ নাই, কিছু নাই। কিন্তু কিছু ন। হইয়াও ছায়া একটা 
স্বতন্ত্র জগৎ। মধ্যাহ্ন কালে যখন আকাশে প্রখর রবি, 
পৃথিবী ন্্ধ্যের শুভ্র আলোকে আলোকময়, তখন পথের ধারে 
একটি বৃক্ষের ছায়ায় গিয়া বদিও, নিশ্চয় মনে হইবে যে যে 
স্থান ব্যাপিয়া সেই ছায়! সেই স্থান একটি স্বতন্ত্র স্থান, সেই 
ছায়া-রেখার পরেই একটি শ্বতত্ত্র স্থান, একটি শ্বতস্ত্র জগৎ। 
মধ্যাহ্ন কালে পথের ধারে সেই রকম বৃক্ষচ্ছায়ায় বনিয়া দেখি- 


২২ ত্রিধারা । 





য়াছি। সম্মুখে ছুই হাত তফাতে হ্র্য্যালোকোদ্দীপ্ত পথ দিয়া 
ফত লোক গিয়াছে দেখিয়াছি । কিন্ত মনে হইয়াছে আমি 
একটা জগতে বসিয়া আছ্ছি আর সেই নকল নর নারী আর 
একটা জগতে চলাফেরা করিতেছে । মনে হইয়াছে যে আমার 
সম্মুখের সেই ছায়া-রেখাটি ছুইটি ভিন্ন জগতের মধ্াস্থিত একটা 
অ্ল্লজ্ঘণীয় প্রাকার বা প্রাচীর । মনে হইয়াছে সে ছায়ায় 
বনিয়া আমি তাল কথা, মন্দ কথা, স্তুখের কথা, ছুঃখের কথা 
নব কথা। কহিতে পারি, কেহ আমার কথা »গুনিবে না, শুনিতে 
পাইবে না, শুনিতে আসিবে না। এবং সেই ছায়ায় বলিয়া 
মনের কথা কহিতে কছিতে ইহাও দেখিয়াছি যে সম্মুখ দিয়! 
যে সকল নর নারী চলিয়! যাইতেছে তাহারা যেন আমাদিগকে 
তাহাদের জগতের কি তাহাদের মতন কেহ নয় মনে করিয়া 
আমাদিগকে দেখির়াও না৷ দেখিয়া চলিয়া যাইতেছে । তাই 
বুঝি মনের কথা! কহিতে হইলে লোকে রাস্তা হইতে সরিয়া 
গিরা একটা! গাছতলায় দাড়াইয়া কথা কয়। তাই বুঝি 
গোল্ডন্মিথ. গাছতলার উল্লেখ করিয়। বলিয়াছেনঃ__ 

707 21107059089 20 70901000] ০00678010200.% 

ছায়। একটা স্বতন্ জগৎই বটে। মান্য খোলা জগতে 
বাস করিলে সুর্যের তাপে পুড়িয়া মরে । তাই মান্ৃষ 
গৃহনিশ্দাণ করিয়া তাহার ছায়ায় জীবন রক্ষা করে। জড়পদার্থের 
ছাঁয়া না থাকিলে মানুষ জড় জগতে থাকিতে পারিত না, থাকি- 
লেও অশেষ এবং অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করিত। জড়পদার্থকে 
ছায়্া-বিশিষ্ট করিয়! জগদীশ্বর একটি জগতের ভিতর আর একটি 
জগ প্রস্তুত করিয়াছেন। কেন করিয়াছেন তাহা তিনিই 


ছায়া । ২৩ 


জানেন। কিন্তু আমরা সেই ছায়াময় জগতে জগদীশ্বরের 
সুন্দর, স্থুশীতল, সঞ্জীবনী ছায়! দেখিতে পাই । আমর] দয়ার 
কাঙ্কাল, আমাদের মনে হয় সেই ছায়াময় জগৎই দীননাঁথের 
দয়ার প্রকৃত স্বরূপ । ছায়! কিছুই নয়, কাঙাল মানুষের মুখে 
কি একথা সাজে ? মান্থষের স্বভাব ভাল নয়। মানুষের ধর্জ্ঞান 
বড়ই কম! 

মানুষের দেহই কি শুধু ছায়া-জগতে বাঁচিয়া থাকে ও 
পৃষ্টিলাভ করে ? মানুষের মনও ছায়া-জগতে থাকিয়া উন্নত ও 
পরিপুষ্ট হয় । প্রথম মন্গুষ্যের অবস্থা মনে কর দেখি--কিছু 
জানে না, কিছু বুঝে না, ভয়ে আকুল, পদে পদে ভ্রমবশতঃ 
ভীষণ অবস্থাপন্ন, রোগে নিক্ষপায়, পুজায় পিশাচ-শাসিত। 
অনেক ভূগিয়া, অনেক সহিমা প্রথম মন্কুষ্য মরিয়া গেল। 
পৃথিবীতে কিছু রাখিয়া গেল না-কেবল এক খণ্ড পশুচর্ 
আর ছুই খণ্ড কাষ্ঠ রাখিয়া গেল। দ্বিতীয় মনুষ্য সেই চর্ধটুকু 
এবং কাঠ দুইখানি পাইয়া যেন কতই শান্তি লাভ করিল, কত 
জালা যন্ত্রণা হইতে অব্যাহতি পাইল। আভতপতাপিত পথিক 
বৃক্ষের ছায়া পাইলে যেমন চরিভার্থ হয়, প্রথম মনুষ্যের 
চর্মথণুটুক্‌ এবং কাঠ ছুইখানি পাইয়া দ্বিতীয় মনুষ্যুও তেমনি 
চরিতার্থ হইল। দেই চর্থগটুকু এবং দুই খানি কান্ঠে 
দ্বিতীয় মনুষ্য প্রথম মন্ুষয্যের ছায়া দেখিতে পাইল। দেই 
ছায়ায় বসিয়া পণু-বধার্থ সে একটি পাথরের তীর নির্মাণ 
করিল। নির্মাণ করিয়! তাহার পূর্ব পুরুষের কান্ঠ এবং চর্ম 
থওড এবং তাহার আপনার পাথরের তীরটি রাখিয়া মরিয়া 
গেল। তৃতীয় মনুষ্য সেই সবগুলি পাইয়া আরো একটু বেশী 


২৪ ত্রিধারা । 





স্থথশাস্তি লাভ করিল, ক্রেশ হইতে আরো একটু মুক্ত হইল, 
ভাহার জীবন-পথের যন্ত্রণা আরে! একটু কমিল, তাহার জীবন- 
পথের উপর তাহার পূর্বব পুরুষের ছায়া আরো! একটু প্রশস্ত, 
আরো! একটু ঘনীভূত হইল। এইরূপে মন্ুষ্য-পর্যযায় যত বাড়িতে 
লাগিল, মাষের পূর্বব পুরুষের ছায়াও তত বাঁড়িতে লাগিল, 
সেই ছায়ায় বসিয়া মান্ষের স্থুখ, শান্তি,সদ্বদ্ধি,সদাশয়, স্থুনীতি, 
স্থুরীত, সাতিকতা, সর্বাঙ্গীন সৌনর্ধ্য তত বৃদ্ধি হইতে লাগিল। 
ক্রমে সেই ছায়৷ বাড়িয়া বাড়িয়া গাঁ়তর হইয়া বিরাট-রূপ 
ধারণ করিল। সেই বিরাট ছায়ায় বসিয়! বিরাট মন্ুষ্য-সমাঁজ 
ধর্মরশান্ত্রে, ইতিহাসে, পুরাণে, দর্শনে, কাব্যে, বিজ্ঞানে, 
শিলে বিরাট-কীর্তি সম্পন্ন করিয়া বিরাট -সভ্যতা ষ্টি করিল। 
মানুষের মন পূর্ব পুরুষের বিরাট ছায়া পায় বলিয়াই বিরাট 
মূর্তি ধারণ করিতে পারে । নহিলে মান্থষের পর মানুষ, পুরুষের 
পর পুরুষ, পর্যায়ের পর পর্ধ্যায় পশু পক্ষীর নায় সমান কাঙ্গাল 
সমান শোকার্ড থাকিয়া যায়, জীবন-পথে সমাঁন তাঁপে জলিয়! 
পুড়িয়া মরিয়া যায় । মানুষের দেহ এবং মন উভয়ই ছায়ায় 
থাকিয়া রক্ষিত এবং পরিবদ্ধিত হয়। বাহজগতে এবং অন্ত- 
অগিতে ছুইখান1 প্রকাণ্ড সামিয়ানা টাান আছে। সেই দুই 
খান! সামিয়ানার ভিতর প্রকাও ছায়া-জগৎ ঝৌলান রহিয়াছে । 
তন্মধ্যে একখানা ছায়া-জগতে মানুষের দেহ আর একখানা 
ছায়া-জগতে মানুষের মন স্থথে বাস করিয়া! স্ুথ সম্দ্ধি লাভ 
করিতেছে । দেহ এবং মন উভয়েই পথের পথিক-_ছায়াঁ না 
পাইলে কি পথে চলিতে পারে? তবুও মানুষ বলে কি না যে 
ছায়! কিছুই নয় ! ছায়ায় থাকিয়া ছাঁয় চেনে না, ছায়া মানে 


ছায়া। চি 





ন! বলিয়। মানুষ এত চেষ্টা করিয়াও প্রকৃত মহত্ব এবং উন্নতি 
লাত করিতে পারে নাই। যেখানে মানুষ ছায়! মানে না 
সেখানে মানুষের সকল চেষ্টা বিফল হয়। আজিকার শিক্ষিত 
বাঙ্গালী ছায়ার মাহাস্থ্য মানে না। তাই স্বর্ম মর্ত্য পাঁতাঁল 
তোলপাড় করিয়াও দে আজ মানুষ নয়, পাশ্চাত্য সভ্যতার 
মহাকেন্ত্রস্থল বিলাত দর্শন করিয়াও বিকলমতি! মানুষের ছায়ায় 
বঞ্ধিত হইয়াও মানুষ যদি মানুষের ছায়া না মানে তাহা হইলে 
মাহ্ষ মাহষকে ছায়া দান করিতেও পারে না। ভাই আজি- 
কার শিক্ষিত বাঙ্গালী কি ন্বদেশীয় কি বিদেশীয় কোন দেশীয় 
আভপতাপিত পথিককে ছায়া দান করিয়া! জীবন-পথের যন্ত্রণার 
কিঞ্ষিন্নাত্রও উপশম করিতে পারিতেছে না । তাই আজিকার 
শিক্ষিত বাঙ্গালীকে বলি, ছায়! মাঁনিয়। ছাঁয়া দান করিও, 
মানুষও হইবে, জীবনও সার্থক হইবে। নিজে ভক্ত এবং 
কৃতজ্ঞ না হইলে অপরকে কি ভক্ত ও ক্লুতজ্ঞ করা যায়? 

ছায়া আত্মত্যাগের ফল। গাছের ছায়ায় গাছের রঙ 
থাকে না, গাছের দেহের পুর ও স্থুলতা থাকে না, গাছের 
জ্যোতি ও লাবণ্য থাকে না, গাছের তেজ থাকে না, গাছের 
রস থাকে না, গাছের ফুলের সৌরভ থাকে না, গাছের ফলের 
শাস বা নুম্বাদ থাকে না। গাছ সব ত্যাগ করিলে তবে 
গাছের ছায়া হয়। সব ত্যাগ করিয়া গাছ ছায়ারূপী হইলে 
তবে আতপতাঁপিত পথিকের আশ্রয়স্থল হয়। স্ত্রী পুত্র জনক 
জননী ভাই ভগিনী দাঁদ দাসী বন্ধু বান্ধব সুখ সম্পদ ভোগ 
বিলাস সব তাগ করিয়। সৃক্্ম ছাঁয়ারূপী হইলে পর তবে বুদ্ধ 
চৈতন্য অসংখ্য আতপতাপিত অনস্তপথের-পথিকের বিশ্রামস্থান 


২৬ ত্রিধারা । 





হইয়াছিলেন। তুমি আমি ক্ষুদ্রলোক, বুদ্ধ চৈতন্য হইতে পারিব 
না। কিন্তু আমরা যেমন তেমনি ছায়ারূগী হইয়া তেমনি শ্ব্প 
প্রাণীর আশ্রয়স্থান হইতে পারি ত। কিন্তু সেইরূপ ছায়ারূপী 
হইতে হইলেও আমাদিগকে আমাদের অনেক জিনিস পরিত্যাগ 
করিতে হইবে। বহু দিন হইল আমার একটি হিন্দু বালিকার 
সহিত সাক্ষাৎ হয়। সাক্ষাৎ মাত্র তাহার উপর আমার স্তেহ 
জন্মে। বালিকা তিন চারি বৎসরের মধ্যে যৌবনে পদার্পণ 
করিল। তখন তাহার দেহ যেন যোলকলায় পূর্ণ হইয়া উঠিল। 
পূর্ণ জোয়ারে সুন্দর শ্রোতস্থিনী যেন কুলে কুলে পুরিয়া উঠিল, 
গাঙ্গ -ভরা জল যেন ছম. ছম. করিতে লাগিল। যুবতী শ্যামাজী 
_ কিন্তু শ্যামাঙ্গে সৌন্দর্য্য যেন ধরে না- শ্যামার্গীর সৌন্দর্যের 
ছটা যেন টাদের হাসির ন্যায় হাসিয়া বেড়াইতে লাগিল। বোধ 
হইতে লাগিল যেন যুবতীর পূর্ণ-প্রক্ষ,টিত দেহে পৃথিবীর সমস্ত 
খর নংযুক্ত হইয়াছে । অত ধশ্বধ্য পাইয়াছেন বলিয়াই যুবতী 
যেন লজ্জার অত কুষ্ঠিত। এই সময় কিছু দিন আমি তাহাকে 
দেখিতে পাই নাই। আবার যথন দেখিলাম, তখন আর 
ভাহাকে দেখিলাম না, দেখিলাম তাহার একখানি ক্ষীণ পাগু,বর্ণ 
ছায়। বমিয়| রহিয়াছে! তাহার দেহের তত খশ্বধ্য তাহার দেহে 
নাইনে সমস্ত খর্বব্য তাহার ছায়ারূপী দেহের ছায়ারূপী অঙ্ক- 
স্থিত শত-দল-পন্ম-সদৃশ একটি শিশর দেহে অপিত হইয়াছে! 
শশবধ্যরূপিণী যুবতী আপনার সমজ্ত ধশ্বধ্য সভ্তভানকে দিয়া 
আপনি ছায়ারূপিনী জননী হইয়াছেন! তখন মনে হইল এমন 
করিয়া আপনার খশ্বধ্য পরকে দিতে বুঝি বুদ্ধ, চৈতন্যও পারেন 
না, পরের জন্য বুদ্ধ চৈতন্যও বুঝি এত ছায়ারূপী হইতে পারেন 


বউ কথা কও। ২৭ 


না। যুবতীকে জননী হইতে দেখিয়া বুঝিলাম যে জগতে ছায়া 
হইতে না পারিলে জগতে মান্ষের জীবন বৃথা। আর 
বুঝিলাম যে যুবতী অপেক্ষা! জননী সুন্দর এবং বৃক্ষ অপেক্ষা! 
বৃক্ষের ছায়া সুন্দর, কেন না জননী অন্যের জন্য যুবতীর লব 
ত্যাগ করিয়া ছায়ারূপিনী হন এবং বৃক্ষের ছায়! অন্যের জন্য 
বৃক্ষের সব ত্যাগ করিয়া ছায়ারূপ ধারণ করে । জগতে যদি 
সার্থক ও সুন্দর হইতে চাঁও ভবে বৃক্ষ ও জননীর ন্যায় আঁপ- 
নার নব ত্যাগ করিয়। ছায়ারূপ ধারণ কর। ছাঁয়াই পৃথিবীর 
সার পদার্থ। ছায়ার অর্থ বুঝিয়া ছায়া হইয়া পৃথিবীর সার 
পদার্থ হও । 


বউ কথা কও । 





“বৌ কথা কর, করে বিনয়, ভাঙছে বয়ের মাঁন।” দীনবন্ধু 
প্রভাত বর্ণনায় এইরূপ লিখিয়াছেন। কথাটী কিন্ত ঠিক 
নয়,_বউ-কথা-কও সকল সময়েই, সকাল সন্ধা! সকল সময়েই, 
বউ কথা কও বলে-_তথাপি দীনবন্ধুর কথাটা ঠিক নয়। 

বঙ্গের___-জেলাঁয় কৌশিকী নদী প্রবাহিতা। নদীটি 
ক্ষুদ্র । দেখিতে যেন এক ছড়া রূপার হার। নদীর ছুই 
কুলে শস্যক্ষেত্র, আত্রকানন, ও প্রাচীন জনপূর্ণ পল্লিগ্রাম । 
পল্লিবাশিনীরা নদীর জলে বাসন মাজে, ন্নান করে, সন্ধ্যার 
প্রাক্কালে আগ্রিবনিমজ্জিতা হইয়া সুখ ও নংসাঁরের কথা কয়। 
নদীতে প্রচুর মৎস্য-_পলিবাসীরা মনের সাধে মাছ খায়। 


২৮ ত্রিধারা । 





কৃষকেরা নদীর জলে আপন আপন ক্ষেত্রে সোণা ফলায়। 
কৌশিকীধোৌত জনপদে “অকাল অজন্মা” হয় না । 

কৌশিকীতীরে-_গ্রাম। গ্রাধানি প্রাচীন এবং বহুসংখ্যক 
ভদ্রলোকের বাসস্থান । গ্রামের একস্থানে কৌশিকীর ধারে 
একটা বৃহৎ আঅকানন। দেই আত্কাননে ঘোষ মহাশয়দিগের 
বাড়ী। বৃহৎ গোষ্ীর বৃহৎ বাঁড়ী। বাড়ী সাত কি আট অংশে 
বিভক্ত। এক অংশের কর্তা লক্ষমীকাস্ত ঘোষ। লক্ষমীকাস্তের 
পাচ সহোদর । লম্দমীকান্ত বর্ষীয়ান পুরুষ। তাহার পাঁচটা 
সহোদরেরই বিবাহ হইয়াছে । এবং তাহাদের সকলেরই 
সন্তানাদি হইয়াছে। ছেলে মেয়ে পৌত্র পৌত্রী দৌহিত্র দৌহিত্রী 
প্রভূতিতে লক্ষমীকান্তের গৃহ একটা জনপদতুল্য 

লক্্মীকান্তের লক্ষ্মী স্থপ্রসন্ন। তাহার একখানি তানুক 
আছে। তাহার আয় নিতান্ত কম নয়। সেই আরে তীহার 
বাড়ীতে সদাত্রত দোল ছুর্গোৎ্সব বার মাসে তের পার্বণ সকলই 
অতি সুচাকু রূপে সম্পন্ন হয়। তাহার বাড়ীতে ভিক্ষুক নিরাশ 
হয় না, দায়পগ্রস্থ ব্যক্তি ভগ্মনোরথ হয় না, জ্ঞাতি উপেক্ষিত 
হয় না, কুটুম্ব পরিচর্ধ্যায় মুগ্ধ হয়। তাহার গোলাবাড়ীতে বড় 
বড় শস্যপূর্ণ গোলা। তাহার গোয়ালবাঁড়ীতে বহুসংখ্যক 
গাভী ও হলবাহী বৃষ । তীহার বাগাঁনে আত কাটাল নারিকেল 
তিস্তিড়ি প্রভৃতি নানাবিধ বৃক্ষ । তাহার বড় বড় পুক্ষরিণী__ 
তাহার জল অম্বতের ন্যায় স্বাছ ও স্থাস্থ্যকর-_পুক্ষরিণীতে 
অজত্র মৎস্য । তিনি পুণ্যবান-_তীহার সংলার সুখের সংসার, 
তাহার ভাগ্ার লক্ষ্মীর ভাওার। 

লক্ষমীকান্তের পত্ী বিদ্যাবতী লক্মীকান্তের গৃহের গৃহিধী। 


বউ কথা৷ কও। ২৯ 





বিদ্যাবতী রূপে গুণে লক্ী। বিদ্যাবতীর অনেকগুলি দৌহিত্র 
দৌহিত্রী। তাহার জোন্ঠ পুত্রের একটী পাচবৎসরের পুত্র- 
সম্ভান। বিদ্যাবতী এষ বৃহৎ পরিবারের-_এই বৃহৎ নংসারের 
অধিষ্ঠাত্রী দেবী। পতি পুত্র পুত্রবধূ কন্যা দেবর দেবরপত্থী 
ননদন কুটুপ্ষিনী পরিচারক পরিচারিকা সরকার গোমস্তা 
গুরুমহাশয় পাইক চৌকিদার রাখাল কুষাঁণ গাভী গোবৎস তিনি 
সমান যত্বে সকলেরই নেবা ও পরিচর্যা করিয়া! থাকেন-_ 
সকলেই তাহার স্নেহে মুর! 

আর স্বয়ং বিদ্যাবতী তাহার পুত্রবধূর গুণে মুগ্ধ । তাহার 
বৃহৎ সংসারের বৃহৎ যজ্ঞবৎ নিত্য শুশ্রষায় তাহার পুত্রবধূই 
তাহার প্রধান সহায়_-তাহার দক্ষিণ হস্ত স্বরূপ । পুত্রবধূর 
নাম সরস্বতী । সরন্বতী যেমন ঘরের মেয়ে, যেমন ঘরের বউ, 
তাহার গুণও তেমনি । বউ লইয়! শ্বাশুড়ি পাগল। বউ 
কাছে থাকিলে শ্বাশুড়ির চক্ষে পলক পড়ে না । শ্বাশুড়ি মনে 
করেন, বউ আছে তাই আমার সব আছে, বউ গেলে আমার 
কিছুই থাকিবে না, আমার সোণার সংসার ছারখার হইয়া 
যাইবে । 

এ কথা আমরা সকলেই জানি।_-আঁজ আর এক কথা 
শুনাইব। 

বিদ্যাবতী প্রাতঃক্নান করিয়া রন্ধনশালায় প্রবেশ করিয়। 
দেখেন বউ তথায় নাই__রন্ধনের কোন আয়োজনই হয় নাই। 
পূর্ব রাত্রিতে বউয়ের কিঞ্চিৎ পীড়া হইয়াছিল তিনি তাহা 
জানিতেন না । হঠাৎ তাহার রাগ হইল। তিনি রাগভরে 
বধূর নিকট গিয়া বলিলেন-_বাছা, এ ত তোমার পিত্রালয় 


৬5  ত্রিধারা 





ময় যে গৃহকর্ট্নে অবহেলা করিবে । বিদ্যাবভীর যেমন রাগ 
হইয়াছিল তাহার তিরস্কার তেমন কটু হইল না বটে; কিন্তু 
তিরঙ্কার কিছু মিঠে রকম হইল বলিয়াই বধূর প্রাণে কিছু 
বেশী বিধিল। 

শ্বাশুড়ি রন্ধন করিতে লাঁগিলেন__বেলা হইতে লাগিল । 
তথাপি বধুরন্ধনশালায় আসিলেন নাঁ। আরো বেলা হইল _ 
তখন শ্বাশুড়ি বধুকে ডাকিতে লাগিলেন--তথাপি বধূ রন্ধন- 
শালায় আঁসিলেন না । তখন শ্বাশুড়ি একবার বধর ঘরে গিয়া 
দেখিলেন, বধু গৃহের একটী কোণে বসিয়। আছেন, তাহার 
অবগুঠনবন্ত্র চক্ষের জলে ভিজিয়। গিয়াছে । বিদ্যাবতীর হৃদয় 
ব্যথিত হইয়া উঠিল--তিনি বধূর হাত ধরিয়া তাহাকে কতই 
বুঝাইলেন | কিন্তু বধু উঠিলেন না। তখন বিদ্াবতীর ছুঃখের 
উপর ভয় হইল। তিনি কর্ভাকে অস্তঃপুরে ভাকাইয়া আনা- 
ইয়া তাঁহাকে কাতর স্বরে সকল কথা বলিলেন। লক্ষমীকাস্ত 
পত্রীকে কিঞ্চিৎ তিরস্কার করিয়া মহা ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। 
প্রথমে সহোদরদিগকে, তৎ্পরে কন্যাগণকে, তারপর দৌহিত্র 
দৌহিত্রীরিগকে, তারপর ভরাতৃবধূদিগকে, তারপর পরিচারিকা- 
দিগকে--এইরূপে বাড়ীর স্ত্রী পুরুষ বালক বালিকা সকলকে 
জড় করিয়া বলিলেন_-“আজ বড় বিপদ, আজ বউমা রাগ 
করিয়াছেন, তোৌমর! সকলে যেমন করিয়। পার বউমাকে 
সান্তনা কর, বউমা মা উঠিলে আমি আজ জলগ্রহণ করিব না।” 
তখন সকলেই কর্তা মহাশয়ের ন্যায় ব্যতিবাস্ত হইয়। পড়িল । 
মেয়ে পুরুষ বালক বালিকা পরিচারিক! গ্রভৃতি সকলেই বধূকে 
অন্থনয় বিনয় করিতে লাগিল। তথাপি বধূ উঠিলেন না। 


বউ কথা কণড। ত$ 





বেল! তখন দ্বিগ্রহর -সুধ্যদেব মধ্যাকাশে-তখনও লক্ষ্মীকান্তের 
বাড়ীর শিশুদিগের পর্যাস্ত আহার হয় নাই। এক বধূর জন্য 
লক্ষমীকান্তের সেই সোথার সংসারে কাহারো মনে তখন মুখ 
নাই-_সকলেই সশঙ্কিত ও সন্তপ্ত-সকলেই ভাবিতেছে, বেল! 
দ্িপ্রহর হইল, বধূ এখনো মুখে হাঁতে জল দিলেন না, না জানি 
কি অমঙ্গলই ঘটিবে! দ্বিপ্রহর অতীত হইল । ছুই একটা শিশু 
খাইবার জন্য কীদিতে আরম্ভ করিল । লক্ষমীকাস্ত আর থাকিতে 
পারিলেন না। তুমি কি অনর্থই . ঘটাইলে, পত্বীকে এই কথা 
বলিয়। লক্মীকান্ত স্বয়ং বধূর কক্ষা ভিমুখে গমন করিলেন । বিদ্যা- 
বতী জড়নড হইয়া তাহার পশ্চাতে পশ্চাতে গমন করিলেন । 
ঠিক সেই সময়ে সেই গভীর আত্রকানন মধ্যে পাখী ভাকিল-- 
বউ কথা কও 
লক্ষ্মীকান্তের পাঁচ বৎসরের পৌত্র বলিয়া উঠিল-_মা, $ 
তোকে কে কথা কইতে বল্চে ! বিদ্যাবতী বলিলেন-__মা, 
কোথাকার বনের পাখী আশিয়া তোকে নাধিতেছে, তবুও 
উঠিবি না মা। লক্মীকাস্ত বলিলেন_উঠ মা, তুমি আমার 
গৃহের লক্ষ্মী, তুমি অনাহারে থাকিলে আমার সংসারের অমঙ্গল 
হইবে । সরন্বতী শিশুকে কোলে লইয়। আস্তে আস্তে উঠিলেন। 





বউ-কথা-কও, ডাকে সকল পময়েই-প্রভাতেও ডাঁকে-- 
কিন্তু বউয়ের মাঁন ভাঙ্গে কেবল দিপ্রহরে ৷ প্রভাতে পত্রী 
মান হয়, বউয়ের মান হয় না। বউ-কথা-কও শয়নগৃহের পাখী 
নয়_-সংসারাশ্রমীর সংসারক্ষেত্রের পাখী। হিন্দুর বধূর অপীম 


৩২ ত্রিধারা । 


গৌরব আর বউ-কথা-কও পক্ষী সেই অসীম গৌরবের অনস্ত- 
প্রেরিত অনন্ত-বিহারী গায়ক।. 





দর বধূর অসীম গৌরব । কেন নাহিন্দুর বধূ ভূত ও 
ভবিষ্যতের গর্থিস্থল। বধূ বিনা হিন্দুর উত্তর পুরুষের অভাব 
হয় এবং উত্তর পুরুষের অভাব হইলেই পূর্ব পুরুষেরও অভাব 
হয়। বধূ বিনা বংশের ধার! অবিচ্ছিন্ন থাকে না_সমস্তকুলম্মতি 
ব্যর্থ ও লুপ্ত হইয়া যায় বর্ধিত ও পরিবর্ধনশীল শক্তি ছারখার 
হইয়! এুকান্তিক অকর্পণ্যতায় পরিণত হয়। তদপেক্ষা লজ্জা, 
স্বণা, হীনতা আর নাই। ক্কত্ক্রিয়া অর্থাৎ যে স্থষ্টিতে 
সি রক্ষা হয় সেই সষরক্রিয়া সর্বাপেক্ষা গৌরবের কার্ধ্য। 
ভগবানের সর্ব প্রধান কার্য ক্ষ্টি। বিনা পুণ্যে স্থষ্টি হয় না__ 
যেখানে পাপ সেখানে স্ৃট্টি অম্ভব। আর বিনা পুণ্যে স্থটি 
রক্ষাও হয় না_ পরিবার বল, সমাজ বল, জাতি বল, পাপ স্পর্শে 
সকলই লয় হইয়া যায়। অতএব পারিবারিক স্থিতি ও বংশা- 
বলীর ধারাবাহিকতা পুণ্যরূপ মহাঁশক্তির ফল। এবং সে 
জন্য পারিবারিক স্থিতি ও পুরুষের ধারাবাহিকতা হিনুদিগের 
মধ্যে এত প্রার্থণীয় ও এত গৌরবের জিনিস. হিুর বধূ সেই 
পারিবারিক স্থিতি ও ধারাবাহিকতার হেতু বলিয়া তাহার 
গৌরব অসীম । এবং সেই জন্যই সেই অনন্ত-প্রেরিত অনন্ত- 
বিহারী বউ-কথা-কও পাখী গৌরবরূপিনী হিন্দুর বধূর উপাসনায় 
ও গৌরব কীর্ভনে নিযুক্ত । 


ছুইটি হিন্দু পত়ী। 


পড়ী একমনে পতিকে ভক্তি শ্রদ্ধা করিবেন__পতির সহস্র 
অপরাধ নত্বে পত্ী তাহাতে অন্ুরক্তা থাকিবেন এবং তাহার 
তুষ্টিসাধন করিবেন--পতিতে পত্থী সম্পূর্ণরূপে আস্মবিসর্জন 
করিবেন--প্রাচীন সংস্কৃত পুরাণ সংহিতা কাব্যাদিতে এইরূপ 
উপদেশ দেখিতে পাওয়া যায়। বষ্চিম বাবুর বিষবৃক্ষ ও কৃষ্ণ 
কান্তের উইল প্রাচীন সংস্কত গ্রস্থ নয়, আধুনিক বাজালা গ্রস্থ। 
এই ছুইখানি আধুনিক গ্রন্থে ছুইটি পত্রী.দেখিতে পাওয়া যায়_- 
বিষবৃক্ষে সথর্ধযমুখী, কৃ্ণকান্তের উইলে ভ্রমর । হ্ৃর্ষ্যমুখী ও ভ্রমর 
প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের আদর্শ পত্বীর সদৃশ কিনা একবার 
বুঝিয়া দেখ আবশ্যক । 

বঙ্কিম বাবুর উপন্যাস দুইখানির প্রারস্তে দেখিতে পাওয়া 
যায় যে সুরধ্যমুখী ও ভ্রমর উভয়েই পতিঞ্রেমে মুগ্ধ । হুরধ্যমুখী 
বলেন-_-"পৃথিবীতে যদি আমার কোন সুখ থাকে, ত সে দ্বামীঃ 
পৃথিবীতে যদি আমার কোন চিন্তা থাকে,তবে সে স্বামী ; পৃথি- 
বীতে যদি আমার কোন কিছু সম্পত্তি থাকে, তবে নে শ্বামী।” 

ভ্রমর বলেন-_-“আমি তোম1 ভিন্ন এ জগৎসংসারে আর 
কিছু জানি না। আট বৎসরের সময়ে আমার বিবাহ হই- 
যাছে_-আমি সতের বৎসরে পড়িয়াছি। আমি এ নয় বৎসর 
আর কিছু জানি না, কেবল তোঁমাঁকে জানি ।” 

' আরো দেখা বায় যে কু্যমুখী ও ভ্রমর গতিতে কেবল মুগ্ধ 

মন, দেবতা বা ওরুপদারূঢ় ভাবিয়া পতির প্রতি ভক্তের ন্যায় 
ভক্তিমতী | 





৩৪ ত্রিধার|। 


্ধ্যমুখী স্বামীকে বলিতেছেন--“তুমি আমার সর্বস্ব । তুমি 
আমার ইহকাল, তুমিই আমার পরকাল ।: তুমি পাপ হ্্যুখীর 
জন্য দেশত্যাগী হইবে? তুমি বড় না আমি বড় ?” 

ভ্রমর স্বামীকে বলিতেছেন_"আমি তোমার স্তর, শিষ্যা, 
জশ্রিতা, প্রতিপালিতা ।” 

পতির প্রতি প্রেম ও ভক্তি হৃর্ধ্যমুখী ও ভ্রমর উভয়েরই 
লমান। প্রেমের কথা এখন ছাড়িয়া দি। প্রর্ুত প্রেমের 
পাত্রের প্রতি যে ভক্তি সর্বত্র অবশ্যস্তীবী এ ভক্তি কেবল সে 
ভক্তি নয়। এ তক্তি একমাত্র হিন্দু পড়্ীর তক্তি। এ পর্ধাস্ত 
দেখিতেছি স্থধ্যমুখী ও ভ্রমর উভয়েই নমভাঁবে হিন্দু পত্বীর 
লক্ষণাক্রাক্ত! ৷ 

পত্ীদ্ধয় যেমন পতিদয়ে মুগ্ধ, পতিদ্বয়ও তেমনি পড়ীদ্বয়ে 
মুগ্ধ । কিছুদিন এইরূপে গেল । তাহার পর উভয় পড়ীর ভাগ্যে 
একই রকম বিড়স্বনা ঘটিল। নগেন্দ্রনাথ কুন্দনন্দিনীতে আসক্ত 
হইলেন, গোবিন্দলাল রোহিণীতে আসক্ত হইলেন । ছুই জনের 
আসক্তিই প্রবল--উন্মত্ততার তুলয। এই বিড়ম্বনায় পড়িলে 
পর দুইটি পড়ীতে বিষম পার্থক্য প্রকাশ পাইল। ছুইজনেই 
মর্দাহত হইলেন সত্য; কিন্তু মর্মাহত হইয়া একজন পতিকে 
স্থধী করিবার সঙ্কল্প করিলেন আর একজন পির উপর দুর্জয় 
রাগ ও অ'ভমান করিলেন। ছুইটি পত্রীর ছই প্রকার আঁচ- 
রণের ফল বড় বিভিন্ন হইল । 

থর্্যমুখী যখন দেখিলেন যে কুন্দননিনীকে ন! পাইলে 
নগেন্রনাথের জীবন ক্রেশময় হইবে, হয়ত নগেন্দ্রনাথ দেশত্যাগী 
হইবেন, তখন নগেন্দ্রনাথের উপর তীহার কিছুমাত্র রাগ বা 


ছুইটি হিন্দু পড়ী। ৩৫ 


অভিমান হইল না, তখন তিনি নগেন্দ্রনাথকে স্ুথী করিবার 
জন্য নিজেই উদ্যোগী হইয়া কুন্দের সহিত নগেন্দ্রের বিবাহ 
দিলেন। রাগ অভিমানাদি না করিয়া এমন করিয়া স্বামীকে 
সুখী করিতে এক হিন্দু পত্রী ভিন্ন আর কেহ পারে না । কিন্ত 
গ্বামীকে ন্থখী করিয়া স্থ্য্যঘুখী নিজে স্থুখী হইতে পাঁরিলেন না। 
ভাবিয়াছিলেন স্থুখী হইবেন-_হিন্দু পডী মাত্রই ভাবিয়া থাকেন 
স্বামীর সুখেই আপনার স্থখ। কিন্ত স্ধ্যমুখী সুখী হইলেন 
না। ভাই তিনি গৃহভ্যাগ করিলেন। 

কিন্ত গৃহত্যাগ করিয়া! স্ুর্ধামুখীর যন্ত্রণ' বৃদ্ধি হইল। শ্বামী 
সপত্ী লইয়া গৃছে ন্ুখভোগ করিতে লাগিলেন বলিয়া যন্ত্রণা 
নয়। ন্বামীদর্শনে বঞ্চিত বলিয়া যন্ত্রণা। তখন ন্ুর্যমুখী 
বুঝিলেন__তাহার নিজের কিছুই নাই, তাহার সমস্তই তাহার 
স্বামীর। তখন তিনি আপনাকে আঁপনি বলিলেন-__“ম্বামীর 
আর কেহ থাকে থাক্‌, আমার ত ম্বামী বই আর কেহ নাই, 
আমাতে ত স্বামী বই আর কিছুই নাই" আর বলিলেন__ 
“আমাতে যখন স্বামী বই আর কিছুই নাই তখন আমার স্বামীর 
কুন্দের জন্য আমার জালাই ব1 কি যন্ত্রণাই বা কি; আমার স্বামীও 
যেমন আমার, আমার শ্বামীর কুন্দও তেমনি আমার |” তখন 
রাধা যেমন জালা যন্ত্রণা মান অভিমান সব ভুলিয়! কুষ্ণলাভার্থ 
প্রভাসে ছুটিয়াছিলেন, স্্যামুখীও ভেমনি সমস্ত জালা যন্ত্রণা 
ভুলিয়! নগেন্দ্রলাভার্থ গোবিন্দপুরে ছুটিলেন।--যে কুন্দের জন্য 
স্বামী ত্যাগ করিয়া গিয়াছিলেন, স্বামীর সেই কুন্দকে লইয়! 
স্বামীতে মিশিয়। থাকিবেন বলিয়া স্বামীলাভার্থ গোবিন্দ পুরে 
ছুটিলেন। স্থৃধ্যমুখীতে যে একটু “আমিত্ব' ছিল, তীহার প্রেমে 


৩৬ ত্রিধারা। 





ঘে একটু স্বার্থের তাঁজ ছিল, তাহা আর রহিল না। তাহার 
প্রেম এখন সম্পূর্ণরূপে নিঃস্বার্থ হইয়া! প্রেমের যে চরম, যে 
আবর্শমূর্তি তাহাই ধারণ করিল। প্রেমের সে মূর্তি অন্য দেশে 
কেবলমাত্র কবির কল্পনাক্প বা আকাক্ষায় থাকে, এদেশে অনেক 
পতিপরায়ণ পত্ীতে থাকে । অন্যদেশে পড়ী পতির অনুরোধে 
নিজের অনেক ন্দুখে জলাঞ্জলি দিতে পারেন এবং দিয়াও 
থাকেন। কিন্ত এমম করিয়া সপড্ীর জাল! ভুলিয়া! সপত্বীকে 
সঙ্গে লইয়া! পতিতে মিশিয়া থাকিতে এক হিন্দু পত্বী বই আর 
কেহ পারে না*। অন্য দেশে যে প্রেম কল্পনার সামগ্রী মাত্র, 
এদেশে তাহা নারীজীবনে ভ্রষ্টব্য। হিন্দুপত্ীকে না বুঝিলে 
প্রেমরহস্য পূর্ণমাত্রায় বুঝা যায় না। ইউরোপ কখন প্রেম- 
য়হস্য পূর্ণমাত্রায় বুঝে নাই । তাই বিষবৃক্ষের ইংরাজি 
অন্থবাঁদ পড়িয়া ইউরোপবাসী কুষ্যমুখীকে বুঝিল না । আমরা 
ঘরে ঘরে হৃ্ধ্যমুখী দেখিয়া থাকি। তাই আমরা বুঝিয়া থাকি 
যে স্র্্যমূখী প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের আঁদর্শীন্ষায়ী পূর্ণমান্রায 
হিন্দুপড়ী অর্থাৎ প্রেমের চরম মৃষ্তি। 

ভ্রমর যখন জাঁনিতে পারিলেন যে গোবিনালাল রোহিগীতে 
অন্রক্ত, তখন তিনি রাগে এবং অভিমানে যেন আত্মহার। হই- 
লেন। তিনি স্বামীকে লিখিলেন।__ 

“ভূমি মনে জান বোধ হয় যে তোমার প্রতি আমার ভক্তি 
অচলা-__তোমার উপর আমার বিশ্বাস অনস্ভ। আমিও তাহা 
জানিভাম। কিন্তু এখন বুঝিলাম যে তাহা নহে। যতদিন 


* হয়ত কোন পাঠক এইখানে মনে করিবেন যে আমি পুরুষের বহুবিবাহের 
ষা সপত্বী প্রথার পক্ষপাতী । 





ছুইটি হিন্দু পত্বী। তর 


তুমি ভক্তির যোগ্য, ততদিন আমারও ভক্তি; গান সু 











বিশ্বাসী, ততদিন আমারও বিশ্বান। এখন তোমার উপর 
আমার ভক্তি নাই-বিশ্বানও নাই। তোমার দর্শনে আমার 
আর স্থুখ নাই ।” 

কুন্দনন্দিনীর উপর পতির অনুরাগ দেখিয়। সু্ধ্যমুখী ভাঁবিয়া- 
ছিলেন যে, কুন্দকে না পাইলে পতি যদি অন্দুখী হন,তবে আমি 
নিজেই পতিকে কুন্দনন্দিনী দিব। ইহ প্রেমের আত্ম-বিসর্জন । 
প্রেমের এরূপ আত্ম-বিসর্জন অন্যদেশে অসম্ভব হইতে পারে, 
কিন্তু ইহা হিন্দু পত্ীর একটি সচরাচর-দৃষ্ট লক্ষণ । এ লক্ষণ কিন্ত 
ভ্রমরে নাই । ভ্রমর যখন জানিলেন যে তাহার পতি রোহিণীর 
আকাজ্ফী তখন তিনি এমন ভাবিলেন না যে রোহিবীকে গ্রহণ 
করিতে না পাইলে পতি যদি অন্ুখী হন, তবে তিনি রোহিণীকেই 
গ্রহণ করুন । তখন পতির উপর তীহার কি বিষম রাগ হইল 
তাহ। তাহার উদ্ধত কথাঁগুলিতেই প্রকাশ । 

আবার যখন ভ্রমরের নিতাস্ত কাতর মিনতিতে কর্ণপাত না 
করিয়। গোবিন্দলাল তাহার নিকট একরকম চিরবিদায় গ্রহ্থণ 
করিলেন, তখন ভ্রমর গোবিন্নলাঁলকে কি বলিলেন শুন__ 

“তবে যাও-পার, আসিও না। বিনাপরাধে আমাকে 
ত্যাগ করিতে চাও, কর ।-_কিন্ত মনে রাখিও উপরে দেবতা 
আছেন । মনে রাখিও-একদিন আমার জন্য তোমাকে 
কাদিতে হইবে । মনে রাখিও--এক দিন তুমি খুঁজিবে, এ 
পৃথিবীতে অকৃত্রিম আন্তরিক ন্নেহ কোথায় ?--দেবত। সাক্ষী ! 
যদি আমি সতী হই, যদি কার়মনোবাক্যে ডোমার পায় আমার 
ভক্তি থাকে, তবে তোমায় আমার আবার সাক্ষাৎ হইবে। 


৪ 


৩৮ ত্রিধারা 





আমি সেই আশায় প্রাণ রাখিব । এখন যাও, বলিতে ইচ্ছা হয়, 
বল যে আর আমিব না। কিন্তু আমি বলিতেছি_-আবার 
আসিবে__-আবার ভ্রমর বলিয়া ডাকিবে-আবার আমার'জন্য 
কীাদিবে। যদি একথা নিষ্ষল হয় তবে জানিও-দেবত। মিথ্যা, 
ধর্্ মিথ্যা, ভ্রমর অসতী ! তুমি যাও আমার ছুখে নাই ! তুমি 
আমারই-_রোহিণীর নও ।” 

“এই বলিয়। ভ্রমর, ভক্তিভাবে স্বামীর চরণে প্রণাম করিয়া! 
গ্রজেন্দ্রগমনে কক্ষান্তরে গমন করিয়! দ্বার রুদ্ধ করিলেন ।” 

সাত বৎমর পরে ভ্রমর যখন প্রায় মৃত্যুশয)ায, গোবিন্দলাল 
তখন পেটের জালায় ভ্রমরের নিকট আসিতে চাঁহিলেন। 
প্তখন ভ্রমর, বিরলে বপিরা, নয়নের সহস্রধারা মুছতে মুছিতে, 
সেই পত্র গড়িলেন। একবার, দুইবার, শতবার, সহস্রবার 
পড়িলেন।” তাহার পর “প্রণামা শতসহস্্ নিবেদনঞ্চ বিশেষ” 
এই পাঠে গোবিন্দল!'লের পত্রের প্রত্যুত্তর লিখিলেন। প্রত্যু- 
ত্বরের শেষ কথা এই £-_ 

“আপনার আসার জন্য সকল বন্দোবস্ত করিয়া রাখিয়া 
আমি পিত্রালয়ে যাইব। যতদিন না আমার নূতন বাড়ী প্রস্তত 
হয়, ততদিন আমি পিত্রালয়ে বাম করিব। আগনার সঙ্গে 
আমার ইহজন্মে আর সাক্ষাৎ হইবার সম্ভাবনা নাই। ইহাতে 
আমি সন্তষ্ট_-আপনিও যে সন্ধপ্ট তাহায় আমার সনোহ নাই” 

এখনও সেই বিষম রাগ ! এখন গোবিন্দলালের সে রোহিনী 
লাই_-এখন গোবিনলাল লজ্জায় ত্বণায় মৃতবৎ, অন্নকষ্টে কিষ্ট। 
তথাপি গোবিন্মলালের উপর ভ্রমরের এখনও সেই বিষম রাগ! 
ুর্ঘাুখী হইলে, এরূপ পত্র লেখা দুরে থাকুক, ্য়ং স্বামীর 


ছইটি হি পরী ৩ 





নিকট ছুটিয়া গিয়! শ্বামীর পায় ধরিয়া শ্বামীকে গৃহে আনয়ন 
করিতেন । চা 

তবে কি ভ্রমর হিন্দু পত্তী নন? 

স্বামীর উপর ভ্রমরের বিষম রাগ সত্য । কিন্তু এত রাগেও 
স্বামীর প্রতি ভ্রমরের হৃদয়ভর৷ তক্তি-প্রাণভরা প্রেম__শ্বামীই 
ভ্রমরের ধ্যান জ্ঞান উপাসনা আরাধনা । বিষম রাগভরে স্বামীকে 
তিরস্কার করিতে করিতেও ভ্রমর বলিলেন_-“্যদি কায়মনো- 
বাক্যে তোমার পায় আমার ভক্তি থাকে, তবে তোমায় আমায় 
আবার পাক্ষাৎ হইবে ।” বিষম রাগভরে স্বামীকে বিদায় দিয়! 
চলিয়া যাইবার সময়ও ভ্রমর ভক্তিভাবে স্বামীর চরণে প্রণাম 
করিয়! কক্ষাস্তরে গমন করিলেন। আবার প্রায় সেই শেষের 
দিনে, যখন স্বামীর উপর ভ্রমরের তেমনি বিষম রাগ, তখন ভ্রমর, 
বিরলে বিয়া, নয়নের নহত্র ধারা মুছিতে মুছিতে, স্বামীর সেই 
পত্র পড়িলেন। একবার, ছুইবার, শতবার, সহস্রবার পড়িলেন। 
এবং স্বামীর পত্রের প্রত্যু্তরে যে পত্র লিখিলেন_যাহাতে 
ত্বামীকে বলিলেন, “আপনার সহিত সাক্ষাৎ না হইলেই আমি 
সন্তষ্ট'_-তাহা “প্রণামা শতসহত্্র নিবেদনঞ্চ বিশেষ” এই 
সম্মান ও ভক্তিহ্ছচক পাঠে লিখিলেন। 

এত রাগের সঙ্গে সঙ্গে এত প্রেম, এত ভক্তি_এ রহস্য 
ভেদ করে কাহার সাধ্য ? বিজ্ঞানের অনেক রহদ্য আছে, 
দর্শনের অনেক রহস্য আছে, কাব্যের অনেক রহস্য আছে, 
জড়জগতের অনেক রহস্য আছে, অন্তর্জগতের অনেক রহস্য 
আছে, কিন্ত ভ্রমরের হৃদয়ের এই রহস্যের মতন রহস্য বু।ঝ আর 
নাই। দেবতারা এ রহস্য বুঝিতে পারেন কি না৷ বলিতে পারি 


$০ ত্রিধারা । 








না। অমর হিন্দু পরী বরিয়াই ভ্রমরের হ্বদয় এই রহসাপূর্ণ। 
অপরাধী পতির উপর এত রাগ সত্বে এত প্রেম, এত ভক্তি, এক 
হিন্দু পরী ভিন্ন আর কোন পরীর হয় না। ইউরোপ বল, 
আমেরিকা বল, নর্বন্রই দেখি, যেখানে পতির উপর বিষম রাগ, 
দেই খানেই পতির প্রতি বিষম স্বণী, বিষম বিরাগ । কিন্ত বঙ্গে 
হিন্দুর গৃহে অপরাধী গতির উপর বিষম রাগের সঙ্গে সঙ্গে প্রগাঢ় 
প্রেম ও পূর্ণ ভক্তি দেখিতে পাই। প্রেমের এ লক্ষণ, এ মৃষ্ত 
এক হিন্দু পন্থী ভিন্ন আর কোন পড়তে দেখিতে পাওয়া যায় না, 
বোঁধ হয় দেখিতে পাইবারও নয় । হিন্দু পত্রী একটি প্রেম-রহস্য-- 
হিন্দু ভিন্ন দে রহদ্য আর কাহারো হদয়ঙ্গম হইবার নয়। 
হিন্দু পর়ীকে যে না বুঝে দে প্রেমতত্বপরণমাত্রায় বুঝে না, বুঝিতে 
গারেও না। সে বোধ হয় প্রকৃত ও পূর্ণ প্রেমিক হইতে 
গারে না। 

দেখিলাম স্বর্ধ্যমুখী ও ভ্রমর উভয়েই হিন্দু পর্থী-_পতির 
বিষম অপরাধ সত্বেও উভয্বেরই পতির প্রতি প্রগাঢ় প্রেম এবং 
অনীম তক্তি। কিন্তু পতি অপরে আদক্ত বলিয়া একজনের 
গতির উপর বিবম রাগ, আর একজন পতির প্রতি শুধু রাগ- 
শৃন্য ভা নয়, স্বয়ং পতির আমক্তি চরিতার্থ করাইবার জন্য 
প্রয়ানী। এ প্রভে্দের কারণ কি? ভ্রমরের প্রেম কি স্বার্থ- 
ছুষ্ট? সেই জন্যই কি গতির উপর ভ্রমরের এত রাগ? ভ্রমরের 
প্রেমে ত স্বার্থ খুঁজিয়া পাই না। যাহার পতিপ্রেম স্বার্থ, 
গতি তাহীর স্বার্থে আঘাত করিলে পির প্রতি তাহার প্রেমও 
থাকে না, তক্তিও থাকে না। বস্তত তাহার পতিগ্রেম ও 
গতিভক্তি প্রকৃত প্রেম ও ভক্তিই নয়। এমন নিদারণ মর্া- 


ছুইটি হিন্দু পধী। ৪১ 


ঘাত পাইয়া! যে ভ্রমরের পতির প্রতি সমান প্রেম ও সমান ভক্তি 
সে ভ্রমরের পতিপ্রেম স্বার্থহষ্ট হইতেই পারে না। তবে কেন 
পতির উপর ভ্রমরের এত রাগ? বোঁধ হয় ভ্রমরের একটা কথায় 
এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাঁয়__ 

গোবিন্দলাল। আমি চলিলাম | 

ভ্রমর । কবে আসিবে ? 

গো। আসিব না। 

ভ্র। কেন? আমি তোমার স্ত্রী, শিষ্যা, আশ্রিতা, প্রতি- 
পালিতা, তোমার দাপাহ্থৰাপী”_তোঁমার কথার ভিখারী, 
আসিবে না কেন? 

গোঁ। ইচ্ছা নাই । 

ভ্র। ধর্ম নাই কি? বিনাপরাধে আমাকে ত্যাগ করিতে 
চাও, কর, কিন্ত উপরে দেবতা আছেন। 

ভ্রমরের এই শেষ কথাঁগুলিতে ভ্রমরের রাগ ও অভিমানের 
কারণ দেখিতে পাওয়া যাঁয়। ভ্রমর গোবিন্ঈলালকে এমন কথা 
বলেন না ষে আমি তোমার পড়ী, অতএব তুমি আমাকে পরি- 
ত্যাগ করিতে পারিবে না । তিনি বলেন_আমি নিরপরাধিনী, 
আমাকে পরিত্যাগ করিলে তোমার অধর্্ম হইবে । অধর্টের 
উপর ভ্রমরের বিষম রাগ বলিয়া ভ্রমরের পতির উপরও বিষম 
রাগ। ধর্মরূপিণী পতিপ্রাণ। পতিতে অধর্ট্ের সঞ্চার দেখিতে 
পারে না। ইহ! প্রেমধর্ম্ের একটি লক্ষণ ।__আমরা বাঙ্গালি, 
অধঃপতিত অকর্মণ্য অন্তঃসারশূন্য_-আমাদের কিন্তু একটি 
আশ! ভরসার কথা এই যে আমরা গৃহে গৃহে এখনও প্রেমধর্থ্ের 
এই লক্ষণটি দেখিতে পাইতেছি। 





৪২ ত্রিধারা । 


হুরধ্যমুখী কি ধর্রূপিণী পতিপ্রাণা নন ? তবে কেন ভ্রমরের 
ন্যায় তীহার পতির উপর রাগ হইল না? গোবিন্দলাল যেমন 
গাপী, নগেন্দ্রনাথও ত তেমনি পাগী। তবে কেন নগেন্দ্র- 
নাথের উপর ুর্যযমুখীর রাগ হইল না? কেন হইল না এ 
কথার সম্পূর্ণ আলোচনা করিবার স্থান এ প্রবন্ধ নয় । এ প্রবন্ধে 
এ প্রশ্নের উত্তরে এইমাত্র বলিতেছি যে অনেক ধর্শরূপিণী পতি 
প্রাণা যেমন পতিতে অধর্শের সঞ্চার দেখিতে পারেন না, 
অনেকে আবার তেমনি পতির ছুঃখ, কষ্ট, ক্লেশ বা যন্ত্রণা দেখিতে 
পারেন নাঁ-পতির দুঃখ, কষ্ট, বা যন্ত্রণা দুষ্প বৃত্তিজনিত হই- 
লেও তাহারা তাহ! দেখিতে পারেন না, আপনারাই তাহা 
মোচন করিবার চেষ্টা করেন। ইহাও প্রেমধর্শ্ের একটি লক্ষণ । 
আমরা বাঙ্গালি-_-নিতান্ত অসার ও ছুূর্ত, কিন্ত আমাদের 
কপাঁলের বড় জোর যে এখনও আমরা! গৃহে গৃহে প্রেমধর্শের এই 
লক্ষণ দেখিতে পাইতেছি। কিন্ত অতি বড় কপালও ফাটে । 

দেখা গেল যে স্র্ধ্যমুখী ও ভ্রমর উভয়ে একই ছাঁচের হিন্দু 
পত্তী। কিন্তু এক ধাতুর নয়। ক্ৃর্ধ্যমুখী ও ভ্রমর উভয়েই 
পতিপ্রেমে আত্মহার1--উভয়েরই পতিভক্তি অপরিমেয় । কিন্তু 
পতি অধর্্দীচরণ করিলে স্রধ্যমুখী পতির নিকট তেমনি শান্ত, 
প্রিয়ভাষিণী ও প্রিয়কারিণী_ভ্রমর পতির উপর রুক্ষ ও রাগা- 
স্বিত। ছাচ এক বটে কিন্ত ধাতু বড় বিভিন্ন। হৃর্ধ্যমুখী যে 
ধাতুর পড়ী, সংস্কত সাহিত্যে তাহারই প্রশংসা দেখিতে পাওয়া 
যায়, সেই ধাতুর পত্তীই আদর্শ পড়্ীরূপে বর্ণিত। ভ্রমর যে 
ধাতুর পত্রী, সে সাহিত্যে তাহার বড় বেশী প্রশংসা নাই। পূর্বর- 
কালে সে ধাতুর পত্রী বেশী ছিল কি না বলিতে পারি না। 





ছুইটি হিন্দু পড়্ী। ৪৩ 





এখন কিন্তু বেশী বলিয়া বোধ হয়। আমাদের শ্ত্রীমতীরা শাক 
আমুর্ব্নীয় চিকিৎসা ছাড়িয়! ছুর্দাস্ত ইউরোপীয় চিকিৎসারই 
বেশী পক্ষপাতিনী। তবে যে তাহারা আমুর্বেদীয় চিকিৎসা 
একেবারে ছাড়িয়া দিয়াছেন এমন কথা বলি না_আমি শ্রীমতী- 
দিগের কলঙ্ক রটনা করিতে বসি নাই_-এমন কথা কি আমি 
বলিতে পারি? তাহারা নরম গরম ছুই রকম চিকিৎসাই করিয়া 
থাকেন, তবে কি না গরমের দিকেই যেন একটু ঝোঁকু। 

সে যাহাহউক-_-যে ছুই ধাতুর পত্ীত্ব বর্ণনা করিলাম তন্মধ্যে 
কোন্টি উৎকৃষ্ট কোন্টি নিকৃষ্ট, অথবা ছুইটিরই সমান উকর্ষ 
কি না, তাহীর বিচার এপ্রবন্ধে করা যাইতে পারে না। সে 
বিচার বড় কঠিন। সে বিচার স্থানাস্তরে করিবার ইচ্ছা 
রহিল। এস্থলে কিন্তু একটী কথা বলা আবশ্তক। উপরে 
বলিয়াছি যে একই বিড়ম্বনায় পড়িয়! সুর্্যমুখী ও ভ্রমর ছুই 
জনের আচরণ ভিন্নরকম এবং আচরণের ফলও ভিন্ন রকম হই- 
য়াছিল। ক্ৃর্ধযমুখীর আচরণে কুর্ধ্যমুখী, নগেন্দ্র, নগেন্ত্রের ষে 
বংশে জন্ম, সকলই রক্ষা পাইল ।-_-সে আচরণের ফলে যে 
যেখানে ছিল সকলেই শেষে ন্মুণী হইল, নগেন্ত্র ও স্ু্যযমুখী 
সম্তানাদি লাভ করিয়া পরমস্থথে পবিভ্রভাবে জীবনযাত্র। 
নির্বাহ করিয়া গেল-ছুঃখিনী কুনদনন্দিনী থাকিলে সেও 
নগেন্দ্র ও স্্যযমুখীর সঙ্গে তেমনি করিয়া! জীবনযাত্র! নির্বাহ 
করিয়া যাইত। কিন্ত ভ্রমরের আচরণের ফলে ভ্রমর গেল, 
গোবিন্দলাল গেল, হরিদ্রাগ্রামের রায় বংশ লোপ হইল, কুষ্ণ- 
কান্ত রায়ের নাম ডুবিল, একটা সংসার, একটা সম্পত্তি, একটা 
খঙ্বধ্য ছারখার হইয়া গেল ! 


৪$ ত্রিধার] 


বুঝিবা পরিণামের এই ভীষণ এই শোচনীয় প্রভেদ ভাবিয়া 
ুঘ্যমুখী যে ধাতুর পড়ী, সংস্কত সাহিত্যে নেই ধাতুর গড্ীত্বের 
এত গৌরব করা হইয়াছে। 

বস্কিম বাবু প্রাচীন কালের লোক নহেন। আমাদের 
মৌভাগ্যক্রমে তিনি আমাদের সমসাময়িক লৌক। এখনও 
গ্রতিভীয় দেশ আলোকিত করিতেছেন এবং বিধাতার নিকট 
প্রার্থনা করি, যেন আরো! বহু দিন ধরিয়া এই রকম করিয়া 
দেশ আলোকিত করেন। কিন্তু বঙ্কিম বাবু ইংরাজি শিক্ষা 
প্রাপ্ত হইয়াছেন। ইংরাঁজি বিদ্যায় তিনি স্পর্ডিত । শৈশব 
হইতে ইংরাজি শিখিয়া হিন্দু ধাৎ রক্ষা করা ভাঁর। ভাই 
আজিকার বাঙ্গালা সাহিত্যে খাঁটি লেখ। এত কম। কিন্তু দেখি- 
লাম যে বঙ্কিম বাবুর স্থর্ধ্যমুখী আবদর্শানযায়ী হিন্দু পত্রী এবং 
তাহার ভ্রমর ঠিক আদর্শানরূপ ন| হইলেও খাঁটি হিন্দু পত্ী 
বটে। অতএব বিষবৃক্ষ ও কঞ্ণকান্তের উইল, এই দুইখানি 
পুস্তককে যদি উপন্তাম বল, তবে দুইখানিই হিন্দু উপন্তান, যদি 
কাব্য বল, তবে ছুইখানিই হিন্দু কাব্য। 

এ বড় কম আশা, স্পর্ধা ও আহ্লাদের কথা নয়। 


সুখের হাট ও সৌন্দর্য্যের মেলা । 


শা০৯৪৩০০শাশপ 


পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভীবকাল হইতে মানুষ সুখ খুঁজিয়] 
বেড়াইতেছে। মানুষ চিরকাল বলিয়া আসিতেছে যে স্থুখ 
পৃথিবীতে নাই, যদিও থাকে, বড়ই ছুপ্াপ্য। পৃথিবী মানুষের 
কান্নায় ভরা । মান্য বলে ভগবান মানুষের অবৃষ্টে সুখ লেখেন 
নাই, ছুঃখই লিখিয়াছেন। তাই মানুষ চিরকাল দুঃখের কানা 
কাদিতেছে। 

ধর্শ্যাজকের' মর্বদেশে সর্ব সময়ে বলিয়া থাকেন যে পৃথি- 
বীতে সুখ নাই, স্থুখ ন্বর্গে-_এজম্মে সখ নাই, সুখ মৃত্যুর পর 
পরলোকে । খষ্টীয় ধর্মযাজকেরা বলিয়া থাকেন যে এ জন্মটায় 
মানুষের কেবল পরীক্ষা, সেই পরীক্ষার ফল স্বরূপ মানুষের স্ব 
ছঃখ মানুষের মৃত্যুর পর পরলৌকে। এ পৃথিবীতে সুখ নাই। 

বাহার ধর্দ্যাজক নহেন, এমনি ভোঁমার আমার মতন 
মানুষ, তাহারা স্থুথ খুঁ জিয়া! বেড়ান, মনে করেন বুঝি সুখ কোন 
স্থানে বাঁ কোন জিনিসে লুকান আছে। আবার কোন্‌ স্থানে 
বাকোন্‌ জিনিসে সুখ লুকান আছে ঠিক করিতে না পারিয়া, 
তীহার! সুখের জন্য সর্বদাই অস্থির, সর্বদাই লালায়িত, সর্বদাই 
সন্তপ্ত! তাহারা কখনও এ জিনিসটা দেখিতেছেন, ইহাতে স্থুখ 
আছে কি না, কথনও ও জিনিসটা দেখিতেছেন, উহাতে স্বুখ 
আছে কি না, কখনও এ-কাঁজটা1 করিয়া দেখিতেছেন, ইহাতে 
স্থথ পাওয়া যায় কি না, কখনও ও-কাঁজট1 করিয়া দেথিতেছেন, 
উহাতে সুখ পাওয়া যায় কিনা । এত দেখিয়াও হয়ত ম্ুথ 


৪৬ ত্রিধারা 


পান.না, আর যদিও পাঁন, হয়ত সে স্থুখ ছুঃখের সহিত মিশ্রিত, 
নয় ছুই দিনের বেশি থাকে না! তাই তাহারা বলেন যে পৃথি- 
ঘীতে স্বখ নাই, থাকিলেও না থাকারই মধ্যে । 

কিন্তু প্রকৃত কথাটা কি? সুখ কি সত্য সত্যই পৃথিবীতে 
মাই? থাকিলেও, তাহা কি এতই ছশ্রাপ্য, পরিমাণে এতই 
কম? স্খকে কি এতই খুঁজিয়া বাহির করিতে হয় ? না, ত 
নয়। পৃথিবীতে সুখের পরিমাণ নাই__স্ুখ যথার্থই অপরিদীম । 
এই প্রকাণ্ড পৃথিবীতে, এই অনস্ত জগতে স্থুখের ছড়াছড়ি, 
ন্থুখের ঢাঁলাটালি, স্থুথের গড়াগড়ি । এই অসীম অনস্ত জগৎ-_ 
অসীম অনন্ত সুখের অসীম অনন্ত হাট। এ অদীম অনস্ত- 
ব্রন্মাগরূপ স্থখের . হাটে কতজিনিস আছে বল দেখি? কত 
রকমের জিনিস আছে বল দেখি? কার সাধ্য বলে কত জিনিস 
কার সাধ্য বলে কত রকমের জিনিস ! আমাদের এই ক্ষুদ্র পৃথি- 
বীর একট! ক্ষুদ্র দেশের একটা ক্ষুত্র বিভাগের একটা! ক্ুত্ 
গ্রামের একটা ক্ষুদ্র পল্লীতে কত জিনিস এবং কত রকমের 
জনিৰ আছে বল দেখে? কতগাছ এবং কত রকমের গাছ 
আছে বল দেখি? কত লতা এবং কত রকমের লতা আছে বল 
দেখি? কত পাতা এবং কত রকমের পাতা অছে বল দেখি? 
কত পাখী এবং কত রকমের পাথী আছে বল দেখি? আর 
জিজ্ঞাসাই বা করিব কত? জগতে জিনিসের সংখ্যারও সংখ্য। 
নাই, জিনিসের রকমেরও সংখ্য। নাই। তাই বলি যে এই 
অসীম অনস্ত জগৎ একটি অসীম অন্ত হাট, এবং এই অসীম 
অনস্ত হাট অসংখা দ্রব্যে ভরা। এই অসংখ্য-দ্রব্য-পূর্ণ হাটের 
বিশালতা তাঁবিয়। দেখিতে গেলে মন স্তর্ভিত হইয়! যায়, অস্তঃ- 


স্থখের হাট ও সৌন্দর্য্যের মেল|। ৪৭ 





করণ আনন্দমাখা-গাভীর্য্যে ভরিয়া উঠে। এই অসীম অনস্ত 
হাটের অসংখ্য দ্রব্যের মধ্যে প্রত্যেক ত্রব্য অসীম অনস্ত অপূর্ব 
ন্থুখ বিক্রয় করিতেছে । অভ্রভেদী অনীমকায় হিমাচিলও যেমন 
অসীম অনস্ত অপূর্ব্ব ন্থুখ বিক্রয় করিতেছে, ক্ষুদ্রতম বানুকা- 
কণাও তেমনি অসীম অনস্ত অপূর্বব স্থুখ বিক্রয় করিতেছে । 
কথাট। কি কিছু অনঙ্গত বোধ হইল ? ভবে বুঝাই শুন। অসীম- 
কাক হিমাঁচলে জগদীশ্বরের অসীম শক্তি দেখিতে পাও বলিয়া 
হিমাচল দেখিলে অস্তঃকরণে এত সুখ উছৃলিয়া উঠে। কিন্ত 
রিন্দুবৎ বালির কণাভেও কি জ্গদীশ্বরের অসীম শক্তি দেখিতে 
পাও না? তবে কেন হিমাঁচল দেখিলে অন্তকেরণে যেমন স্তুখ 
উছলিয়! উঠে, বালির কণাটি দেখিলেও অভ্ভঃকরণে. তেমনি সুখ 
উছলিয়! উঠে না? তবেই ত বলিতে হয় যে অসীমকায় হিমা- 
চলকে যে চক্ষে দেখ, বিন্দুবৎ বালির কণাটিকে সে চক্ষে দেখ 
না। অতএব এ কথা ঠিক যে, যে চক্ষে হিমাচল দেখ, সেই 
চক্ষে বালির কণ! দেখিলে হিমীচল হইতে যত সুখ পাও বালির 
কণা হইনেও তত সুখ পাইবে । ভাল করিয়া বিবেচন! করিলে 
বুঝিতে পারিবে যে জগতে যাহা কিছু আছে সকলই অসীম, 
সসীম কিছুই নাই। অনন্ত বিশ্বমগ্ুলও যেমন অপীম, বিলবৎ 
বালির কণাটিও তেমনি অসীম । বালির কণাট্টিকে যে ক্ষুদ্র বা 
সসীম বল, সে কেবল চর্ম্চক্ষের ভাষায় বল, মনশ্চক্ষের ভাষায় 
সেও অপীম। রবীন্দ্র বাঁবু তাহার আলোচন! নামক গ্রস্থের ২৩ 
পৃষ্ঠায় বলিয়াছেন যে বিশ্বের প্রত্যেক বিঘা প্রত্যেক কাঠাতেই 
বিশ্ব বর্তমান । কথাটা বড়ই ঠিক-কিন্ত আরও অনেকটা বাড়া- 
ইয়া লওয়া যার। বিশ্বের প্রত্যেক বিঘাঁতে বা প্রত্যেক বালির 


৪৮ ভিধার!। 








কণাতে শুধু বিশ্ব বর্তমান নয়, স্বয়ং বিশ্বনাথ বর্তমান । অতএব 
চর্শচক্ষের মৌহ এবং ছূর্বলতা অতিক্রম করিয়া মনশ্চক্ষে 
দেখিলে জগতের কোন পদার্থকে সদীম বলিয়া দেখিবে না, 
জগতের মকল পদার্থকেই অনীম বলিয়া দেখিবে, জগতে মীম। 
বলির] একটা জিনিসই দেখিতে গাইবে না । তখন ক্ষুদ্রতম 
বিন্দুবৎ বালির কণাতেও অপীমত্ব দেখিবে এবং অসীমত্তে 
মজিলে যে অসীম সুখ ও অনীম আনন্দ হয়, ক্ষুদ্রতম বালির 
কণা দেখিলেও সেই অনীম ন্মুখ ও অসীম আনন্দ মজিবে। 
তাই বলিতেছি যে এই অপীম অনন্ত হাটের অসংখ্য দ্রব্যের 
মধ্যে প্রত্যেক দ্রব্য অসীম অনস্ত অপূর্ব্ব স্থ বিক্রয় করি- 
তেছে। এ হাটে সখের সামগ্রী খুঁজিয়া বেড়াইতে হয় না, 
চক্ষু মেলিলেই অসংখ্য জ্মুখের সামগ্রী দেখিতে পাওয়া যায়। 
ঘেটিকে ইচ্ছা লও, মেইটিকে লইয়াই অসীম অনস্ত অপূর্ব ন্ুখ 
পাইবে । আর, সকলগুনিকে লইতে ইচ্ছ! হয়, মকল গুলি- 
কেই লও, অসীম অনস্ত অপূর্ব স্থখ পাইবে । আবার এই 
অসীম অনন্ত স্থথের হাটে যে অসংখ্য দ্রব্য সুখ বিক্রয় করিতে 
বধিয়াছে, তাহার! স্্ুথের বিনিময়ে তোমার কাছে আর কোন 
মূল্য চায় না, কেবল ঈশ্বরে তনয়ত্ব চায়। সেই ভন্ময়ত্ব 
লাঁভ রর, ঈশ্বরের এই অদীম অনভ্ত স্ুখের হাটে যে অসংখ্য 
ব্য স্থুখ বিক্রয় করিতে বসিয়াঁছে তাহারা সকলেই তোমাকে 
অকাতরে অদীম অনন্ত অপূর্ব স্থখ বিনামূল্যে অসীম মাত্রায় 
বিক্রয় করিবে । জগৎ কাহাঁকে বলে,জগদীশ্বর কাহাকে বলে,স্ুথ 
কাহাকে বলে মানুষ বুঝে না বলিয়া এই অনীম অনস্ত সুখের 
হাটের মধাস্থলে দাঁড়াইয়া! “জগতে স্ুথ নাই' 'জগতে স্বুখ 


স্থখের হাট ও সৌনর্য্ের মেলা। ৪৯ 


সাপ 


টির 
নাই' বলিয়া চিরকাল কী্দিতেছে এবং অপীম যন্ত্রণা ভোগ 
করিতেছে! 

জগতে যত দ্রব্য আছে সকলেই অদীম অনস্ত অপূর্ব স্থথ 
দান করে, এ কথাটি ঠিক কি না একটু ভাল করিয়| দেখা 
যাক। বাহার! ইংরাজি সাহিত্যে কিঞ্চিৎ প্রবেশ করিয়াছেন, 
ভীহারা হয়ত বলিবেন যে একটা গোলাপ ফুল দেখিলে যে 
আনন্দ যে্ছুখ হয়, একটা আকন্দ ফুল দেখিলেও কি সেই 
আনন্দ সেই সুখ হইতে পারে? একটা পর্বত দেখিলে যে 
জানন্দ যে ্ুখ হয়, একট! মাটির টিবি দেখিলে কি সেই 
আনন্দ সেই সুখ হইতে পারে? গোলাপ ফুল স্মনার, পাহাড় 
সুন্দর, অতএব পাহাড় ও গোলাপ ফুল দেখিলে সুখ হয় £ 
আকন্দ ফুলও ন্ুন্দর নয়, মাটির টিবিও ন্মুনূর নয়, তবে কেমন 
করিয়। আকন্দ কুল বাঁ মাটির টিবি দেখিলে সখ হইবে? 
8০৫৪৮ বা সৌন্দর্য বলিয়া একট! জিনি আছে সেটা কিন্ত 
পৃথিবীর সকল পদার্থে নাই । যে পদার্থে তাহ! আছে মানুষ 
সেই পদার্থ হইতে সুখ ও আনন্দ লাভ করে $ যে পদার্থে তাহা 
নাই, মানুষ সে পদার্থ হইতে সুখ ও আনন্দ লাভ করিতে পারে 
না। ইউরোপীয় সাহিত্যের যে ভাগকে 29১019610 বা! ছ09 27 
বলে নেই ভাঁগে এই সকল কথা দেখিতে পাওয়া যায়। অতএব 
আমাদের মধ্যে বাহারা ইউরোপীয় সাহিত্যের সেই ভাগ অধ্য- 
য়ন করিয়াছেন, তীহারা অবশ্ত বলিতে পারেন যে, সকল পদার্থ 
যখন নুন্দর নয়, তখন সকল পদার্থই যে অসীম অনন্ত অপূর্ব 
বুখ দান করিতে পারে, এরকম কথা বলা অন্তান্ন ও অসঙ্গত। 
কিন্তু একথার একটি উত্তর জাছে। জগতে যে সকল পদার্থ আছে, 


৫ ত্রিধারা 


পিপিপি 


সেই সকল পদার্থকে যদি কেবল চর্শচন্ষু দিয়া দেখ তবে তাহা" 
দের অনেককে স্ুনদর এবং অনেককে অন্থন্দর বা কুৎসিত 
বলিয়া বোধ হইবে । চর্্চক্ষে একটা! গোলাপ ফুল বা একটা 
পর্বত যেমন সুন্দর, একটা! মাটির টিবি বা একট। আকন্দ ফুল 
তেমন সুন্দর নয়। অতএব পর্বত বা গোলাপ ফুল দেখিলে 
যেমন সুখ হইবে, মাটির টিবি বা আকন্দ ফুল দেখিলে তেমন 
স্থখ হইবে না । কিন্তু মনশ্চক্ষে দেখিলে গোলাপ ফুলও যেমন 
জন্দর, আক ফুলও ভেমনি সুন্দর দেখিবে ! চর্মচক্ষে 
আকার অবয়ব বর্ণ প্রভৃতি দেখা যায়। আকার অবয়ব বর্ণ 
প্রভৃত্তির কমবেশী ভালমন্দ ইতরবিশেষ আছে । অতএব যে 
সকল জিনিস চর্খচক্ষে দেখ, ভাঁহা সমান সুন্দর এবং সমান 
ওীতিকর না হইতে পারে এবং প্রকৃতপক্ষে হয়ও না। কিন্ত 
সকল পদার্থের মধ্যে যে ত্রন্মশক্তি ব! ব্রহ্মপদার্থ মানসচক্ষে 
দেখ, তাহার আর কমবেশী ভালমন্দ ইতরবিশেষ নাই, তাহার 
পরিমাণও অসীম, সৌন্দর্ধ্যও অসীম । অন্রভেদী অনস্তকায় 
হিমাচলস্থিত ত্রহ্ষপদার্ঘও যেমন অসীম ও সুন্দর, বিন্দুবৎ 
বানুকা-কণাস্থিত ব্রদ্মপদার্থও তেমনি অসীম ও সুন্দর । 
কোকিলের কলকষ্ুস্থিত ব্রহ্মপন্ার্ঘও যেমন অসীম ও ন্মুন্দর, 
কাকের কর্কশ কণ্ঠস্থিত ব্রহ্মপদার্থও তেমনি অসীম ও সুন্দর । 
নির্বরিণীর নির্মল জলস্থিত ব্রহ্মপদার্থও যেমন অসীম ও ন্দুন্দর, 
পদ্কিল পলুলের জলস্থিত ব্রক্মপদার্থও তেমনি অসীম ও সুন্দর । 
অতএব মনশ্চক্ষে দেখিলে জগতে যত পদ্দার্থ আছে লবই সমান 
সুন্দর । এবং মনশ্চক্ষে দেখিলেই এই অসংখ্য পদার্থ পূর্ণ অসীম 
অনন্ত জগৎ একটি অসীম অনন্ত সৌন্দর্ষে্যর মেলা। উপরে যে 





সুখের হাট ও সৌন্দর্য্যের মেলা। ৫১ 





অসীম অনস্ত অপূর্ব সুখের হাটের কথ বলিয়াছি, সে এই অসীম 
অনস্ত অপূর্ব্ব সৌন্দর্যের মেলারই নাম। এই অদীম অনন্ত 
অপূর্বব জগ অনীম অনস্ত অপূর্বব সৌনার্ধ্যের মেলা বলিয়াই 
অদীম অনস্ত অপূর্ব স্থখের হাট হইয়াছে ! এমন হাটে আসিয়! 
আবার স্থুখ খুঁজিতে হয়, ন' মুখের জন্য কাঁদিতে হয়! 

তবে চর্শচক্ষে যে সৌন্দধর্য দেখা যায় তাহা। কি কিছুই নয় ? 
কিছুই নয় এমন কথ বলি না। তাহাও খুব ভাল জিনিস এবং 
তাহা দেখিলেও খুব সখ হয় । কেনই বা না হইবে ? তাহাভেও 
ত সেই অসীম অনস্ত সুনর ত্রন্ষপদার্থ রহিয়াছেন। কিন্ত 
একটি কথা আছে । চর্্চক্ষে যে সৌন্দর্য দেখা যায় সে সৌন্দর্য্য 
যদি তোমাকে আর কোন রকম সৌন্দর্য দেখিতে না দেয়, 
তবে মে সৌন্দর্যকে সৌন্দর্ধ্য বলিয়। গণনা ন। করাই ভাল, সে 
লৌন্দধর্য না দেখাই উচিত। চর্খচক্ষে যে সৌনধধ্য দেখিতে 
পাওয়। যায়. সেই সৌন্দর্ষ্য মুগ্ধ হইয়া যে পদার্থে সে সৌনার্ফ্য 
নাই সে পদার্থে যে ব্যক্তি কোন রকম সৌন্দর্য দেখিতে পায় না, 
তাহাকে যত বড় কবি বাঁ ন্ুরুচিসম্পন্ন মানুষ বল না 
কেন সে কিন্তু প্রকৃত পক্ষে উৎকৃষ্ট প্রকৃতির মানুষ নয়। 
তাহাতে প্ররুত মন্ুয্যত্ব বিকশিত হয় নাই বলিলেই হয় । যে 
সৌন্দর্য চর্খচক্ষে দেখা যাঁয়, আমীর বোধ হয় যে ইউরোপীয় 
সাহিত্যের £3৮৯6০ ব! চিন্তরঞ্জণকারী ভাগ মান্ষকে সেই সৌন্দ- 
ধের্ের কিছু বেশী পক্ষপাতী করিয়া তুলে । এবং সেই জন্য ইউ- 
রোগীয়েরা পদার্থকে সুন্দর এবং অন্থন্দর বলিয়াত পৃথক্‌ করিয়া 
থাকে, এদেশের লোক তত করে না, এবং ইউরোপীয় সাহি- 
ত্যেও সুন্দর অস্ুুন্দর বলিয়া পদার্থের যত প্রভেদ এবং স্থরুচি 


৫২ ত্রিধারা 


কুরুচি লইয়া যত গওগোল দেখিতে পাওয়া যায়, হিন্দুর সাহিত্যে 
তাহার কিছুই দেখিতে পাওয়া যায় না। চর্শচক্ষে যে সৌনর্যয 
দেখিতে পাওয়া যায়, অনেক সংস্কৃত কাব্যে সে নৌনর্য্যের 
অপরিমিত সমাবেশ আছে। কিন্তু যে পদার্থে তাহ] নাই, 
সে পদার্থের প্রতি ইউরোপীয় সাহিত্যে যেরূপ স্বণার অভিব্যক্তি 
দেখিতে পাওয়া যায়, সংস্কৃত সাহিত্যে সেরূপ দেখিতে পাওয়া 
যায় না। এবং সংস্কৃত ও ইউরোপীয় সাহিত্য কিছু বেশী 
অভিনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করিলে বুঝিতে পার! যায় যে 
বাহজগৎ এবং বাহাসৌনরধ্য সংস্কৃত সাহিত্যে কিছু বেশী 
মনের দিক. দিয়া বর্ণিত এবং ইউরোপীয় সাহিত্যে কিছু বেশী 
চর্শ্চক্ষের দিক্‌ দিয়া বা বাহেন্দ্রিয়ের দিক দিয়া বর্ণিত হয়। 
ইউরোপীয় কবি স্থর্য্যাস্তের শোভা কেবল চোক. দিয় দেখিতে 
বলেন ; হিন্দু কবি ব্িযমাণ কমলিনীর জন্য এবং বিচ্ছেদগ্রস্ত 
চক্রবাক চক্রবাকীর জন্য না কীদিয়া শুধু চর্শচক্ষে স্্ধ্যান্ত 
দেখিতে বলেন না| রং শুধু রং বলিয়া, আকার শুধু আকার 
বলিয়া, অবয়ব শুধু অবয়ব বলিয়া, রূপ শুধু রূপ বলিয়া, লাবণ্য 
শুধু লাবণ্য বলিয়া, ইউরোপীয় সাহিত্যে যত প্রশংসিত সংস্কৃত 
সাহিত্যে তত প্রশংসিত হয় না। হিন্দু সকল পদার্থে ব্রক্ষপদ্ার্থ 
দেখেন বলিয়া তাহার সাহিত্যে সুন্দর অন্ন্দর বলিয়া পদার্থের 
প্রভেদ নাই এবং চর্মচক্ষে যে সৌনর্ধ্য দেখিতে পাঁওয়| যায়, 
মে সৌনধ্যের একাধিপত্যও নাই। ইউরোপবাঁসী জগৎ 
হইভে জগদীশ্বরকে পৃথক দেখেন বলিয়া! তাহার সাহিত্যে 
ন্ুন্দর অন্ুন্দর বলিয়! পদ্দার্থের এত প্রভেদ এবং চর্চক্ষে যে 
লৌনরধ্য দেখিতে পাওয়া যায় তাহার এত আধিপত্য । ঈশ্বর 


সুখের হাট ও সৌনাধ্যের মেল । ৫৩ 





ন্বন্ধীয় সংস্কারের প্রভেদ বশত নান| বিষয়ে কত গভীরতরও 
ওরুতর প্রভেদ ঘটিয়৷ পড়ে এখন বুঝিতে পারিবে । 

তাই বলি যে, যে শাস্ত্র মানুষকে বাহাসৌনরে্যর বিশেষ 
পক্ষপাতী করে, দে শান্তর বড়ই অনিষ্টকর, সে শান্্ অতি 
সাবধানে অধ্যয়ন করা কর্তব্য। বাহসৌনধ্ের পক্ষপাতী 
হুইলে তোমাকে স্থথ খুঁজিয়া বেড়াইতে হইবে, কেন না সকল 
পদার্থের বাহলৌনর্ধ্য নাই। অতএব যে শান্তর তোমাকে 
বাহসৌন্দর্য্যের পক্ষপাতী করে সে শাস্ত্র তোমার স্থুখের ভাগার 
কম করিয়! দেয় এবং সুখের ভাণ্ডার কম করিয়া তোমাঁকে অস্থির 
এবং অন্্রধী করে । সে শান্ত্রের ভক্ত হইলে এই যে অসীম অনন্ত 
অপূর্ব সৌন্দধ্যের মেলা ইহাও ভাঙ্িয়া যাইবে, এই যে অসীম 
অনন্ত অপূর্ব সুখের হাটি ইহাও ভাঙ্গিয়৷ যাইবে | 

আর তুমি জীব-প্রধান মানুষ, ভুমি কি কেবল বাহেন্দ্িয়ের 
গুণে জীবপ্রধান ? তোমার মন, তোমার জ্ঞান, তোমার হৃদয় 
লইয়াই কি তুমি জীব মধ্যে প্রধান নও ? তবে কেবল বাহে- 
ত্ড্রিয় ছার! জগৎ দেখিলে জীব মধ্যে তোমার প্রধান্তই ৭ কেমন 
করিয়া হয়, আর তোমার জগৎ-দেখ। কাঁধ্যটা মানুষের জগৎ- 
দেখা কাঁ্ধ্যই বা কেমন করিয়া হয় ? চর্মচক্ষে যে সৌনর্য দেখা 
যায় সে সৌন্দর্য্েও ব্রন্মপদার্থ আঁছে, অতএব সে সৌন্দর্য্যও 
দেখ, ষে সৌনব্্যও ভালবাঁদ। কিন্ত সে সৌন্দর্য্যের একান্ত 
পক্ষপাতী হইয়া মনশ্চক্ষু এবং হৃদয় দিয়া যে বিশ্বব্যাপী সৌন্দর্য্য 
দেখা যায়, সে সৌনদর্ধ্য দেখিতে যদি না পাও, তবে জানিও 
যে মানবোচিত উৎ্কুষ্ট প্রকৃতিও ভুমি পাঁও নাই এবং উৎকৃষ্ট 
প্রকৃতির মানুষের জন্য যে অনীম অনন্ত অপূর্ব সুখের হাট 


৫৪ | ভিধার]। 





এবং সৌন্দর্যের মেলা খোলা রহিয়াছে দে হাটে এবং মেলায় 
প্রবেশ করিবার অধিকারও তোমার হয় নাই। হিন্দু খবিরা 
উৎকৃষ্ট প্রকৃতি সম্পন্ন ছিলেন বলিয়া জগৎকে প্রধানত মাঁনস- 
চক্ষে দেখিতেন, এবং মানসচক্ষে দেখিয়া জগৎকে সুখময় 
দেখিতেন, জগতে ন্থথ খুঁজিয়! বেড়াইতেন না । ইউরোপের 
মহাপুরুষেরা খুব মহৎ হইয়াও মানব প্রকৃতির চরমৌঁৎকর্ব লাভ 
করেন নাই বলিয়া জগৎকে প্রধানত মানস চক্ষে ন! দেখিয় 
চর্শচক্ষে দেখেন এবং সেই জন্ত জগৎকে ম্ুনার অন্থনার সুখময় 
ছুংখময় ছুইভাগে বিভক্ত করিয়া জগতে ন্ুখ ও সৌন্দর্য্য 
খুঁজিয়া বেড়ান এবং স্থুখের অস্ুন্ধীনে সদাই অস্থির ও 
অন্ুখী হইয়া থাকেন। ইউরোপে মানবের আধ্যাত্মিকতা 
কিছু নিকৃষ্ট বলিয়। তথায় 2৪5৮:৬৮০ বিদ্যার এত প্রাধান্ ; 
ভারতে মানবের আধাম্মিকতা বড়ই উৎকৃষ্ট বলিয়া! তথায় ৪৪- 
2)1990 বিদ্যা নাই বলিলেই হয় এবং 293866 বিদা। পরমার্থ 
বিদ্যায় এক রকম লয় হইরা গিয়াছে। আজিকার দিনে আমরা 
2680790৩ বিদ্যাকে পরমার্থ বিদ্যায় তত লয় করিয়া দিতে 
পারিব কি না, ঠিক বিতে পারি না, এবং ততট] লয় করিয় 
দেওয়াও আবশ্যিক কিনা ঠিক বলিতে পারি নাঁ। কিন্তু 293- 
€)0০ বিদ্যাকে পরমার্থ বিদ্য। হইতে পৃথক করি আর নাই করি, 
উহাকে পরমার্থ বিদ্যার সম্পূর্ণ অধীন নী করিলে আমরা মানব 
প্রকৃতির চরমৌত্কর্ষ লাভ করিতে পারিব না এবং এমন যে 
অদীম অনন্ত অপূর্বব সুখের হাট এবং সৌনরধ্্যের মেলা খোলা 
রহিয়াছে ইহাতেও প্রবেশ করিতে পারিব না। স্বুখ খুঁজির 
খুঁজিয়া মরিব, অস্থখেই কাল কাটিবে! 





ইন্দিয়ের আকাজ্ফা। 





জগতে জঙ্ডের পরিমাণ ভাবিয়া দেখিলে স্তত্তিত হইতে হয়। 
যে দিকে ফিরি সেই দিকেই দেখি জড় । এই যে পৃথিবীতে আমরা 
বাস করিতেছি ইহাতে কতই জড়-_কতই মাটি, কতই জল, 
কতই প্রস্তর, কতই কাষ্ঠ, কতই অস্থি, কতই মাংস, কতই রক্ত, 
কতই ফুল, কতই ফল, কতই বাতাস, কতই বহ্ছি__জড়ের সীমা 
নাই, সংখ্যা নাই, শেষ নাই। আবার এমন কত পৃথিবীই 
আছে--এ পৃথিবী অপেক্ষা দশ গুণে বড়, শত গুণে বড়, সহস্র 
গুণে বড়। এক একটা কুর্ধ্যমগ্ুল কি ভয়ানক জড়পিও ! 
এমন কত স্র্ধ্যমণ্লই আছে । এক একটা নক্ষত্র কি প্রকাণ্ড 
জড়রাশি। এমন কত নক্ষত্রই আছে। শূন্ত আকাশটাও 
শৃন্ত নয়-_-জড় বামুতে, জড় বিছ্যুতে, জড় আলোকে, 
জড় ইথরে ভরা। জগতে সবইত জড়। জড় অনস্ত, জড় 
অনীম। সেই পরম চৈতন্তময় মহাপুরুষই ত এই প্রকাণ্ড জড় 
রাশি স্ষ্টি করিয়াছেন। তবে এই প্রকাণ্ড জড়রাশি কি শুধুই 
জড়? জড়ে কি কেবল জড়ত্বই আছে ? জড়ে যদি শুধু জড়ত্বই 
থাকে তবে জড় ত চৈতন্যময়ের সৃষ্টি হইতে পারে না। সবষ্টিকর্তা 
ন্য্ঈ পদার্থে খাকিবেনই থাকিবেন। কার্য্যে কারণ থাকিবেই 
থাকিবে । তবে কেন বল জড় কেবলই জড়? 

না, না, জড় কেবলই জড় নয়। তাহা হইলে এত জড়ের 
মধ্যে থাকিয়া চৈতন্যবিশিষ্ট মানুষের অধোগতির কি সীমা 
থাকিত, না স্বয়ং চৈতন্তময়ের চৈতন্য অবিকৃত থাকিত ? না, না, 


৫৬ ত্রিধারা । 


০ 





জড় শুধু জড় নয়। জড়ের আস্মা আছে, জড়ের আধ্যাত্মিকতা 
আছে। জড়ে আত্মা আছে বলিয়াই, জড়ে আধ্যাত্মিকতা 
আছে বলিয়াই জগতে জীব এবং জগতে চৈভন্বিশিষ্ট মানুষ 
উৎপন্ন হইতে পারিয়াছে। জীবে যে চৈতন্য আছে নিজাঁবে 
তাহা নাই। চৈতন্যের গুণে জীবের চৈতন্য, একথা নত্য। কিন্ত 
জীবের জড়ত্ব নিজাঁবের জড়ত্ব হইতে ভিন্নও ত বটে। জীরের 
জড়ত্বের গুণ প্রকৃতি এবং মৃত্তি নিজঁবের জড়তের গুণ প্রকৃতি 
এবং মুক্তি হইতে বড়ই তিন্ন। জীবের জড়ত্ব এবং নিজবের 
জড়ত্ব ছুই ভিন্ন শ্রেণীর জড়ত্ব বলিয়া! মনে হয়। গোড়ায় ছুই 
জড়ত্বই এক, কিন্তু গোড়ার জড়ত্ব জীবে এতই পরিবন্তিত যে 
তাহাকে আর গোড়ার জড়ত্ব বলিয়া চেনা যায় না। খাঁনিকট! 
মাটি বা পাথর বা জল আর জীবশরীর তুলনা করিয়া দেখিলে 
জড়ের এই যে আশ্চর্য্য পরিবর্তনের কথা বলিতেছি তাহা উপ- 
লব্ষি হইবে । মাটি পাথর বা জল কি জিনিস আর জীবশরীরই 
বাকি জিনিস? কে বলিবে ছুই জিনিস এক রকমের, এক প্রক্ক- 
তির, এক শ্রেণীর? না, জীবের জড়ত্ব নিজবের জড়ত্ব হইতে 
অনেক বিভিন্ন । এই বিভিন্নতায় জড়ের আত্ম। আধ্যাস্থিকতা এবং 
আকাঙ্ষা "দেখিতে পাই। চৈতন্যের সহিত থাঁকিতে হইলে, 
চৈতন্তকে পুষিতে হইলে, টৈতন্যকে ধারণ করিতে হইলে নিব 
জড়কে অনেক পরিবর্তন স্বীকার করিতে হয় । সেই পরিবর্তনই 
জড়ের উন্নতি । সে উন্নতি আম্মার সহিত সহবাসের জন্য এবং 
আস্মাকে আশ্রয় দিবার জন্ত। জড়ের সেই পরিবর্তনরূপ উন্নতি 
না,হইলে জগতে আম্মার আবির্ভাবও হয় না আশ্রয়স্থানও 
থাকে না। আত্মার উপযোগী জড়ত্ব ব্যতীত জগতে আত্মার 


ইন্দ্রিয়ের আঁকাজ্ফা। ৫৭ 





বিকাশ হয় না। নিজাঁব জড় চিরকাল সেই উপযোগিতা লাত 
করিতে চেষ্টা করিতেছে, সেই আত্মার-উপযোগী-জড়ত্বের দিকে 
অগ্রসর হইতেছে । [0০100 বা ক্রমবিকাশ এবং ক্রমো- 
ননতিতে সেই চেষ্ট৷ এবং অগ্রবপ্তিতা ব্যক্ত হইতেছে । সেই উপ- 
যোগিতা লাভ করিতে চেষ্টা করার এবং সেই আত্মার-উপযোগী* 
জড়ত্বের দিকে অগ্রসর হওয়ার নামই জড়ের আধ্যাত্মিকতা বা 
আধ্যাম্মিক আকাঙ্ষা । জড়ে আত্মা না থাকিলে তাহার কি 
এই আধ্যাত্মিকর্তী বা আধ্যাত্মিক আকাঙ্ষা থাকিত? জড়ে 
আত্ম! আছে বলিয়! তাহাতে আধ্যাত্মিকতাঁও জাছে আধ্যাত্মিক 
আকাজ্ষাও আছে। এবং জড়ে আধ্যাস্মিকতা এবং আধ্যাম্মিক 
আকাজ্ষা আছে বলিয়া মানুষও এই বিপুল জড়রাশির মধ্যে 
থাকিয়া জড়ে পরিণত হয় না, চৈতন্ময়ের চৈতন্তও বিকার 
প্রাপ্ত হয় না। জড় জগৎও সেই জন্য চৈতন্যময়কে দেখাইতে 
এত ভালবামে এবং মান্য জড় জগতে চৈতন্যময়কে দেখিলে 
মানুষের চৈতন্যময়ও বিকৃতি প্রাপ্ত হন নাঁ। যে জড়ের প্রকৃতি 
এবং আকাঙ্ষ! বুঝে কেবন সেই জড়ত্ব কর্তৃক পরাভূত হয় না, 
কেবল সেই এই বিপুল জড় রাশির জড়ত্বকে অতিক্রম করিয়া! 
তাহার আধ্যাস্মিকতাঁকে আপনার আধ্যান্সিকতার সহিত্ত মিশা- 
ইয়া লয় এবং কেবল সেই আপনার অস্তরেও যে চৈতন্যময়ঝে 
দেখে, জড়েও সেই চৈতন্ময়কে দেখে । তাহার কাছে চৈতন্ত- 
ময়ের ধ্যানের পাকার নিরাকার উভয় পদ্ধতিই সমান । 

সমস্ত জড় জগতের যেমন মানবর্দেহেরও তেমনি আধ্যা্ি- 
কতা এবং আধ্যাত্মিক আকাঙ্ষা আছে। মন্ুয্যের এমন এক- 
দিন গিয়াছে যখন তাহার হস্ত পদ প্রভৃতি সমস্ত ইন্দ্রিয় কেবল 


৫৮ ত্রিধারা। 





দেহের সেবায় নিযুক্ত খাকিত। তখন আহার বিহার বই মন্থু- 
য্যের অন্ত কাজ ছিল না। তখন আহার বিহারে এবং আহার 
বিহারের উপকরণ সংগ্রহেই মন্গুষ্যের সমস্ত ইন্দ্রিয়ের আনন 
আসক্তি এবং পরিতৃপ্তি ছিল। ক্রমে সে দিন গিয়া মনষ্যের 
অন্য দিন হয়। তখন আহার বিহার ছাঁড়া জ্ঞানো- 
গার্জন প্রভৃতি উন্নত বিষয়েও মন্থুয্যের ইন্দ্ির নিযুক্ত 
হইয়াছিল। শুধু আহারবিহারে তখন আর মানবেক্িয়ের 
পরিতৃপ্তি হয় নাই-আহারবিহারকে কিঞ্চিৎ তুচ্ছ করিয়া 
মানবেত্ত্রিয় তখন জ্ঞানোপার্জন প্রভৃতি উচ্চ বিষয়ের অনুরাগী 
হইয়। তাহারই অন্থধাবনে সম্পূর্ণ আনন্দ ও পরিতৃপ্তি লাভ 
করিয়াছিল। এইরূপ মান্থষের মানসিক শক্তির বিকাশের সঙ্গে 
সঙ্গে তাহার ইন্দ্রিয়ের আধ্যাত্মিক আঁসক্তিও বিকশিত হয়। 
ইন্ত্রিয়ের এই আঁধ্যাম্মিক আসক্তির বিকাশ কেবল মাত্র মানসিক 
শক্তির বিকাশের ফল বা অনুসরণ নর়। একটু ভাবিয়া! দেখিলে 
বুঝিতে পার' যায় যে ইন্দ্রিয়ের আধ্যাত্মিকতা এবং আধ্যাত্মিক 
আসক্তি না থাকিলে মন আপন বিকাশ-ক্রিয়ায় ইন্্িয়ের 
সহায়ত! পাইত না এবং তাহা হইলে সে বিকাশ-ক্রিয়। অত্যন্প 
পরিমাণে সম্পন্ন হইয়া বন্ধ হইয়া যাইত। অতএব ইন্জিয়ের 
নিজের আধ্যাত্বিকত! এবং আধ্যাম্মিক আসক্তি স্বীকার করি- 
তেই হয়। আর যদি ইন্দ্রিয়ের আধ্যাম্মিকতা এবং আধ্াত্িক 
আদক্তিকে মানসিক শক্তির ফল ব! অন্থপরণ মাত্র বিবেচনা 
কর, তবে ইন্দ্রিয় এবং মানসিক শক্তিকে এতই সম্বদ্ধ পদার্থ 
বলিয়া বুঝিতে হয় যে মনকে আধ্যাত্মিকতা! সম্পন্ন বলিয়া স্বীকার 
করিলে ইন্দ্রিয়কেও আধ্যাত্মিকতা! সম্পন্ন বলিয়া স্বীকার না 


ইন্দিয়ের আকাজ্ষা। ৫৯ 


করিলে চলে না! । অতএব যে ভাবেই দেখ! যায়, হীন্দ্রয়ের 
আধ্যাত্মিকতা! এবং আধ্যাত্মিক আসক্তি অন্বীকার করা যায় না। 
তাই বলি যে মানব মনের আধ্যানক্মিকতা যত বুদ্ধ হয় মাঁনবে- 
ভ্র্রিয়ের আধ্যাত্মিকতা! এবং আধ্যাত্মিক আনক্তিও তত বৃদ্ধি হয়। 
মনুষ্য জাতির ইতিহাসও এই সত্য ঘোষণা করে। মনুষ্যের 
মনের এবং ইন্দ্রিয়ের মধ্যে এই অপূর্ব যোগ আছে বলিয়া 
মন্ুষ্যের মন যখন ভগবানে ভোর হয় তাহার ইন্ত্িয়ও তখন 
ভগবানকে লইয়! থাকে, তাহার ইন্দ্রিয় তখন ভগবান ছাড়! 
আর কিছুতেই লারবভা! দেখে না এবং আর কিছু লইয়া আন- 
ন্দিত বা পরিতৃপ্ত হয় না। তখন মনও ভগবানময় হয়, ইন্দ্রিরও 
তগবানময় হয়। তখন জড়ও চৈতন্তের প্রভেদ থাকে না। 
তখন কি জড় কি চৈতন্ত কি ইন্দ্রির কি মন সকলই প্রেমভক্তিতে 
গলিয়া এক ভেদ-শৃন্য ভক্তরূপে ভগবানের পাদণন্মে লুটাইতে 
থাকে । তখন জড়ও থাকে না চৈতন্তও থাকে না, ইন্দ্রিয়ও 
থাকে না মনও থাকে ন।। তখন এক ভক্তি, ভক্তি, ভক্তিই 
থাকে । তখন ভগবানের পর্দে ভক্তির আছতিতে জড়ও লয় 
হইয়! যায়, চৈতন্তও লয় হইয়া যায়, ইন্দ্রিয়ও লয় হইয়া যায়, 
মনও লয় হইয়া যায়। ভগ্ববন্তক্তিরূপ উত্সর্গে জড়ও যা চৈতন্যও 
তাই, ইন্ট্রিয়ও যা মনও তাই । সে উৎসর্গে জড় ও চৈতন্য, 
মন ও ইন্দ্রির় একই বস্ত__প্রভেদ শৃন্য আধ্যাত্মিকতা এবং 
আধ্যাত্তিক আকাঙ্ক্ষা মাত্র। ভাগবতে ইন্দ্িয়ের এই অপূর্ব 
আধ্যাত্মিকতা দেখিতে পাই । 
বিলেবেতোকুক্রম বিক্রমান্‌ যে ন শৃণতঃ কর্ণপুটে নরন্য | 
জিহ্বাসতী দার্দ্,'রিকেব সত ন যোপগায়তারুগায় গাথাঃ ॥ 


৬৪ ত্রিধারণ। 





ভারঃ পরং পষ্ট কিরীট বুষ্ট মপুযত্তমাঙ্গং ন নমে নুকুন্দং । 

শাবৌ করৌনো কুরুতঃ সপর্যাং হরেল্ন পৎ কাঞ্চন কল্তনৌ বাঁ॥ 

ঘর্হায়িতে তে নয়নে নরাণাং লিঙ্গানি বিষ্কেণিননিরীক্ষতোষে । 

পাদৌ নৃণাং তৌ ভ্রমজন্ম ভাজৌ ক্ষেত্রানি নাহুত্রতৌহরের্ধো॥ 

জীবঞ্ছবো! ভাগবতাজ্বি, রেণুন্‌ নজাতু মর্ত্যোভি লভেত যন্ত। 

শ্রীবিষুপদ্যা মন্জন্তলস্তাঃ শ্বস্থ যো যত্ত নবেদ গন্ধং | 

তদশাসারং হৃদয়ং বতেদং যদগহামানৈ হরিনামধেয়েঃ | 

নবিক্রিয়েতাঁথ যদাঁরিকারং নেত্রে জলং গাত্তরুহেযুহ্্বঃ ॥.  . 

(২ স্ন্ধ, ৩ অধ্যায়, ২৭---২৪) 
যে মনুষ্য শ্রীকৃষ্ণের গুণীন্বাদ শ্রবণ না করে তাহার ছুইটি 

কর্ণপুট বৃথা ছিদ্র মাত্র, আর যে ব্যক্তি ভগবানের গাথা গান না 
করে তাহার ছুষ্ট1! জিহ্ব| তেক জিহ্বার তুল্য। আর যে মন্তক 
মুকুন্দ চরণাবিন্দে প্রণতঠুনা হয় তাহা প্টবন্ত্রের উষ্জীষ এবং 
কীরিটে সজ্জিত হইলেও কেবল ভার মাত্র, আর যে ছুই হস্ত 
হরির সপর্ধ্যা না করে তাহা কাঞ্চন কন্কণে দেদীপ্যমাঁন হইলেও 
সেই ছুই হস্ত বৃতকের হন্ত তুল্য হয়। অপর যে ছুই নয়ন 
রবি মৃত্তির দর্শন ন| করে তাহা ময়ূর পুচ্ছের সদৃশ, বস্তত 
তাহার কোন কাঁধ্যকারিতা নাই, আর যে ছুই পদ হরিক্ষেত্রে 
গমন না করে তাঁহারা বৃক্ষবৎ জন্ম লাভ করিয়াছে । অপর 
হে সত! যেব্যক্তি কখন ভগবস্তক্তের পাদরেণু ধারণ না করে 
নে ব্যক্তি জীবঞ্কব অর্থাৎ জীবন্দশাতেই মৃতক্ তুলা, আর যে 
মনুষ্য শ্রীবিষুঃর পদলগ্ন! তুলসীর গন্ধ আঘ্রাণ করিয়া! আননিত না 
হয় নেনিশ্বাস সত্বেও শবশরীরী সদৃশ । হে সত! হরিনাম 
উচ্চারএ করিলে যে হৃদয়ে বিকার না জন্মে এবং বিকার হইলেও 


ইন্দিয়ের আকাঙ্ষা। ১ 


যদি নেত্রে অশ্রু এবং গাত্র লোমাঞ্চ না হয় তবে সে হায় 
পাষাণের তূল্য কঠিন। 





ভ্রীরামনারায়ণ বিদ্যারত্বের অন্থুবাদ। 

ভক্তের দেহের ও ইন্দ্রিয়ের এই আকাঙ্কা, আধ্যাত্মিকতা । 
ভক্তের সবই ভগবাঁনের--মনও ভগবানের দেহও ভগবানের। তাই 
ভক্তের মনও ভগবানের পাদপন্সে লুটায় দেহও ভগবানের পাদ- 
পদ্ধে লুটায়। ভক্ত এক ভগবানকে বই আর কাহাকেও জানেন 
না। তাই তাহার যাকিছু আছে সবই তিনি ভগবানকে উৎ্দর্ণ 
করেন। তুমি ভগব্ভক্ত, ভাগবতকারের ন্যায় তোমার যদি 
ভগবানের গঠিত মস্তি না থাকে তখাপি ভূমি এই বিশ্বতরক্মাগুরূপ 
ভগবানের মুষ্তি দেখিয়। তোমার চক্ষের সার্থকতা সম্পাঁদন করিবে। 
ভগবদ্ভক্ত সাকারবাদীই হউন আর নিরাকাররাদীই হউন, প্রকৃত 
ভগবন্তক্ত বৃক্ষলতায় সমুদ্র-সরোবরে পাহাড়-পর্ববতে ভগবানের 
সৌন্দর্য্য দেখাঁকে চক্ষের সর্ববাপেক্ষ। প্রধান ও প্রি কার্ধ্য মনে 
করেন,পক্ষীর ক্জনে এবং নিঝ্রিণীর ঝর ঝর শবে স্োভন্বতীর 
কলকল কর্োলে ভগবানের মধুর সম্ভাষণ শ্রবণ করাকে কর্ণের 
মর্ববাপেক্ষা প্রধান ও প্রিয় কাধ্য মনে করেন, পুষ্পের সৌরভে 
ভগবানের সৌন্দর্যের সৌরভ আত্মাণ করাকে নাপিকার সর্বা- 
পেক্ষা প্রধান ও প্রিয় কা্ধ্য মনে করেন। ইংরাঁজ কবি কাউপর 
ও বার্দন্বার্থ এই মনে করিয়া জগতে জগদীশ্বরকে দেখিয়া- 
শুনিয়া বেড়াইতেন। নতুবা তীহাদের চক্ষু কর্ণাদির সার্থ- 
কতা ও পরিতৃপ্তি হইত না । প্রকৃত ভগবন্তক্ত জড় চৈতন্যের 
প্রভেদ জানেন না। প্রভেদ থাকে তাহার তগবানই তাহা 
জানেন। তিনি তীহার মনও যেমন ভগবান হইতে পাইয়াছেন 


ঙ২ ত্রিধারা। 





দেহও তেমনি ভগবান হইতে পাইয়াছেন। অতএব তীহার 
মনকেও যেমন ভিনি তীহার ভগবানকে আহুতি দেন, দেহকেও 
তেমনি তাহার ভগবানকে আহছুতি দেন। দেহকে আহুতি 
মা দিয়! তিনি থাকিতে পারেন না । তাই তিনি বাঁহজগতে ভগ- 
বানকে না দেখিয়া না শুনিয়। অঞ্জলি ভরিয়া পুষ্পোৎসর্থ ন! 
করিয়া থাকিতে পারেন না। ভীহার ভগবানের এত সাধের এত 
ন্থনূর এত বৈচিত্র্যময় এত ধর্ধরযতরা জগতে ভগবানকে চক্ষু 
ভরিয়া না দেখিলে, কর্ণ ভরিয়া! ন| শুনিলে, অঞ্জলি ভরিয়া জগৎ 
উপহার না দিলে তীহার মনের সাধই বাঁ মিটে কৈ, তীহার 
দেহের সাধই বা মিটে কৈ? তুমি, জ্ঞানী, সাকারবাদের নিন 
কর; কিন্তু তিনি প্রেমিক ও ভক্ত, ভগবানকে চক্ষু দিয়! না 
দেখিয়। থাকিতে পারেন কৈ? ভীহার ভগবান সাকার বল নিরা- 
কার বল দবই। মন বল দেহ বল ভগবান তাহাকে 
দেখিবার জন্য যত রকম যন্ত্রদিয়াছেন মেই সবযন্ত্রদিয়া 
ভগবানকে ন। দেখিলে তীহার ভগবানকে দেখিয়া আশ. মিটে 
কৈ? তিনি প্রেমিক ও ভক্ত-তিনি তোমার সাকার নিরাকার, 
বাদের অত সব মারগ্্যাচ বুঝেন না-অত সব অপীমন্বমসীমতের 
গণ্ডগোল বুঝেন না__তিনি এক ভগবানের নেশায় ভোর, তিনি 
এক অনীম ভগবানই বুঝেন, এক অসীম তগবানেই তরা, এক 
অনীম ভগবদ্ত লইয়াই বিহ্বল। ভিনি মীমা নরহন্দের ধার ধারেন 
কি? শীমা সরহদ্দই বা তাহার করিতে পারে কি? ত্বাই তিনি 
তোমার সব বাঁদাবাদের সীমানা মরহন্দ ছু'ড়িয়া ফেলিয়া দিয়া 
সম্পূর্ণরূপে সীমা রহিত হইয়া ভীহার যা আছে মন বল, 
জান্ধা বল, চক্ষু বল, কর্ণ বল, নাসিক বল, হা বল, সমন্ত 


ইন্দ্রিয়ের আকাঙ্ষা । ৬৩ 





ভরিয়া তীহার ভগবানকে দেখেন এবং ধ্যান করেন। তাই ঘোর 
ভগবস্তক্ত তাহার মনকেও যেমন ভগবানকে আহুতি দিয়া পবিত্র 
করেন,তীহার দেহকেও তেমনি ভগবানকে আহুতি দিয় পৰিজ্ত 
করেন । তীহার মনেরও যেমন পবিত্র হইবার বাসন, তাহার 
দেহেরও তেমনি পবিত্র হইবার বাঁপনা। সে বাসনার কাছে 
মনের দেহের প্রভেদদ নাই। প্রভেদ থাঁকিলেও সে বাসনার 
বলে তাহা বিলুপ্ত হইয়! যাঁয় এবং নিক্ুষ্ট দেহ উৎকৃষ্ট মনের যে 
উৎ্কৃষ্টতা সেই উৎকৃষ্টতা৷ লাভ করে। যে ছোট, ভক্তিবলে 
সে বড় হইয়া যায়, জগতের দুইটি দৃশ্যমান উপকরণ__জড় ও 
চৈতন্য--ভক্তিবলে এক হইয়া সেই এক-কে প্রাপ্ত হয়। ইহা- 
তেই জগতের মুক্তি। ভগবানকে প্রাপ্ত হইতে হইলে, ভগবা- 
নের কাছে বাইতে হইলে, শুধু মনকে পবিত্র করিয়! লইয়া গেলে 
চলিবে না, দেহকেও পবিত্র করিয়া লইয়া যাইতে হইবে। 
ফলত দেহকে পবিত্র না করিলে মনকেও পবিত্র করিতে পারিবে 
না। দেহকে ভগবদ্তক্ত না করিলে মনকেও ভগবন্তক্ত করিতে 
পারিবে না। দেহকে মুক্ত করিতে না পারিলে মনকেও মুক্ত 
করিতে পারিবে না। কঠোর তপস্বীর ন্যায় দেহকে ধ্বংস করিয়া 
ফেলিলে পাঁপ হইবে । নিকৃপ্টকে উৎকৃষ্ট করাই ধর্শের উদ্দেস্ত_ 
নিকুষ্টকে উত্কৃষ্ট করাই মুক্তি । নিকৃষ্ট দেহকে নষ্ট করা অধর 
নিকৃষ্ট দেহকে উৎকৃষ্ট করিয়! উৎকৃষ্ট আত্মায় মিশাইয়া ফেলাই 
প্রকৃত ধর্শ এবং মুক্তি। দেহকে আত্মার আকাঙ্ষায় ভরাইয়! 
ফেলিতে না পারিলে দেহও আত্মায় মিশে না মানুষের মুক্তিও 
হয় না। অতএব দেহ বল, মন বল, তোমার যা আছে সমস্তকে 
ভগবপ্ুক্ত করিলে তবে তুমি ভগবানকে পাইবে। ইন্দ্রিয়বিশিষ্ট 


৬৪ ত্রিধারা। 


দেহকে দেই জন্য উন্নত করিয়া আত্মার আধ্যাত্মিকতায় মিশা- 
ইয়া দেওয়! চাই। নিকৃষ্ট জড় উৎকৃষ্ট চৈতন্যে না মিশিলে 
সমস্ত জগৎ জগদীশ্বরে মিশিতে পারিবে ন! বলিয়া, ভগবান জড়কে 
এবং মানবেন্ত্িয়কে আধ্যাত্মিকতা এবং আধ্যাত্বিক আকাঙ্ষ। 
দিয়াছেন। দেই আকাঙ্ফার বশীভূত হইয়া মন্থুষ্যের মনের ন্যায় 
মনুষ্যের ইন্দ্িয়ও ভগবানের পদে আপনাকে আহ্তি দেয়। 
সে আহুতিকে নাকার উপানন বলে না, প্রেমভক্তির তরামাত্র! 
বলে। মনের আহুতির সহিত ইন্্িয়ের সেই আহুতি যোগ হইলে 
তবে ভগবানের কাছে মন্ুষ্যের আহুতি পূর্ণতা লাভ করে,নচেখ 
মন্থয্যের ভক্তিও পূর্ণ হয় না, ঈশ্বরাহুতিও পূর্ণ হয় না। ভগ- 
বানকে পূর্ণাছুতি দিবার জন্য মন্ুষ্যের মনও যেমন আধ্যাত্মিক 
আকাঙ্কাবিশিষ্ট হইয়াছে মন্ু্যের ইন্জ্রিয়ও তেমনি আধ্যাত্মিক 
আকাঙ্ষাবিশিষ্ট হইয়াছে। যাহার ইন্দ্িয়ের মে আকাঙ্ষা নাই 
তাহার ঈশ্বরপূজাও অসম্পূর্ণ ঈশ্বরাস্ৃতিও অসম্পূর্ণ ঈশ্বরভক্তিও 
অনপ্পূর্ণ। সেমুভি লাভ করিতে পারে না। 


হাঁ 





_ দ্বিতীয় ধারা । 


কেতাঁব কীট। 


্রস্থকর্তী। দণগ্তরি, এই পোকাগুলাকে মেরে ফেলত। 

কে-কী। কেন বাপু, মারধর, করা কেন, পড়িতে আমি” 
নাছ পড়। 

গ্র। আ গেল, এ পোকাটাত ভারি জেঠ৷ দেখছি । 

কে-কী। সত্য কথা বলিলেই জেঠামি হয় ! 

গ্র। কীট-রত্ব ! আপনিও কি কোন মহাসত্য আবিষ্কার 
করিয়াছেন নাকি? ক্ষুত্র মানবের শিক্ষার্থ তাহা প্রকাশ করিয়া 
বলুন্‌। 

কে-কী। বিক্রুপ! ভালই। তাহাতে আমার কিছুই 
হইবে না, তুমি যে কেবল দ-দর্বন্থ তাহাই প্রকাশ হইবে। 
অসার দাম্ভিক বই আর কেহ বিদ্রুপ করে ন1। 

গ্র। যে আজ্ঞে! এখন মহাঁসত্যটা কি বলুন। * 

কে-কী। বলিব বইকি। ঠা্টাই কর আর যাহাই কর, 
বলিব। বলি, পুস্তকাগারে পড়িতে আমিয়াছ পড়, মারপিট্‌ 
করা কেন ? মারপিট কর তোমাদের একটা রোঁগ বটে? 

গ্র। আমাদের কত মারপিট করিতে দেখিয়াছ? 

কে-কী। মারপিট. ছাঁড়া তোমাদের কোন কাজইত 
দেখিতে পাই না । পাঁচ জনের অন্ন না মারিয়া ভোমরা আপ- 
নারা অন্ন করিয়া খাইতে পার না। পাঁচ জনকে নর্বস্থাস্ত না 
করিয়। তোমরা আপনার ধনবাঁন হইতে পার না। পাঁচজন 
খ্যাতনাম। ব্যক্তির অখ্যাতি না করিয়া তোমরা আপনারা খ্যাতি 


৬৮ ্রিধারা। 


লাঁভ করিতে পার না । এমন কি, পরকে না মারিয়া তোমরা! 
জ্ঞানোপার্জন করিতেও পার না-_ 

গ্র। সে কেমন কথা? 

কে-কী। তোমাদের সেই ড151890৮07-এর কথা । জীয়স্ত 
পশুপক্ষীগুলাকে না মাঁরিলে তোমাদের বিজ্ঞানের কলেবর বাড়ে 
না। পাঁচ জনকে ন| মারিলে তোমরা আপনার! জীবন রক্ষা 
করিতে পার না । এমনি তোমাদের ক্ষমতা, আর এমনি তোমা- 
দের ধর্ম! তোমাদের জাতিকে ধিক্! তোমাদের মানব নামে 
ধিকু। 

গ্র। এখন দপ্তরি তবে তোকে ঠিকুকরে দিক্‌। দগ্তরি! 
এই পোকাগুলাকে মেরে ফেলত । 

কে-কী। মরিতে ভয় করি না। তোমাদের জাতির ঢের 
শ্রাদ্ধ করেছি, এখন মরিলে ছুঃখ নাই। কিন্তু একটা কথ! 
জিজ্ঞাসা করি । আঁমাঁকে কি জন্য মারিবে ? আমাকে মারিলে 
তোমার অন্নও বৃদ্ধি হবে না, রশ্বর্াও বৃদ্ধি হবে না, যশও বৃদ্ধি 
হবে নাঁ, সুখ বৃদ্ধি হবে নাঁ। তবে আমাকে কি জন্য মাঁরিবে ? 
মারপিট করা তোমাদের একটা রোগ বটে? 

গ্র। তুই জানিন্‌ না, আমাদের কত লোকসাঁন্‌ করিতে- 
ছিন্‌? এই সব বই কাটিয়া কাটিয়া তুই একেবারে নষ্ট করিয়া 
ফেলিতেছিন্‌, তোকে অবশ্ত মারিব। 

কে-কী। আমি মরিলেই কি তোমাদের বই আর নষ্ট হবে 
নী? তোঁমাঁদের সব বই অমর হবে? 

গ্র। হবে বৈকি। তোরা না কাটিলে বই আর কেমন করে 
নষ্ট হবে? 


কেতাব কীট । ৬৯ 


কে-কী। গ্রস্থকারকুলতৃষণ | খরস্থ কাহাকে বলে তাও জান 
মা, পোকা কাহাকে বলে তাও জান না? এই দেখ দেখি 
এই সেক্সপীয়র খানা, এই হোমরখানা, এই বাল্দীকিখানা, এই 
উপনিষদ খানা_-এসব গুলাত কাটিয়া কুঁচি কচি করিয়া 
ফেলিয়াছি। কিন্তু এসকল পুস্তকের কি কিছু করিতে 
পারিয়াছি? কিছু না। করিবার যো কি? এসব পুস্তক 
হয় মানব-প্রক্তিতে পরিণত হইয়াছে, নয় মানবাত্বার সুগভীর 
আকাঙ্ষার ভিতিব্বরূপ হইয়া! ঈাড়াইয়াছে, নয় উন্নত নর- 
নারীর প্রাণবায়ুস্বরূপ হইয়।. পড়িয়াছে, নয়. সমাজ-শরীর 
নিয়ামক মহাশক্তি হইয়। উঠিয়াছে, নয় সামাজিক আচার ব্যব- 
হার প্রথা প্রক্রিয়ারূপে বিকসিত হইয়] পড়িয়াছে। অতএব এ 
সকল পুস্তক আর পুস্তকে নাই, এ নকল পুস্তক আত্মারূপ, 
হৃদয়রূপ, সমাজ-রূপ, শক্তিরূ্প ধারণ করিয়াছে । এ সকল 
পুস্তক আর পুস্তকাগারে থাকে না। এসকল পুস্তক যদি 
পড়িতে হয় ত এস্থানে আমিও না। এসকল পুস্তক এখন 
মানবজীবনে আছে, মাঁনব-সমাজে আছে, মীনব-শক্তিতে আছে, 
মানব-জগতে আছে। এ নকল পুস্তক পড়িবার ইচ্ছ! হয় ত 
এস্থান হইতে চলিয়! গিয়া মানব-জগতে প্রবেশ কর। আমি, 
কেতাব-কীট, এ সকল পুস্তকের কি করিতে পারি ! এ কল 
পুস্তক আমি যতই কাটি না কেন, ইহাদের উচ্ছেদ অসম্ভব । 
ইহাদের এত কাটিয়া! খাই তবু আমাদের পেট ভরে না, মনে হয় 
যেন পেটে কিছুই যায় নাই। 

গ্র। সব বইই কিএই রকমের? তুমি ত সব বইই 
কাট। 


৭5 _... ত্রিধারা। 





কে-কী। আমি সব বইই কাটি। কিন্তু এই সব বইয়ের 
ন্তায় যে সব বইয়ের আত্মা আছে সে সব বই আমি কাটিলেও 
কাটা গড়ে না, নষ্ট হয় না। যেসব বই শুধু বই নয়, মানব- 
জাতির প্রকৃত বল, নে সব বইয়ের আমি, কেতাঁব-কীট, আমিও 
কাটিয়! কিছু করিতে পারি না, এবং তুমি, অস্য়ারীপী গ্রন্থকার, 
ভূমিও নিন্দা করিয়া কিছু করিতে পার না। সে সব বইয়ের 
সম্বন্ধে ভোমার ক্ষমতা দেখিতে যত বেশিই হউক প্রকৃত পক্ষে 
এই ক্ষুদ্র কেতাব-কীটের ক্ষমত| অপেক্ষা বেশি নয় ! 

গ্। আবার জেঠামি ? 

কে-কী। জেঠাদের কথা কইতে গেলেই জেঠামি হইয়া 
পড়ে, কি করিব বল। সে যাঁহউক। যে নব বইয়ের আত্মা 
নাই, দে সব বই কেবল বই মাত্র, মানবজাতির প্রকৃত বল নয়, 
স সব বই আমি কাটিলেও নষ্ট হয়, না কাটিলেও নষ্ট হয়। সে 
সব বই থাকা না থাকা! সমান । সে সব বই নষ্ট হওয়াই ভাল। 
সে নব বই কেবল অহঙ্কার বৃদ্ধি করে, হাঁকডাঁক বাড়ায়, মান্ধু- 
কে আড়ম্বরে ভুলায়, মোজ1 পথকে বাঁকা করিয়া দেয়, শস্যের 
পরিবর্তে খোসা খাইতে দেয়, জানকে মত্তায় বিলুপ্ত করে, 
সুস্থ আত্মাকে রোগগ্রস্থ করিয়া মারিয়া ফেলে। সে সব বই না 
থাকাই ভাল। তবে আর আমাকে মার কেন? 

গ্র। আচ্ছা, তুমি যদিও আমাদের কোন অপকার কর না, 
কিন্তু তোমা হইতে আমাদের কোন উপকারও ত হয় না। ভবে 
তোমাকে মারিব না কেন? তোমাকে রাখিয়া! কি লাভ? 

কে-কী। হা, এটা ঠিক বটে। যাহা দ্বার কোন 
কাজ পাওয়া যাঁয় না, যেমন বৃদ্ধ পিতা! এবং বৃদ্ধ! মাতা, 


কেতাধ কীট। ৭১ 


ভাহাকে রাখিয়া লাভ কি? তাহাকে মারিয়। ফেলাই 
ভান। যাহাকে লইয়া সুখ সম্ভোগ হয় নাযেমন নিঃস- 
হায় বৃদ্ধা কুটুষ্ষিনী বা নিরক্ষর উপার্জনাক্ষম জ্ঞাতি- 
পুত্র-তাহাকে রাখিয়া লাভ কি? তাহাকে দূর করিয় দেও- 
য়াই কর্তৃব্য। হিন্দুর ছেলে হইয়া তোমরা যে রকম পাকা- 
পোক্ত জ্ঞানী হইয়াছ তাহাতে তোমাদের বাহাছুর বলিতে 
হয়। ফলতঃ এখন তোমাদের জীবনে আর কোন লক্ষ্যই 
নাই--ধর্্ম বল, বিদ্যা বল, বুদ্ধি বল, উন্নতি বল, পরোপকার 
বল-_কোন লক্ষ্যই নাই, এখন বাহাঁছুরী তোমাদের একমাত্র 
লক্ষ্য । কিন্তু, বাহাছুর সাহেব! আমি লোকের কিছু উপ- 
কারও করিয়! খাঁকি। শুনিবে কি? 

গ্র। বল, কিন্ত অত 10001180199 610. করিও না। 

কে-কী। বাপরে! তোমার কাছে কি আমি 1009:6- 
9200০ 681]; করিতে পারি? সেয়ে বডস্পঞ্ধার কাজ হবে। 
সে ভাবন1 করিও না । এখন বলি শুন। তুমি ত একজন 
গ্রন্থকার । সকল গ্রস্থকারের স্তায় তোমারও পড়াশুনা খুব 
কম কিন্তু পড়াশুনার ভা খুব বেশী। তুমি সেক্সপীয়রের 
নাটক ৩ খাঁনা কি ৪ থানার বেশী পড় না, মিষ্টনের ৩ সর্গের 
বেশী পড় না, বাল্মীকির রামায়ণের একটা শ্লোকও পড় না, 
কালিদাসের শকুত্তলার প্রথম অঙ্ক বই আর কিছুই পড় না। 
কিন্ত এমনি ভাণ করিয়া থাক, যেন সেক্সপীয়র মিণ্টন বাঁল্মীকি 
কালিদাস প্রভৃতি সব দেশের সব গ্রস্থকাঁরের সব রচনাই খাইয়া 
ফেলিয়াছ। এ ওমোরটুকু কেবল আমার প্রসাদাঁৎ করিতে পার 
কিনা বল দেখি? আবার কথন কথন প্ররুত বিঘন্মগুলিকেও 


২ .. ত্রিধারা। 





যে 41017, [)07988 40017798, 72:9091879 প্রভৃতির কথা 
বলিয়া তাঁক লাগাইয়া দেও, সেও কেবল আর্মি, কেতাব কীট, 
আমার প্রসাদাৎ কিনা বল দেখি? তবেই ত আমি, ক্ুত্্ 
কেতাঁব কীট, আমিও তোমার কিঞ্ৎ উপকার করিয়া থাকি। 
আমার বাতাস একটু পাইলে তোমার ভাল হয় কি না বঙ্প 
দেখি? 

গ্র। ঠিক বলেছ। তোমাকে কি মারিতে পারি! ভূমি 
চিরকাল এই পুস্তকাগারে থাকিয়া পুস্তক কাট, আমি তোমায় 
কিছু বলিব না। কিন্তু এখন আমাকে ছা10061102107-এর 
[০ মন্বন্ধীয় গ্রন্থ হইতে ছুই চাঁরিট! কথা বলিয়া দেও দেখি, 
আমি 012196০০০-এর বজিল মন্বদ্বীয় মতটা খণ্ড খণ্ড করিয়া 
719৮৮ নদীর জলে ফেলিয়া দিয়া পৃথিবীতে একটা প্রকাও 
কীরণ্তিপতাকা উড়াইয়া দি। 

কে-কী। আঃ সে আর কোন্‌ কখ! ? এই বলিয়া! দিভেছি 
লিখিয়! লও । দেঁখিতেছি, বই কাহাকে বলে এবং কেতাঁব কীট 
কাহাকে বলে তুমি যেমন বুঝিয়াছ তেমন আর কেহ বুঝে না। 
আহা! ! তুমি আমার শিক্ষার প্রকৃত মর্ম গ্রহণ করিলে! তুমি 
বাহাছুরের গোষ্টিতে বাহাছ্র ! এখন যাঁও তুমি 01898009-এর 
মাথা খাঁওগে-আমি তোমার গোষ্ঠীর মাথা থাইগে। দগ্চরি, 
খা বাঙ্গালা আল্মারিটায় আমাকে ভুলিয়া দেও ত, দেখি, 
আমার উদরাপাৎ হয়েও ওদের কয়জন বেঁচে থাকে । কেতাব- 
কীটকে চেনে না, আবার বই লিখতে চাঁয়? হা কপাল! 

[ কুট্কাট্‌ কুট্কাট্‌ কূট্কাট্‌ কুট্কাট্_-] 


রা 1 (0; ৮ 
শ্লেচ্ছ পণ্ডিতের দখা ১৭ 
নিতে রঃ 90886 
কলিকাতার তিন ক্রোশ উত্তরে গঙ্গার পশ্চিম সীরে উততর- 
পাড়া। উত্তরপাড়া একটি প্রসিদ্ধ স্থান ; বঙ্গের প্রসিদ্ধ জমি- 
দার শ্রীযুক্ত জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের বানস্থান। উত্তরপাড়ার 
হিতকরী সভার কথা সকলেই শুনিয়াছেন এবং উক্ত নতাঁর 
বাৎসরিক উৎ্দব উপলক্ষে বোস্বাই জাবের যে ওণাগুণ বিচার 
হয়, তাহা বোধ হয় কেহ কখনও ভুলিতে পারিবেন না । উত্তর- 
পাড়ায় একটি উৎকুষ্ট বিদ্যালয় আছে, একটি দাঁতব্য চিকিৎ- 
সালয় আছে, একটি উত্তম বাজার আছে, মিউনিসিপালিটি 
আছে। আর আছে-একটি উৎকৃষ্ট পুস্তকাঁলয়। সভ্য- 
তার উপকরণের মধ্যে নাই কেবল আদালত । কিন্তু না থাকি- 
যাও উত্তরপাড়ায় যেরূপ মামলা মোকদ্বমা, থাকিলে যে কি 
হইত, বলে কার সাধ্য? 
মধো একদিন উত্তরপাড়ায় গিয়াছিলাম। ছুই এক জন 

বন্ধুর সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলাম। আর তথাকার পুস্তক 
লয়টি দর্শন করিয়াছিলাম। পুস্তকালয়ে তারতবর্ধসনবন্বীয 
অনেক পুক্তক পুস্তিকা ও কাগজপত্র আছে। দেখিতে দেখিতে 
তন্মধ্যে একখানি অপূর্ব পুস্তিকা পাইলাম । পুস্তিকাখানি নিতান্ত 
ক্ষুদ্র নয়-প্রায় দেড়শত পৃষ্ঠা_নাম, ন্ুধাবিনুসংগ্রহ। উহ্ছাতে 
তিনটি প্রবন্ধ দেখিলাম__একটি বর্গুর হাঙ্গামার কথা, একটি 
রিষুঃপুরের মদনমোহনের কথা, একটি গ্নেচ্ছ পর্ডিতের কথা। 
শেষের কথাটি সংক্ষেপে বলিতেছি। 


৭৪ ূ ত্রিধারা। 


প্রসিদ্ধ সংঙ্কৃতজ্ঞ কোলক্রক সাহেব জগন্নাথ তর্কপঞ্চা- 
ননকে বড় ভাল বাঁসিতেন। একদা তিনি তর্কপঞ্চাননের 
ত্রিবেণীর বাটীতে গিয়াছিলেন। জগন্নাথ তাহাকে দেশীয় 
রীতিতে আদর অতার্থন! করিয়! বসিবার জন্য একখানি কাষ্ঠা- 
সন বা পী'ড়া প্রদ্দান করিলেন । সাহেব কৌন রকম অসন্তোষ 
প্রকাশ না করিয়া, তদুপরি উপবেশন করিলেন। তথন তর্ক- 
পঞ্চানন এক ছিলিম তামাক সাঁজিয়! খাইতে আরম্ভ করিলেন 
এবং এক টুকরা জলজ্ত অঙ্গার দাহেবের নিকট ফেলিয়া দিয়া! 
বলিলেন-__“সাহেব চুরট খাও, কিন্তু দেখিও যেন ধোয়া আমার 
গায় লাগে না।” সাহেব চুরট ধরাইয়া খাইতে আরম্ত করিলেন। 

ধূমপান করিতে করিতে ছুই জনে নানা কথা কহিতে 
লাখিলেন-_দাঁয়ভাগাঁদির কথাই বেশি। কোলক্তক তখন 
দায়ভাগ অনুবাদ করিতেছিলেন। সেই জন্যই বোধ হয় জগ- 
ন্নাথের বাটাতে গিয়া দাঁয়ভাগের কথাটাই বেশী কহিতেছিলেন।* 

প্রায় ছুই ঘণ্টাকাল এইরূপ কথাবার্তার পর তর্কপঞ্চানন 
সাহেবকে কিঞ্চিৎ জলযে'গ করাইলেন! জলযোগের সাঁমথীর 
মধ্যে ফলের ভাগই বেশী-ফুটি, তরমুজ, পেঁপে, আম, কাটাল, 
রস্তা এবং বড় একবাটি দুগ্ধ । সাহেব ছুপ্ধ বেশী খাইলেন না, 
রস্তা যাহা দেওয়া হইয়াছিল তাহা খাইয়া আরো! গোটীকতক 
চাহিয় লইয়া খাইলেন। রম্ভার কথায় তর্কপর্ধানন ছুই একটা 
পরিহাস করিলেন, সাহেব শুনিয়া খুব হাসিলেন। 

জলযোগের পর আবার কথাবার্তা চলিতে লাগিল, সাহেব 
সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের বিস্তর প্রশংসা করিলেন। কিন্তু 
7 * এ কথটা পুস্তিকায় নাই, আমাদের অনুমান মাত্র । 


শ্লেচ্ছ পণ্ডিতের কথা। ৭ 





সংস্কতে ইতিহাদ নাই বলিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করিলেন। তর্ক- 
পর্শনন যেন বিশ্বত ও চমকিত হইয়া বলিলেন-_“সে কি 
দাহেব, ইতিহাল নাই কি?” 

সাহেব । কই, ইতিহাস কি আছে ? 

তর্ক। কেন, রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণগুলি কি? 
ভণতলি কি ইতিহাস নয়? 

সাহেব । ওগুলি ইতিহাস নয়। রামায়ণ মহাভারত কাব্য, 
পুরাণগুলি উপন্যাস | . 

তর্ক। হ'লই বা কাব্য, হ'লই বা উপন্যাস-__কাব্য বা 
উপন্যাস হইলে কি ইতিহাস হইতে পারে না? 

সা। কেমন করিয়া ইতিহাস হইতে পারে? ইতিহাসে 
কেবল প্রকৃত ঘটনার কথা থাকে । পুরাপাদিতে তাহা নাই। 

তর্ক। ধরিলাম, নাই__ধরিলাম, পুরাণাদিতে প্ররুত ঘটনার 
বিবরণ নাই। কিন্তু পুরাণীদি সে জন্য ইতিহাদ বলিয়! আখ্যাত 
হইতে পারিবে না কেন? পুরাণাদিতে যে সকল রাজনীতি, 
সমাজনীতি, গাহসস্থানীতি প্রভৃতির বিবরণ আছে তাহা যদি 
গ্রকৃত ঘটনা দেখিয়! লিখিত হইয়া থাকে তবে পুরাণাঁদি ইতি- 
হাস বলিয়! গণ্য না হইবে কেন? গৃহস্থাশ্রমে থাকিয়া কি 
প্রকারে জীবনযাত্রা নির্বাহ করিলে কিরূপ ফলাফল হয়, 
জাতিতে জাতিতে কি প্রকার সন্বস্ধ হইলে কি প্রকার ফলাফল 
হয়, রাজ| কি প্রকারে রাজকার্ধ্য করিলে কি প্রকার ফলাফল হয়, 
ইত্যাদি মানবজীবনঘটিত ও সমাজ সম্বন্ধীয় বহুবিধ তথ্য- 
প্রকৃত মাঁনবজীবন, প্রক্ুত মানবসমাঁজ ও প্রকৃত রাজকার্য্য 
দেখিয়া নির্ণয় করা যায়। নির্ণয় করিয়া! যদি কল্পিত ঘটনাদি 


৭৬ | ত্রিধারা । 


অবলম্বন করিয়াও তাহা বিবৃত কর! হয়, তাহা হইলে সে বিবরণ 
মানবের ইতিহাস বলিয়া গণ্য না হইবে কেন? এই যে 
হিতোপদেশ গ্রস্থে এত নীতি কথা আছে। পণ পক্ষীর গল্পের 
ছলে মে সকল কথা লিখিত আছে বলিয়া! হিতোপদেশ খানিকে 
নীতিগ্রস্থ না বলিয়া উপন্যাম বলিতে হইবে কি? ভগবান 
বেদব্যাসও তেমনি বহুকাল ধরিয়া বহুলোকের জীবন, বহুবিধ 
মন্গষ্যসমাঁজ ও নানা রাজ্যের রাজকাধ্য দেখিয়! মানবজীবন, 
সমাজ ও রাঁজকার্ধ্য সম্বন্ধীয় নান! তথ্য অবগত হইয়া, পুরাণে 
সেই সকলের ব্যাখ্যা করিয়া গিয়াছেন। ধরিলাম, কল্লিত 
ঘটনাদি অবলম্বন করিয়াই তাহা ব্যাখ্য! করিয়াছেন। কিন্তু 
তজ্জন্য পুরাণগুলি ইতিহাস না হইয়া উপন্যাস বা উপকথা 
হইবে কেন? এখন আর একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। তুমি 
যে বলিলে, পুরাণাঁদিতে প্রকৃত ঘটনার কথা নাই । তুমি কেমন 
করিয়া! জানিলে, নাই ? রাঁমরাবণের যুদ্ধের কথা, কুরুক্ষেত্রের 
কথা,.হরিশচন্দ্রের কথা,__এসব যে উপকথা বা! অলীক কথা, 
কেমন করিয়া জাঁনিলে? 

সা। আচ্ছা, এই রামায়ণের যুদ্ধের কথাট। ধর। রাম 
বানর ভল্গ্‌কের সাহায্যে রাবণ বধ করিয়াছিলেন, ইহা কি 
প্রকৃত কথ! বলিয়! বিশ্বাম করা যায়? 

তর্ক। কেন, সাহেব, কলিকাতায় তোমাদের জাহাজের 
যে সব গোরা দেখিয়াছি, তাহাদিগকে বানর বলিলে কি বড় 
একটা মিথ্যা বলা হয়? 

মা। (হাসিয়া) না, তা হয় না, সত্য। বিদ্যাবুদ্ধি 
প্রভৃতিতে তাহারা বাঁনরবৎই বটে । 





শ্লেচ্ছ পণ্ডিতের কথা। খ৭ 


তর্ক। কিন্ত তাহাদের সাহায্যেইত তোমরা জাহাজে 
চড়িয়া মহাসাগর পার হইয়া আপিতেছ। বে আর বানরের 
মাহায্যে একটা রাজাকে পরাজয় করা এমন কি অসম্ভব বা 
অসঙ্গত কথ! ? 

সা। সে যাহা হউক, কিন্তু পুরাণাদিতে ত গ্রকুত ঘটন। 
বর্ণিত হয় নাই, তবে__ 

তর্ক। আঁবাঁর এ কথা? কেমন করিয়| জানিলে প্রত 
ঘটন] বর্ণিত হয় নাই- প্রমাণ কই? 

সা। আচ্ছা, ও কথাটা ছাঁড়িয়া দিন। পুরাণাদি যে ইতি- 
হাসের লক্ষণাক্রান্ত নয়, তাহাত অস্বীকার করিতে পারেন না । 

তর্ক। কেন, ইতিহাসের লক্ষণ কি? 

সা। ইতিহাসের প্রধান লক্ষণ এই যে উহাতে অলীক ব1 
কাল্পনিক কথ! থাকে না, কেবল প্রকুত ঘটনার কথা৷ থাকে। 

তর্ক। এইত ও কথা ছাড়িয়া দিলে, আবার .তুলিতেছ 
কেন? 

সাঁ। তুলিতেছি ভাহাঁর কারণ এই যে, ইতিহাঁসের লক্ষণ 
নির্দেশ করিতে হইলে, অগ্রে এ লক্ষণটি নির্দেশ করিতে হয় । 

তর্ক। কিন্তু বুঝিলে ত যে ও লক্ষণ পুরাণাদিতে নাই 
এমন নয়। 
, সা। ভা বটে, কিন্তু একটা কথা আছে। প্রত ঘটন! 
বর্ণিত হইলেই যে ইতিহাস হয়, তাহা নয়। ইতিহাসের বর্ণনার 
একটি লক্ষণ আছে, দেই লক্ষণের অভাঁবেও ইতিহাসের অভাব 
হয়। 

তর্ক। সে লক্ষণটি কি? 





৭৮ ত্রিধারা। 


সা। সকল জিনিসের পুঙ্খান্ুপুঙ্খ বিবরণ । 

তর্ক। নে কেমন? 

সা। একটি উদাহরণ দিয়া না বুঝাইলে সহজে বুঝিতে 
পারিবেন না। 

তর্ক। উদাহরণ দিয়াই বুঝাও। 

সা। এই রামায়ণের কথাই ধরুণ। রামায়ণ _রাজ| 
রামচন্দ্রের কথা। কোন লোকের কথা কহিতে হইলে সর্বাগ্রে 
তাহার জনুস্থানের পরিচয় দিতে হয়। কিন্তু রামের জন্বস্থান 
অযোধ্যা সম্বন্ধে রামায়ণে বিশেষ কিছুই লিখিত নাই। উহা 
যে দেশে অবস্থিত তাহার চৌহদ্দী লিখিত নাই, যে জেলায় 
অবস্থিত তাহার নাম কি চৌহন্দী কিছুই লিখিত নাই, উহ্থার 
লাযটিটুড,. লঞ্ষিটুড লিখিত নাই, রামের জন্মের পূর্বে উহা 
কখন্‌ কোন্‌ নামে খ্যাত ছিল ইত্যাদি অসংখ্য কথার কোন 
কথাই লিখিত নাই। তবে কেমন করিয়া বলি যে রামায়ণ 
ইতিহাসের লক্ষণাক্রান্ত ? 

তর্ক। আচ্ছা, আরো একটু বল, লাগছে ভাল। 

সা। রামায়ণে রামের জন্মের কোন বর্ণনা নাই বলিলেই 
হয়। রামায়ণ যদি ইতিহাস হইত, তাহ! হইলে উহাতে রামের 
জন্মের এই রকম একট| বিবরণ থাকিত--অমুক মনের অমুক 
মাদের অমুক ভারিখ দ্িবদে বেল! ৮ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট ১৯ 
সেকেগ্ডের সময় রামের জন্ম হয়। কোন কোন ইতিহাসে 
বলে, ১৯ সেকেও্ডের সময় নয়, ১৯২ সেকেও্ডের মময়। কিন্তু 
অপর সমস্ত কাজ ফেলিয়া, এমন কি আহার নিদ্রা প্ধ্যস্ত এক 
রকম ত্যাগ করিয়! রাজবাটীর খাস সেরেন্তায় ক্রমাগত সাড়ে 


শ্লেচ্ছ পণ্ডিতের কথা । ৭৯ 





চারি বৎসর অনুসন্ধান করিয়া আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত 
হইয়াছি যে রামের জন্ম ১৯২ সেকেওডের সময় হয় নাই, . ঠিক ১৯ 
সেকেণের সময় হইয়াছিল। ধাহারা বলেন ১৯২ সেকেগ্ডের 
সময় রামের জন্ম হইয়াছিল, তাহার1 ভয়ানক ভ্রম করিয়াছেন 
এবং ইতিহাস কলস্কিত করিয়াছেন । তভীহারা আর একটি 
বিষম ভুল করিয়াছেন । তীহার! বলেন যে, যে স্থৃতিকাগারে 
রামের জন্ম হয়, তাহা ৭ হাত দীর্ঘ, ৪ হাত প্রস্থ ও ৫ হাত উচ্চ। 
আমরা কিন্তু এবিষয়ের মত্যাঁসত্য নিরূপণ করা অতিশয় 
প্রয়োজনীয় জানিয়! বিশেষ অনুসন্ধান করিয়াছি । যে ঘরামি 
স্থৃতিকাগার নির্মাণ করিয়াছিল রাঁজবাটির হিসাব সেরেন্তায় 
তাহার নাম ধাম জানিয়া লইয়া আমরা প্রথমে অযোধ্যায় 
ঘরামি পলীতে তাহার অন্থসন্ধীন করি। দশ পনর দিন অন্থ- 
সম্ধানের পর অবগত হইলাম যে সে ঘরাঁমি অযোধ্যাবাসী নয়, 
দে রামের জন্মের কিছু দিন পূর্ব্বে ব্গদেশ হইতে আসিয়া $ 
স্থতিকাঁগার নির্মাণ করিয়া দিয়া আবার শ্বদেশে চলিয়া 
গিয়াছিল। এরূপ গুরুতর বিষয়ের প্রকৃত তথ্য অবগত হওয়া 
নিতান্ত আবশ্তক বিবেচন! করিয়া আমর! ছুই তিন মাঁসের পথ 
অতিক্রম করিয়া! বঙ্গে উপনীত হইলাম । এবং অনেক অন্ু- 
সন্ধানের পর ঘরামির গ্রামে উপস্থিত হইলাম। ঘরাঁমিকে 
স্ৃৃতিকাগারের দৈর্ঘ্যাদির কথা জিজ্ঞাসা করিলাম । সে বলিতে 
পারিল না, বলিল-_আঁমার মনে নাই । তখন ভাঁবিলাম, এত 
পরিশ্রম ও অনুসন্ধান বৃথা হইতেছে। সেটা কিন্ত ভাল নয়। 
এ রকম অনুসন্ধান বৃথা হইলে কাহারো! এতিহাসিক অন্গনন্ধানে 
নিযুক্ত হইতে প্রবৃত্তি হইবে না। তাহা হইলে ইতিহাসের 


ও ব্রিধারা। 





লমৃহ ক্ষতি হইবে । অতএব শুতিকাগারের পুর্ব বর্ণনা ভ্রান্ত 
বলিয়া নির্দেশ করিতেই হইতেছে। ভ্রান্ত যে নয়, তাহাই বা 
কেমন করিয়। বলা যায়? অযোধ্যার পাটরাণীর স্ৃতিকাগার 
দৈর্ঘ্যে ৭ হাত, প্রস্থে ৪ হাত ও উর্ধে ৫ হাত বই নয়, এমন কি 
হইতে পারে? হ্ৃতিকাগার নিশ্চয়ই দৈর্ঘ্যে ২৭ হাঁত, প্রান্তে ৪৯ 
হাত এবং উদ্ধে ৫০০ হাত। 

রাম ভূমিষ্ হইলে পর কৌশল্যার প্রধানা পরিচারিকা 
রাধী খান দরবারে উপস্থিত হইয়! রাজ] দশরথকে শুভ নন্বাদ 
জ্ঞাপন করিল। তখন বেলা ১০ ঘণ্টা ১১ মিনিট ২২ 
সেকেও। 

তখন খাস দরবারে প্রধান মন্ত্রী, কোধাধ্যক্ষ, ৭ জন সভাসদ, 
৩ জন চোঁপদার, ৪ জন খানসামা, ২ জন গুপ্তচর, ২ জন পত্র- 
লেখক, ৪ জন পত্রবাঁহক এবং ১২ জন প্রহরী উপস্থিত ছিল। 
স্খাদ পাইবা মাত্র রাজা পুত্র দর্শনার্থ সিংহাসন হইতে অবতরণ 
করিলেন । “সিংহাসন স্বর্ণনির্শিতি দেড় কোটা আড়াই লক্ষ 
বর্ণমদ্রা মূল্যের মণিমুক্তা খচিত এবং ওজনে ১ মণ, ৩৫ সের 
৩ পোয়া ২৪০ ছটাক | সিংহানন হইতে নামিয়! তিনি প্রধানা- 
মাত্য, সভানদগণ, ২ জন খানসামা ও ৪ জন প্রহরীকে তাহার 
সঙ্গে আসিতে অনুমতি করিলেন এবং আপন কণ্হার খুলিয়া 
রাধীকে পারিভোবিক প্রদান করিলেন। দে কঠহারের 
মূল্য ৭৫ লক্ষ ১১ হাজার ৫১৭২ স্ব্ণমুদ্রী। রাজ। দশরথ তখন 
আহ্নাদে এতই বিহ্বল যে বাঁ পায়ের জুতা ভান পায়ে এবং 
ভান পায়ের জুতা ব! পায়ে দিয়াই অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন । 
এই অত্যাবশ্যক কথাটি অন্ত কোন ইতিহাসে লিখিত হয় নাই। 


ম্নেচ্ছ পণ্ডিতের কথা । ৮5 





এবং সেই জন্ত সে সকল ইতিহাস এক কালে অসার, অপদার্থ 
ও গৌরবহীন হইয়া! পড়িয়াছে। আমর! ক্রমাগত পঁচিশ 
বৎসর অনুসন্ধান করিয়া এই মহামূল্য কথাটি অবগত হইয়া 
ইতিহাসের এতিহাপিকত্ব রক্ষা করিতে লমর্থ হইয়াছি। 

রাজ! স্থতিকাগারের দ্বারে উপস্থিত হইব মাত্র পু্রবাঁ 
সিনীরা শঙ্খধ্বনি করিতে লাগিল। তখন প্রধান ধাত্রী নব- 
জাত শিশুকে ক্রোড়ে লইয়া রাজার নম্মুখে আনয়ন করিল। 
প্রধানা ধাত্রীর নাম যোশি, তাহার বয়স ৬৩ বৎসর ৭ মাস 
১২২ দ্িন। সে গৌরবর্ণা ও কৃশাঙ্গী। তাহার বাম হস্তে 
৬টি অঙ্গলি এবং দক্ষিণ হস্তের কনিষ্ঠাঙ্গ,লির নখটি খুব বড়। 
রাজার সম্মুখে আনিবামান্র শিশু একবার হাঁচিরা ফেলিল। 
নকলে 'দীর্ধাযু, দীধায়ু' বলিয়া উঠিলেন এবং রাজার অনুমতি 
পাইয়া! কো ধাধ্যক্ষ শিশুকে যৌতুক ও ধাত্রীদিগকে পারিতোধিক 
প্রদান করিলেন। তদনস্তর রাজা বহির্বাটাতে গমন করিবেন 
বলিয়া ফিরিলেন। কিন্তু তখনও তিনি আহ্লার্দে, এত আত্ম- 
হার। যে কৌশল্যার মহল দিয়া না৷ আসিয়া কৈকেয়ীর মহল দিয়া 
আসিতে লাগিলেন । আমিতে আসিতে যখন কৈকেয়ীর 
কক্ষের নিকট উপস্থিত হইলেন তখন হঠাঁৎ একজন পরিচারিকা 
কৈকেয়ীর গৃহাভ্যন্তর হইতে এক কুলা ছাই গৃহের বাহিরে 
ফেলিয়। দিল। ছাই উড়িয়া রাজার চক্ষে পড়িল। “আখ. 
গিয়া, আখ গিয়া" বলিয়া রাজা বসিয়া পড়িলেন। প্রহরিরা 
তাহাকে তুলিয়া! লইয়া চলিয়া গেল। কৈকেয়ীর পক্ষের 
ইতিহান লেখকের! বলিয়া থাকেন যে সেই অবধি রাজ অন্ধ 
হন। কিন্তু আমর জানি, তা নয়--তাহারা ঘোর মিথ্যা কথ! 


৮২ জরিধারী। 


কহিয়াছেন। এ বিষয়ে আমর! নিরপেক্ষ ভাবে বিস্তর অন্ু- 
লন্ধান করিয়াছি। জঙ্গসন্ধীনের ফল এই ইতিহাসের যথা 
স্থানে প্রকাশ ফরিব। তাহার পর-- 

তর্ক। আর বলিতে হইবে ন1। এই রকম করিয়া! লিখি- 
লেই ইতিহাস হয় ? 

মা। হা। 

তর্ক। বাল্সীকি যদি এই রকম করিয়া! রামায়ণ লিখিতেন, 
তাহা হইলে রামায়ণ ইতিহাস আখ্যা পাইত ? 

মা। পাইত বই কি। 

তর্ক। আচ্ছা, এরকম ইতিহাস তোমাদের কত আছে? 

সা। সহশ্র সহত্--সংখ্য। হয় না । 

তর্ক। তোমাদের মধ্যে এ কল গ্রস্থের আদর কেমন? 

সা। খুব_এমন কি, আমাদের মধ্যে যে যত ইতিহাস পাঠ 
করে সে তত পণ্ডিত বলিয়৷ গণ্য হয়। 

তর্ক। তোমাদের টোৌলেও কি এ রকম ইতিহাস বেশী 
গঠিত হয়? 

সা। আমাদের টোল নাই, স্কুল, কালেজ ও ইউনি- 
বসিটি আছে। তথায় বাঁলকদিগকে রাশি রাশি ইতিহাস 
গড়িতে হয়, নহিলে ভাহাদিগের শিক্ষা নিতান্তই অঙ্গহীন হয় 
বলিয়া বিবেচিত হয়। 

তর্ক। সাহেব তোমাদের ইতিহাস আর তোমাদের শিক্ষা! 
লইয়া ভোমর! থাক, আমাদের উপকথাই ভাল। এখন এস 
অন্য কথা কই। 





জীবনের কথা । 
শালী 

ইংরাজী সাহিত্যে ষে প্রকার গ্রস্থকে জীবনচরিত বলে 
সংস্কত সাহিত্যে সে প্রকার গ্রন্থ নাই বলিলেই হয়। শঙ্কর 
বিজয় প্রভৃতি যে ছুই একখানি আছে তাহা ইংরাঁজী জীবন- 
চরিতের প্রণালীতে লিখিত নয় । কিন্তু সংস্কৃতে প্রকুত জীবন- 
চরিত আছে বলিয়| আমার বিশ্বাস । 

ইউরোপে অস্থান্থ গ্রস্থের স্াঁয় জীঘনচরিতেরও বড় বাড়া" 
বাড়ি হইয়াছে। মোটামুটি বলিতে গেলে তথায় এমন লোক 
নাই যাহার জীবনচরিত লেখ! হয় না। আর সেই সকল 
জীবনচরিতে কত কথাই থাকে তাহার ঠিকানা নাই। খাইবার 
কথা, শুইবার কথা, বেড়াইবার কথা, হাই তুলিবার কথা 
ইত্যাদি শত সহস্র কথা থাকে। সে নকল কথা জানিয়া কাহারও 
কিছু মাত্র উপকার নাই। অথচ সেই রকম কথাতেই নেই সকল 
জীবনচরিত প্রায় পরিপূর্ণ থাকে। অতএব জীবনচরিতের 
সংখ্যা খুব কম হওয়া উচিত । যে মে ব্যক্তির জীবনচরিত লেখা 
উচিত নয়। লোকশিক্ষার্থ জীবনচরিত লিখিতে হইলে পৃথিবীতে 
বোধ হয় বিশ পচিশ কি পঞ্চাশ যাঁট থানা! জীবনচরিতের বেশী 
লেখা আবশ্যক হয় না । একই শিক্ষা কতক গুল! পুস্তকে দিবার 
প্রয়োজন কি? ইউরোপে যে সকল জীবনচরিত লিখিত হয় 
তাহার অধিকাঁংশেই বিশেষ কোন শিক্ষা থাকে না, আর অনেক 
গুলাতে প্রায় একই রকম শিক্ষা থাকে। ইউরোপে এখন 
লিখিবার (এবং পড়িবারও) একটু বেয়াড়। রকম নেশা! চলিতেছে 


৮৪ ত্রিধারা ৷ 


বলিয়া অন্যান্য গ্রস্থের ন্যায় জীবনচরিতও রাশি রাশি লেখ! 
হইতেছে । আবশ্যক অনাবশ্যক বিবেচনা নাই, ভাল 


মন্দ বিচার নাই, কেবলই লেখা হইতেছে এবং পড় 
হইতেছে। 


ব্যক্তি বিশেষের স্থৃতি রক্ষা! করিবার উদ্দেশ্যে যদি জীবন- 
চরিত লেখা হয় তাঁহা হইলে জীবনচরিত লিখিবার কিছুমাত্র 
আবশ্যক নাই। মৃত্যুর পরেও থাকে কোনও লোকের জীবনে 
এমন কিছু থাকিলে সে লোকের জীবনচরিত না লিখিলেও 
তাহা! থাকিবে । মানবের প্রাচীন গুরুদিগের জীবনচরিত 
কেহ কখন লিখে নাই, কিন্তু তাহারা সকলেই জীবিত আছেন। 
মৃত্যুর পর যাহা থাকিবার নয় জীবনচরিতে লিখিলেও তাহা 
থাকে না। রামমোহন রায়ের জীবনচরিত লিখিত হইবার 
পূর্বেও লোকে তাঁহার নহ্বন্ধে যাহ! জানিত এখনও তাহাই 
জানে। কাল যাহা ডূবায় ভাহা ভুবিবার জিনিস, মানুষ সহস্র 
চেষ্টায় তাহ! ভাদাইয়া রাখিতে পারে না। তাহা ডুবিয়া যাওয়াই 
উচিত। কালের ন্যায় স্থন্দর চমৎকার বিচক্ষণ জীবনচরিত- 
লেখক আর নাই। অধ্যাপক ম্যাসন মিল্টনের ক্ষুদীর্ঘ জীবনী 
লিখিয়াছেন। তাহাতে মিপ্টন সম্বন্ধে কত কথাই লেখা 
হইয়াছে । কিন্ত মিল্টন সম্বন্ধে যাহা জানিবার লোকে তাহা 
অগ্রেই জানিয়া লইয়াছে। ম্যাঁনকুত জীবনী পড়িয়া অধিক 
কিছু জানিতে চায় না। এইরূপই হইয়া! থাকে এবং হওয়াই 
উচিত। 

এখন কথা হইতেছে, কোন লোক সম্বন্ধে যাহা থাকা উচিত 
তাহা কি প্রকারে থাকিলে ভাল হয়। ইউরোপ জীবনচরিত 


জীবনের কথা । ৮৫ 


লিখিয়! তাহা! রাখিবাঁর চেষ্টা করেন। কিন্তুনে জীবনচরিতে 
এত অনাবশ্তক কথ| থাকে যে সে সমস্ত পাঠ করিয়া প্রয়োজনীয় 
কথাটি জানিবার প্রবৃত্তি অতি অল্প লোকেরই হইতে পারে। 
অতএব যদি জীবনচরিত লিখিয়া প্রয়োজনীয় কথ। রাখিয়া 
দিতেই হয় তবে জীবনচরিত লিখিবার প্রণালী আমল সংশো- 
ধন করা উচিত। জন ইম্ার্ট মিলের জীব নচরিত অপরে 
লিখিলে তাহার স্বরচিত জীবনচরিত অপেক্ষা দশ পনর গু৭ 
বড় একখানা গ্রন্থ হইয়া পড়িত। সংস্কৃত সাহিত্যে জীবন- 
চরিত নাই, কিন্তু জীবনচরিতে যাহা! থাকা উচিত বোঁধ 
হয় তাহা না আছে এমন নয় । পুরাণাদিতে অনেক লোকের 
গল্প আছে। কাহারও গুরুভক্তির গল্প, কাহারও মাঁভৃ- 
ভক্তির গল্প, কাহারও সত্যনিষ্ঠার গল্প, কাহারও দানধর্শের 
গল্প, কাহারও আতশ্মনং্যমের গল্প, কাহারও আশ্রিতপালনের 
গল্প, এইরূপ নান! লোকের নান! গল্প আছে। আমার বোধ 
হয় যে সে সকল গল্প একেবারে অলীক বা! কাল্পনিক নয়। 
সে নকল গল্প কল্পনারঞ্জিত ইতিহাস বা! জীবনচরিত। ব্যক্তি 
বিশেষের যশ ঘোষণ1 করা বা রক্ষা করিবার চেষ্টা করা সে 
জীবনচরিতের উদ্দেস্ঠ নয় । সংস্কৃত সাহিত্যে যশোলাভের 
প্রয়াম নাই। এই গ্রন্থ খানা আমার লেখা, খর গ্রস্থখান! অযু- 
কের গ্রন্থ হইতে চুরি করা, নাম বাজাইবার জন্য এরূপ গণ্ডগোল 
ংস্কত সাহিত্যে নাই। সে সাহিত্যে কত গ্রন্থকারের নাম 
পাওয়াই যায় না । এক ব্যাস নামের ভিতর কত গ্রন্থকার 
আপনাদের নাম ভূবাইয়! দিয়া গিয়াছেন। তীহারা অভি 
মহাপুরুষ ছিলেন। জ্ঞান ও ধর্্বের সেবা করিয়াই তাহাদের 





৮৬ ্রিধারা। 


পরিতৃপ্তি হইত। আপনাদিগকে প্রখ্যাত করিবার ইচ্ছা 
ভীহাদের মনে উদয় হইত না। সেই জন্য তাহাদের রচিত 
পুরাণাদিতে যে সকল জীবনচরিত বা! ইতিহাস দৃষ্ট হয় ভাহা 
ব্যক্তিবিশেষের জীবনচরিত রা ইতিহাসরপে দৃ্ট হয় না। 
ব্যক্তিবিশেষ তাহাতে বিস্থৃত বা বিলুপ্ত । র্যক্তিবিশেষের 
কীত্তিই ভাহাতে ধর্কাহিনী রূপে রক্ষিত ও বিৰৃত। মান্ু- 
যের এইরূপ কীর্তিকাহিনীই ভাহার প্রকৃত জীবনচরিত বা 
ইতিহাস। এই জন্যই পুরাঁণাদিকে আমাদের শান্তে ইতিহাস 
আখ্যা দেওয়া হয়। এই প্রণালীতে জীবনচরিত লেখা অতি 
উত্তম। এই প্রণালীর জীবনচরিতে বাজে কথা থাকিতে পারে না 
এবং যে সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনাবস্তক কথায় ইউরোপীয় জীবন” 
চরিত পরিপূর্ণ থাকে তাহা! প্রবেশ লাভ করিতে পারে না। 
এ রকম জীবনচরিতে ব্যক্তিবিশেষের জীবগের কথা জাতীয় 
জীবনের কথার অংশ হইয়া পড়ে, র্যক্তিবিশেষের বিশেষত্ব 
জাতীয় বিশেষত্বে রিলীন হইয়া যায়। অতএব এ প্রণালীতে 
জীবনচরিত লিখিলে ইউরোশীয় প্রণালীর জীবনচরিতে লোক 
মধ্যে যে অহঙ্কার আত্মগরিমা ও আন্মাভিমানের প্রশ্রয় হইয়] 
থাকে তাহার উন্মেষ বাঁ আবির্ভাব একেবারেই অসম্ভব 
হয়। সে বড় সামান্ত লাত নয়। 

বাঙ্গাল! সাহিত্যে ইউরোপীয় প্রণালীর জীবনচরিত লিখিত 
নাহইয়া প্রকৃত হিন্দু প্রণালীর জীবনচরিত লিখিত হয় ইহা 
নিতান্ত প্রার্থনীয়। আমরা এখনও মানুষ হই নাই । আমাদের 
মানুষ হইতে এখনও বিলম্ব আছে। মানুষ ন! হইলে জীবন- 
চরিতও হইতে পারে ন| ৷ আমাদের মধো এ পর্য্যন্ত যে দুই চারি 


জীধনের কথা। | ৮৭ 





জন নরনারী মাহুষ হইয়াছেন, এখন তীহাদের জীবনচরিত 
লিখিবার কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই। তাহার এখন কালের হাতেই 
থাকুন। পরে যখন আমর! মানুষ হইব এবং আঁমাঁদের আশা, 
আকাকঙ্ষা, নীতি ও ধর্ম একটি নির্দি্ট আকার ধারণ করিয়া 
আমাদিগকে একটি নির্দিষ্ট ন্ুমহান্‌ পথে লইয়া যাইতে আরম্ত 
করিবে তখনও যদি তাহাদের কিছু থাকে তবে দেই সময় সংস্কত 
সাহিত্যের পুরাণের স্ায় বাঙ্গালা সাহিত্যেও এক পুরাণ বা 
বাঙ্গালী জাতির জাতীয় জীবনের এক ইতিহাঁদ ট্রি করিয়া 
নেই অপূর্ব পুরাণে ব! ইতিহাসে তীহাদের জীবনের কথা মিশা- 
ইয়া দেওয়া যাইবে। সে পুরাণে বা ইতিহাসে যদি তাহাদের 
জীবনের কথা মিশাইয়া দিতে পারা যায় তবে ইউরোপীয় প্রণা- 
লীতে তীহাদের জীবনচরিত এখন লিখিত না হইলেও দে কথা 
সে পুরাণে বা ইতিহাসে মিশাইয়া দিতে পারা যাইবে । আর 
যদি তখন সে পুরাণে বা ইতিহাসে সে কথা মিশাইয়া দিতে 
পার! না যায় অথবা মিশাইয়া দিবার উপযোগী না থাকে তবে 
এখন ইউরোপীয় প্রণালীতে তীহাদের শত শত জীবনচরিত 
লিখিত হইলেও সে কথা সে পুরাণে বা ইতিহাসে মিশিবে না । 
বাঙ্গালীর জীবনচরিত এখন লিখিয়া কাজ নাই। একবার 
ভাবিয়াছিলাম যে আমাদের স্বগঁয়। সাবিত্রী রানী শরৎস্ুন্দরী 
দেবীর একথানি জীবনচরিত লিখিব বা লেখাইব। কিন্ত এখন 
মনে করিতেছি যে তাহা করিয়া কাজ নাই। বাঙ্গালী যদি মান্য 
হয় তবে ব্যাদরচিত পুবাণের ন্যায় বাঙ্গালীর রচিত পুরাণেও 
এক নাবিত্রীর কথা থাকিবে । কাল ভাল জিনিস ন্ট করে না। 





তৃতীয় ধার! । 





সিদ্ধিদাতা গণেশ। 


১ 
উদ্ধব ঘোষ চাষ করিয়া থায়। প্রত্যহ প্রত্যুষে হল কাধে 
করিরা এক যোড়া হেলে গরু লইয়া ক্ষেতে যায়। যাইবার 
সময় একবার তারাাদ সরকার মহাশয়ের বাড়ীর দিকে যায়। 
লরকার মহাশয় পরাতে আপন বহিবটীর বাহিরের রোয়াকে 
বসিয়া তামাকু সেবা! করেন। উদ্ধব দূর হইতে তাহাকে একটি 
নমস্কার করিয়া মাঠে যায়। উদ্ধবের বিশ্বাস যে, পরাতে সরকার 
মহাশয়কে দেখিয়! ক্ষেতে গেলে চাঁষে ফল ভাল হয়। 
২ 
অলকান্ন্দরী আঁজ ছয় বৎসরের পর হাসিতেছে। পতি- 
ব্রতার পতি ছয় বত্নর গৃহে ছিল না। কর্ট্োোপলক্ষে প্রবানে 
ছিল। যথেষ্ট ধন সঞ্চয় করিয়া! পতি আজ বাড়ীতে আসি- 
য়াছে। আহ্নাদের কীদাকাঁটার পর অলকাস্ুন্দরী পতিকে 
হাধিতে হাসিতে বলিল-_তুমি আজ আপিবে তা আমি জানি। 
পতি জিজ্ঞীন। করিল--কেমন করিয়া জানিলে? আমি ত পত্র 
লিখি নাই। পতিব্রতা উত্তর করিল--আজ সকালে ঘাটে 
বাসন মাজিতে গিয়। সর্বাগ্রে কমল পিসীর মুখ দেখিয়াছিলাম ! 
দেখিবামাত্র মনে হইয়াছিল, আমার ছয় বৎসরের ছুংখ আজ 
ঘুচিবে। 
৯১ 
ইত্যাদি। 
এইরূপ এদেশে কি স্ত্রী কি পুরুষ প্রায় সকলেরই বিশ্বাস যে, 
কাহারো কাহারে! মুখ দেখিয়া দিবসের কার্য আরম্ভ করিলে 


৯২ ত্রিধারা 








সে দিবসটাই সুখে কাটে এবং বে দিবসের কাঁধ্যও সফল হয়। 
এ বিশ্বাস যুক্তিমূলক কি না, এন্থলে বিচার করিবার আবশ্তাক 
নাই। এখানে একটি কথার উল্লেখ করিলেই চলিবে । যাহা- 
দের দর্শন লোকে ন্ুফলপ্রদ বলিয়া বিশ্বাস করে, তাহাদিগকে 
গ্রকৃত পক্ষে ধীর ও শান্তম্বভাব বিশিষ্ট দেখা যায়। অন্তত এমন 
কথা বলা যাইতে পারে য়ে, যাহাদ্দিগকে দেখা লোকে মঙ্গলকর 
বলিয়া! বুঝিয়া থ:কে, তাহাদের আকারে উগ্রতা, ওদ্বত্য বা 
চপলতা লক্ষিত হয় না। ধীরতা, সংযম ও শাস্তি যাহার মৃক্তিতে 
ব্যক্ত, সে স্ত্রী হউক বা পুরুষ হউক, লোকে কেবল তাহারই দর্শ- 
নের ঘহিত সিদ্ধির প্রত্যাশা নংযুক্ত করিয়া থাকে । 

লোকের যেরূপ বিশ্বাস, পৌরাণিক পঞডতের শিক্ষাও সেই 
রূপ। সে শিক্ষা মিদ্ধিদাতা গণেশের মৃত্তিতে পরিস্কট। গণেশ- 
মুক্ত চঞ্চলতা, চপলতাঁ, উগ্রতা, ওদ্ধত্য, ব্যগ্রতা, হঠকারিতা বা 
অস্থিরতার মুদ্তি নয়। সে মু্তি হ্ৈধ্য, ধৈর্য্য, গাভীধ্য, সংযম, 
সতর্কতা ও চিন্তাশীলতার মৃত্তি। গণেশকে দেখিলে চালাক চট. 
পটে বা ব্যন্তত্রন্ত বলিয়া মনে হয় না। আজ কাল লোকে 
সচরাচর যে দকল গুণ কার্ধ্যপিদ্ধির নিমিত্ত আবশ্যক মনে করে, 
গণেশমৃন্তিতে সে সকল গুণ ব্যক্ত নয়। আজিকার ইউরোপে 
এবং ইউরোপের দেখাদেখি আজিকার নব্য বঙ্গে লোকের এই- 
রূপ ধারণা যে, হুটাপুটি লাফালাফি দৌড়াদৌড়ি তাড়াতাড়ি 
হুড়াহুড়ি চালাকি ব্যতীত কার্ধ্যে সিদ্ধিলাত অসম্ভব । কিন্ত 
সে রকম কোনও ভাবই গণেশের মৃক্তিতে লক্ষিত হয় না! গণে- 
শের মুদ্িতে সেরকম ভাবের বিপরীত ভাবই অভিব্যক্ত । এখন 
কথা। হইতেছে__ গণেশ সত্য ন। মিথ্যা । কার্ধ্যসিদ্ধির জন্য 


মিদ্ধিদাতা গণেশ । ৯৩ 


ব্যস্ততা চঞ্চলত৷ প্রভৃতি গুণ আবশ্যক, না ধীরতা গাভীর 
প্রভৃতি গুণ আবশ্যক? এ কথার সম্যক উত্তর এই যে,ছুই ই 
আবশ্যক; কিন্তু ধীরতা সংযম গাভীর্ষ্য প্রভৃতি শুণই বেশী 
আবশ্যক । কোনও কাঁধ্য করিতে হইলে অনেক দিক, অনেক 
বাধাবিত্ব, অনেক সুবিধা অস্্রবিধা, অনেক অগ্রপশ্চাৎ, অনেক 
ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান, অনেক ওজরআঁপত্তি, ইত্যাদি উত্তম- 
রূপে ধীরভাবে সাবধানে স্থ্গভীর প্রণালীতে বিবেচন! করিয়! 
দেখিতে হয়। এই প্রকারে সকল রকম বিবেচনা করিয়! স্থির 
করিতে হয়, কাঁধ্য কর! উচিত কি না। শুদ্ধ একটা ক্ষণিক 
মানসিক আবেগে কার্ধ্য আরম্ত করা অকর্তব্য। সকল দিক 
বিবেচনা ন! করিয়া, কেবল ভাঁব বাঁ আবেগের বশবস্তাঁ হইয়া, 
অথবা একট| মতের খাঁতিরে কার্ধ্য করিলে ফল প্রায়ই শোঁচ- 
নীয় হয়। আবার কার্ষ্যের প্রারস্ত হইতে শেষ পধ্যস্ত কার্য্যের 
অনেক বাঁধাবিদ্র উপস্থিত হইতে পারে। কার্ধ্য করিতে করিতে 
সে সকল বাঁধাবিদ্বও ধীর ও গভীর ভাবে বুঝিয়া দেখিতে 
হয়। নহিলে আরন্ধ কাঁ্য নিক্ষল হয়। অর্থাৎ কাঁধ্যসিদ্ধির 
জন্য বিচার বিবেচন! ও মন্ত্রণা প্রথম হইতে শেষ পর্যাস্ত আব- 
শ্যক। সে বিচার বিবেচন। বা মন্ত্রণায় ক্রটি হইলে অপরিমিত 
উৎসাহ উদ্যম ক্ষিপ্রকারিতা ইত্যাদি থাকিলেও কার্যে সিদ্ধি- 
নাভ হয় না। একটি উদাহরণ দি। যুদ্ধক্ষেত্রে উদ্যম উগ্রতা 
চঞ্চলত! প্রভৃতি গুণ কাঁ্ধযসিদ্ধির জন্য যত আবশ্যক বলিয়! মনে 
হয়, স্থর্ধ্য ধৈর্য্য গাভভীধ্য প্রভৃতি ভত হয় না। কিন্তু প্রকৃত 
পক্ষে রণস্থলেও প্রথমোক্ত গুণগুলি অপেক্ষা শেষোক্ত গুণগুলি 
জয় লাভের জন্য বেশী আবশ্যক । ওয়াটার যুদ্ধে ওয়েলিং- 


৯৪ ত্রিধারা। 


টনের উদ্দাম, উগ্রতা ও উৎসাহ নেপোলিয়নের অপেক্ষা কম 
ছিল। নেপোলিয়নের ধৈর্য্য ও চিত্তস্ট্র্যে ওয়েলিংটনের 
অপেক্ষা! কম ছিল। অসংখ্য ইংরাজ সেনার বিনাশ দেখিয়াও 
ওয়েলিংটন ব্লকরের আগমন পর্য্স্ত স্থির ধীর অবিচলিত ভাবে 
অপেক্ষা করিয়াছিলেন । নেগোঁলিয়ন দুরে তোপধ্বনি হইতে 
শুনিয়! চিত্বন্থর্যা হারাইয়া আপন পক্ষের সেনানায়ক মার্শল 
গ্রজে আসিতেছে ভাবিয়া বীর বিক্রমে আপন সেনা রণস্থলে 
পরিচালনা! করিয়া শীঘ্রই পরাজিত হইয়াছিলেন। কার্য্যের 
মহা উদ্যম উৎসাহ ও ব্যস্ততার ভিতরেও অবিচলিত বুদ্ধি, স্থির 
চিত্ত, সম্পূর্ণ আস্মসং্যম এবং গভীর চিন্তাশীলতা আবশ্যক । 
নহিলে কার্যে সিদ্ধিলাভ অসম্ভব । এই জন্যই সিদ্ধিদাঁতী গণে- 
শের মূর্তি উগ্রতা চঞ্চলতা বা ব্যন্তভাবাঞ্ক নয়, স্টৈ্য ধৈর্য্য 
সংযম শাস্তি গাভীধ্য ও চিত্তাশীলতাব্যঞ্জক। কার্য্যসিদ্ধির 
হিসাবে গণেশমৃর্তিই প্রকৃত মূর্ত__গণেশমূর্তিই প্রকৃত সত্য । 
আজিকার দিনে এই সত্যটি আমাদের “মরণ করা আব- 
শ্তক হইয়া উঠিয়াছে। সকল সময়েই মানুষের এই সত্যটি 
ম্মরণ করা আবশ্ঠক, কেন না মানুষ সকল সময়েই কেবল 
মাত্র মানসিক আবেগের বা অশুদ্ধ সংস্কারের স্বল্লাধিক 
বশবর্তাঁ হইয়া কার্ধা করিয়া! খাকে। কিন্তু আজ কাল আমরা 
কিছু বেশী আবেগবাঁন ও হঠকারী হইয়া, সকল দিক না দেখিয়া 
না বুঝিয়া, কার্ধ্য করিয়া থাকি । কালেজ ছাড়িয়াই আমরা পালে 
পালে আদালতে ওকালতি করিতে যাই । ওকালতি করিতে যে 
সকল গণ আবশ্তক তাহা আছে কিনা, ওকালতি করিতে 
যে অর্থ বা সহায়তা আবশ্তক তাহা আয়ত্তাধীন কি না, 


মিদ্ধিদাতা গণেশ । ৃ ৯৫ 


ইত্যাদি নানী কথার মধ্যে কোনও কথাই বিবেচনা না করিয়া 
আমরা দলে দলে উকিন হইতে যাই। ঠিক এই প্রকারেই 
আমরা দলে দলে ডাক্তার হইতে যাই। ঠিক এই প্রকারেই 
আমরা ঝণীকে ঝাঁকে চাকুরির উমেদার হই। ঠিক এই 
প্রকারেই আমর! পালে পালে মুন্্রাযস্ত্রের আশ্রয় লইয়া গ্রন্থকার 
হইয়া উঠি। ইংরাজি শিখিয়া আমরা আমাদের দেশের সকল 
জিনিসই ঘ্বণার চক্ষে দেখি। তাই কোনও দিক না দেখিয়া 
ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান কিছুই না! বুঝিয়া এক একটা ভাবের বা 
অপরিপক সুংস্কারের তাড়নায় আমর! উন্মত্ের ন্যায় গৃহসংক্কার, 
সমাজনংক্কার, ধর্শসংস্কার প্রভৃতি আকাশ পাতাল সংস্কার 
করিতে যাই। কোনও সংস্কারই করিতে পারি না। বরং 
একটা দোষ সংস্কার কয়িতে গিয়া দশটা দোষ কটি করিয়া! বসি । 
রোগীর রোগের চিকিৎসা করিতে গিয়া আমরা আধ মিনিটের 
মধ্যে রোগের পরীক্ষা! শেষ করিয়া এমনি ওষধাদি ব্যবস্থা করি 
যে আধ ঘণ্টার মধ্যেই স্বয়ং রোগীরও শেষ হইয়া যায়। এইরূপ 
সকল কাধ্যেই আমর! মনে করি ধে, ভাঁড়াতাড়ি ভুড়াছুড়ি লক্ষ 
বম্প করিলেই খুব কাজ করা হয়। তাই যেমন আমাদের মনে 
একটা খেয়াল উঠে অমনি আমরা তদনুসারে কার্ধ্য করিতে 
যাই। তাই আমরা কোন কার্য্যেই দিদ্ধি লাভ করিতে .পারি 
না। 

অতএব এই হঠকারিতা ও আবেগাছবপ্তিতার দিনে সিদ্ধি- 
দাতা গণেশের কথা ম্মরণ কর! বড় আবশ্তক। গণেশের সেই 
স্থির ধীর গম্ভীর শান্ত সংযত চিন্তাশীল মৃত্তি চিত্তে অঙ্কিত করিয়া 
নকল কার্য স্থির ধীর গভীর শাস্ত সংযত ও চিন্তাশীল প্রণীলীতে 





৯৬ ত্রিধারা 


না করিলে আমাদের বিশৃঙ্খলত! দিন দিন বাড়িয়া যাইবে এবং 
আমরা ঘরে বাহিরে সকল প্রকার ছুখ কই ও লাহ্নার ভাগী 
হইব। অতএব আমাদের মকলেরই তক্তিভাবে সেই দিদ্ধিদাতা 
গণেশমূন্তি চিত্তে প্রতিঠিত কর! কর্তব্য। গণেশ মৃষ্ি বরন্মাও- 
গতিরই এক বিন্ময়কর মৃত্তি। জলে স্থলে মহাশূন্যে যখন তুমুল 
ঝটিক| বহিতে থাকে--আকাঁশে বজের ঝন্ঝনা, জলে তর্ক 
গর্জন, জলে স্থলে আকাশে পঞ্চভৃতের প্রলয়াক্ষানন--তখনও 
জন স্থল বাু বহ্ছি ব্যোম সকলেরই সকল নিয়মগুলি মমপূর্ণ 
ম্মতম প্রণালীতে প্রতিপালিত হয়, কাহারো কোন নিয়মের 
কণামাত্রও ব্যর্থ বা! বিপর্যস্ত হয় না। ইহাই ব্রহ্মাগপতির 
বিশ্ময়কর গণেশমূণ্ত। মে মৃদ্তি দেখিবার জন্য বিশ্বপটের অন্তরালে 
যাইতে হয়। কার্্যদিদ্ধির কারণ বুঝিতে হইলেও কার্যযক্ষেত্রের 
অন্তরালে ঢুকিতে হয়। 





বাঙ্গালির প্রক্ূত কাজ। 





মুকুন্দ ঘোঁষ খুব বড় ঘরের ছেলে । বহুপূর্বে তাহার পূর্বব- 
পুরুষেরা খুব মান্ত গন্য ধনাঢ্য ও প্রতাপশালী ছিল। কিন্তু 
ইদানীং পাচ সাত পুরুষ বড় অবদন্ন হইয়া পড়িয়াছে। তালুক 
মুলুক যাহা ছিল সব গিয়াঁছে। ক্রমে বাগ্বাগিচা নাখেরাজ জোঁত 
জমাও বিক্রয় হইয়াছে। ভদ্রাসনটুকুও কয়েক বৎসর নাই। 
মুকুন্দের! একথানি ছোটি খড় ঘরে থাঁকে। সে ঘরের চালেও 
আবার খড় নাই। চাঁলখানা স্থানে স্থানে গকন! পাতা ঢাঁকা। 
মুকুন্দের ম! ভাই বোন প্রভৃতি পাচ ছয়টি পরিবার । তাহাদের 
দুবেলা অন্ন জুটে না। প্রায়ই ভিক্ষার উপর নির্ভর । কাহারো! 
গরিধানের রীতিমত বন্ত্র নাই, সকলেই ছেড়া নেকড়া কোন 
রকমে গুছাইয়া পরিয়া লজ্জা রক্ষা করে। ১১২ বৎসরের 
ভাই ছুটে! ত ন্যাংটোই বেড়াইয়া বেড়ায়। মাসে ছুই চারি 
আনা পয়সা হইলে তাহার! গ্রামস্থ পাঠশালায় ছুই অক্ষর 
শিথিতে পারে, তাহাও জুটে না, দিবারাত্রি ছো হো করিয়াই 
বেড়ায়। মুকুন্দের এক বৎসরের একটি ছোট তাই ছুধ খেতে 
পায় না। যৎসামান্য স্তন্তপান করিয়া পেটের জালায় দিবা” 
রাত্রি কাদিয়! কীদিয়াই কাটায়। এইত গেল মুকুন্দের ঘরের 
অবস্থা, কিন্ত মুকুন্দ কলিকাতায় উন্নতি-বিধায়িনী সতার সভ্য 
হইয়া কেবল বড় বড় বক্ততা করে। 

ব্রিটিশ পার্লেমেন্টে বাঙ্গালি মেশ্বর হওয়াও কি ঠিক্‌ সেইরূপ 
নয়? বাঙ্গালি জাতি অতি অধম, অতি দরিদ্র, অতি অনার । 

৯ 


৯৮ ভ্রিধারা ৷ 





বাঙ্গালির ঘরে অন্ন নাই। যা এক আধ মুঠা আছে তাহা 
কেবল পরে অনুগ্রহ করিয়া লয় ন! বলিয়া আছে, নতুবা তাহাও 
থাকিবার কথা নয়। বাঙ্গালির পরিধানের বজ্র নাই। যত- 
জণ নী পরে একথানি বস্ত্র আনিয়! দিবে ততক্ষণ লজ্জ1! রক্ষা 
হওয়া ভার। একদিন বাঙ্গালি সমস্ত জগতকে কাপড় পরা- 
ইয়াছে। আজ বাঙ্গালি এতটুকু স্তর জন্যও পরের মুখা- 
পেক্ষী। বাঙ্গালির বিদ্যা নাই, বাঙ্গালি মূর্থ। বাঙ্গালির 
সাহিত্য সবে স্থুরু হইয়াছে । সে সাহিত্যের শি নাই, বিস্তার 
নাই, প্রকৃত সারবা! নাই, প্রন্কত সৌন্দর্ধ্য নাই, তেজ নাই, 
প্রতাপ নাই, মহিম! নাই। বাঙ্গালির দেহ দুর্বল, মনও ছুর্ববল। 
বাঙ্গালির শৌরধ্য নাই, বীর্ধ্য নাই, দাহস নাই, শক্তি নাই, 
অধ্যবসায় নাই, উৎপাহ নাই, আশা! নাই, আকাঙ্ষা নাই। 
যাহা থাকিলে মানুষ মানুষ হর বাজালির তাহা নাই 3 যাঁহা 
থাকিলে জাতি জাতি হয়, বাঙ্গালি জ্বাতির তাহা নাই। তবে 
কেন বাঙ্গালি ব্রিটিশ পার্লেমেন্টে বসিতে চায়? বাঙ্গালির যাহ! 
নাই বলিয়। বাঙ্গালি মানুষ নয় ব্রিটিশ পার্লেমেন্টে বসিলে 
বাঙ্গালি কি তাহা পাইবে? বাঙ্গালির যাহা নাই বলিয়' বাঙ্গালি 
জাতি জাঁতি নয় বাঙ্গালি কি তাহা পাইবে? তবে কেন বাঙ্গালি 
ব্রিটিশ পার্লেমেন্টে বসিতে চায়? গরিবের ছেলে মুকুন্দের উন্নতি 
বিধার়িনী সভার সভ্য হওয়াও যা বাঙ্গালির ব্রিটিশ পার্লেমেন্টের 
মেস্বর হওয়াও কি তাই নয়? ঘরে এত কাজ থাকিতে, আপ- 
নাকে মানুষ করিবার এত বাকি থাকিতে, আপনাদিগকে জাতি 
করিয়া তুলিবার এত বাকি থাকিতে, ব্রিটিশ পার্লেমেন্টের মেস্বর 
হুগয়৷ কেন? মানুষকে মানুষ করিতে কত শক্তি, কত সামর্থ্য, 


বাঙ্গালির শ্রক্নত কাজ 


কত পরিশ্রম, কত যত্ব, কত একাগ্রতা, কত স্থিরলক্ষ্য লাগে বল 
দেখি? এত শক্তি সামর্থ্য প্রভৃতি প্রয়োগ করিলেও মানুষকে 
মানুষ করিতে কত পুরুষ লার্গে বল দেঁখি ? আমাদের শক্তি 
সামর্ধ্যের কি এতই বাহুল্য হইয়াছে যে আমাদের ঘরের কাজ 
করিয়াও বাহিরের কাজের জন্য এত উদ্ধৃত্ত থাকে ? তবে কেন 
ব্রিটিশ পার্লেমেন্টের মেম্বর হওয়া বল দেখি? ব্রিটিশ পার্লে- 
মেন্টের মেস্বর হইতেও কিছু শক্তির প্রয়োজন স্বীকার করি। 
কিন্তু ষখন আমরা এখনও মান্যই হই নাই, জাতিই হই নাই, 
তখন যদি আমাদের কিছু শক্তি থাকে তবে সে শক্তিটুকু আপনা- 
দিগকে মানুষ করিবার কাজে ব্যয় ন! করিয়। ব্রিটিশ পার্পে- 
মেন্টের মেম্বর হওয়] প্রভৃতি মিছে কাজে ব্যয় কর! কি বিজ্ঞের 
ফাঁজ না দেশহিতৈষীর কাজ ? আমর! মাঙ্গষ হই নাই, ইহা না 
ধুবিবার দরুনই আমর! ব্রিটিশ পালেমেন্টের মেম্বর হইতে 
চাই। আমাদের ঘরের অবস্থা কি শোচনীয়, আমাদের মানুষ 
হইতে কতই বাকি, ইহাও আমরা বুঝি নাই--ইহা কি বিষম 
কথা ! বাঙ্গালি ব্রিটিশ পালেমেন্টের মেশ্বর হইতে যাওয়াতেই 
ত এই বিষম কথাটা এত বিকট ভাবে মনে উদয় হইল। 

ব্রিটিশ পালেমেন্ট ইংরাজ জাতির জাতিত্বের অভিব্যক্তি । 
যে সকল শক্তির গণে ইংরাজ ইংরাজ, যে সকল শক্তি সহশ্রা- 
ধিক বৎসর ধরিয়। সহস্র রকমে ইংরাজকে ভাঙ্গিয়া চরিয়া 
গড়িয়া তুলিয়াছে, আজিকার ব্রিটিশ পালেমেন্ট সেই সমস্ত 
শক্তির অভিব্যক্তি বা অধিষ্ঠানস্থল। সে শক্তি বাঙ্কালিতে 
মাই, বাঙ্গালি দে শক্তিতে গঠিত হয় নাই। তবে ব্রিটিশ 
পালে 'মেন্টে বাঙ্গালির স্থান কোথায় ? বাঙ্গালিতে যে প্রকার 


৯১০০ ত্রিধারা । 


৯০ 


শক্তি এবং যে সামান্য একটু শক্তি আছে, তাহা ব্রিটিশ পালে? 
মে্টস্থিত শক্তির সহিত মিশ. খাইবেই বা কেমন করিয়া, পারিয়! 
উঠিবেই বা কেমন করিয়া? কোরিন্থিয় প্রণালীতে নির্টিত 
যে গৃহ, তাহাতে গথিক প্রণালীতে নির্শিত যে. স্তম তাহা 
কেমন করিয়া খাটিবে? ইংরাজের শক্তিতে ইংরাজের পালে? 
মেন্ট গঠিত। অতএব দে পালেনমেন্ট ইংরাজকেই বুঝে, ইংরা- 
জের আশা এবং আকাঁজ্ষাই মিটাইতে পারে। ভারতকে সে 
পার্লেমেন্ট বুঝে না, বুঝিতে পারে না এবং পারিবেও না। সে 
পালেমেন্ট কেমন করিয়া ভারতের আশা এবং আকাঙ্ষা 
মিটাইবে? সেই জন্যইত ব্রাইট ফসেটের স্তায় সে পালে“মেন্টের 
মহা প্রতাপশালী ইংরাজ সভ্যেরাঁও ভারতের কিছুই করিয়া উঠিতে 
পারেন না? বে ক্ষুপ্র বাঙ্গালি মে পালেমেন্টে গিয়া ভারতের 
জন্ত কি করিবে? বাঙ্গালি ব্রিটিশ পালে মেন্টের ধাত্‌ বুঝে না 
বলিয়া সে পালেমেন্টে প্রবেশ করিবার জন্য এত ব্যাকুল। সে 
ব্যাকুলতা আমাদের অপারতার প্রমাণ মাত্র ! 

আর একটু ভাল করিয়া বিবেচন! করিয়া দেখিলে বুঝিতে 
পারা যাইবে যে বাঙ্গালি ব্রিটিশ পালে মেন্টের মেম্বর হইলে 
বাঙ্গালির মান বৃদ্ধি হইবে না, ইংরাঁজেরই মান বৃদ্ধি হইবে। 
পার্লেমেন্টের মেশ্বর হইতে গেলে যে বিশেষ ক্ষমতার প্রয়োজন 
তাহাও বোধ হয় না। একটু বুদ্ধি এবং একটু বাঁকশক্তি থাকি- 
লেই পার্লেমেন্টে প্রতিপত্তি লাভ করা যায়। কিন্তু সেরূপ 
একটু ক্ষমতা থাকিলে মানুষ যে বিশেষ সম্মানার্থ হয় তা নয়। 
তবে বাঙ্গালি পার্লেমেন্টের মেশ্বর হইলে যাহার] প্রকৃত মান্য 
তাহাদের কাছে কিসে যে সম্মানার্থ হইবে বুঝিতে গার! যায় 





বর্শভেদ ও জাতীয় চরিত্র । ১০১ 


না।. ফলতঃ বাঙ্গালি পার্লেমেন্টের মেশ্বর হইলে বাঙ্গালির মান 
বাড়িবে নী, ইংরাজেরই মান বাঁড়িবে। বিজিতকে আপনার 
সর্বোচ্চ অদীম-মহিমা-মণ্ডিত শ্বাধীন-শক্তি-সম্পন্ন শাসন সমিতিতে 
বদিতে দিলে প্রক্কৃত মানুষের কাছে ইংরাজেরই মান বাঁড়িবে, 
বাক্ষালির মান বাড়িবে না। তবে সে সমিত্তিতে বসিবার 
জন্য বাঙ্গালি এত ব্যাকুল কেন? বাঙ্গালির ছুবু'দ্ধি কি ঘুচিবে 
মা? বাঙ্গালির স্থদিনের হুত্রপাত কি হইবে না? 








বর্ণভেদ ও জাতীয় চরিত্র। 





মোটা কথায় বলা যায় যে ইংরাজি মভ্যতা বহিমুখ আর 
হিন্দু-সত্যতা অন্তমুখ, ইংরাজি সভ্যতা ধনচর্য্যায় আর হিন্দু- 
নভ্যতা ধর্শচর্ধাক়। অর্থাৎ ধন প্রভৃতি বাহসম্পদ লইয়া 
ইংরাঞ্জি সভ্যতা এবং তাহার উন্নতিতে ইংরাজি সভ্যতার 
উন্নতি, আর ধর্থব লইয়া হিন্দু সত্যতা এবং তাহার উন্নতিতে 
হিন্দু সভ্যতার উন্নতি। কিন্তু ইংরাজি সভ্যতা বহিমু্খ বা 
বাহ-সম্পদ-মূলক হইলেও তাহা যে একেবারে ধর্শশূন্ এমন 
কথা বলা যায় না। ইংরাজের খুব ধনসম্পদ আছে মত্য, 
কিন্ত ইংরাজের ধর্শশান্ও আছে, ধর্মশিক্ষাও আছে, ধর্ম 
মন্দিরও আছে, ধর্শ্যাজকও আছে। ইংরাজের বৈষয়িক ভাব 
ও বিবয়াসক্তি প্রবল হইলেও তাহাদের অসীম মানসিক শক্তিও 
আছে। ইদানীত্তন কালে হব্ন্‌, হিউম, লক, বর্কলি, মিল ৰ! 


১০২ .. ত্রিধারা । 





হ্বর্ট স্পেন্দেরের অপেক্ষা মানিক শক্তি সম্পন্ন মস্থাপুরুষ কোন 
দেশে যে বড় বেশি জন্মিয়াছেন তাহা বোধ হয় না। ইংরা- 
জের মধ্যে অপূর্ব ধর্মভাবও আছে। যতদূর জানিয়াছি 
তাহাতে বোধ হয় যে ইংরাজের মধ্যে যথার্থই খবিতুল্য মানু 
আছেন-_অস্তরে সদাই ঈশ্বরচিন্তা, বাহিরে দাই সদাচার সদাই 
গরোপকার, প্রেমিক, অমায়িক, নসর, নিবিকার, শাস্ত, শুদ্ধা- 
চারী। তথাপি ইংরাজি সভ্যতা! বহিমু্খ, ইংরাজের ধনচর্যযাই 
বেশি, ধর্শচর্য্যাা কম। এত দার্শনিক, এত ধর্মযাজক, এত 
ধর্মমন্দির খ্ষ্ীয় ধর্মনীতির ন্যায় এমন সুন্দর ধর্্মনীতি থাকি- 
তেও ইংরাজ প্রধানত পৃথিবী লইয়াই ব্যস্ত, ইংরাঁজের ধর্মচর্যযা 
তত বেশি নয়। ইংলণে ধীহারা ধর্মভাব ও মানসিক শক্তি 
সম্পন্ন তাঁহাদের ধর্মভীব এবং মানসিক শক্তি বড়ই বেশি এবং 
উচ্চদরের | কিন্তু তাহাদের সংখ্যা বড় বেশি নয় এবং তাহারা 
প্রায়ই কিছু উচ্চ শ্রেণীর লোক। ইংলগের লোক-সাধারণ 
এবং নিম্শ্রেণীর লোক বড়ই বুদ্ধিহীন, ধর্মহীন ও ছুরাচার । 
ভাল ভাল ইংরাঁজ-লেখকেরাই একথা বলিয়া থাকেন, এবং 
সম্প্রতি একজন কৃতবিদ্য বাঙ্গালি ইংলও দেখিয়া এইরূপ 
লিখিয়াছেন-_ 

«ইতর শ্রেণীর লোকের অক্ষর পরিচয় আছে। সাধারণ 
সংবাদপত্রও গড়ে । কিন্তু তাহাদিগের স্তাঁয় নীচ ও ভয়ানক 
প্রকৃতির লোক মন্ুষ্যশ্রেণর মধ্যে নাই। ইহাঁদিগকে ঘিপদ 
পণ্ড বলিলেও হয়। ধর্ম যেকাহাকে বলে, ইহার] তাহা জানে 
না। সেন্টজাইল্‌সে ইহাদিগের ভ্রীপুরুষগণকে সন্ধ্যাকালে 
দেখিয়। আমিয়াছি। তাহারা মদ্যপান করিয়া কলহ চীৎকার 


বর্ণভেদ ও জাতীয় চরিত্র । . ১০৩ 





করত পথিকগণের ভয় উৎপাদন করিয়া থাকে । এখানে 
পথিকগণের নির্ধিস্বে ভ্রমণের সাধ্য নাই। তাহাদিগকে পুলি- 
শের শামনের ক্ষমতা নাই। এই সকল মন্গুয্যর আকার 
অতি ভয়ানক। পৃথিবীর অন্য কোন স্থানে এতাদৃশ ইভর 
শ্রেণর লোকের উৎপাত নাই । এই সকল লোকে ভারতবর্ষায়- 
দিগের প্রতি অসভ্যতা প্রকাশ করে। কথন '্র্যাকি' বলে, 
কখন বা তাহাদের সেই বানর অপেক্ষা কুৎসিৎ মুখ বিকৃত 
করিয়া দেখায় । এরূপ মনুষ্যনামধারী পশু আর কুত্রাপি 
দেখা যায় না।” *%* 
ইহার অপেক্ষাও ভীষণ বর্ণন| ইংরাজ-লেখকদিগের সংবাদ 
পত্রে ও থরন্থে দেখিতে পাওয়া যায়। ফলতঃ ইংলগের নিষ্ন- 
শ্রেণীর ন্যায় এককালে পশুবৎ ও রাক্ষদবৎ মানুষ পৃথিবীর 
সভ্যদেশের মধ্যে আর কোথাঁও আছে কি না শন্দেহ। 
ইংরাজের ন্যায় হিন্দুদিগের বাহসম্পদ নাই, ব্যবধায়বাণিজ্য, 
কারবারকারখানা, রেলরোড টেলিগ্রাফ প্রভৃতি নাই। কিন্ত 
ইংরাজের অপেক্ষা হিন্দুর ধর্শজ্ান ও চরিত্রোৎকর্ষ আছে। 
এ কথাটি একটু বিশেষ অর্থে বুঝিতে হইবে । ইংলগ্ডর শিক্ষিত 
এবং শ্রেষ্ঠ শ্রেণীর লোকের ধর্পজ্ঞান এবং চরিত্রোৎকর্ষ আছে, 
কিন্ত অশিক্ষিত ও নিম্শ্রেণীর লোক নিতান্তই ধর্মহীন ও অদ- 
চ্চরিত্র। হিন্দুর মধ্যে, কি শিক্ষিত এবং শ্রেষ্টশ্রেণর লোক, কি 
অশিক্ষিত এবং নিম্নশ্রেণীর লোক, সকলেরই ধর্ধজ্ঞান, ধর্মমর্য্যা 
এবং চরিত্রোৎকর্ধ আছে। উচ্চশ্রেধীর হিন্দুর যত ধর্শচর্য্যা ও 
" * নব্যভারত তৃতীয় থও, নবম সংখ্যা_“বাঙ্গালির ইউরোপ দর্শন” 
লাক প্রবন্ধ। অনাবশ্যক বলিয়া কিছু কিছু বাদ দিয়। উদ্ধৃত করিলাম। 


১৭৪ ত্রিধার!। 


চরিত্রোৎকর্ধ আছে, নিম্শ্রেণীর হিন্দুর তত নাই নত্য, তত 
থাকাও লম্ভব নয় | ধর্শচর্যয] অর্থ ও অবসর সাপেক্ষ । নিষ্্- 
শ্রেণীর লোকের দে ছুইয়েরই অভাব। অতএব উচ্চশ্রেণীর হিন্দুর 
যত, নিম্শ্রেণীর হিন্দুর তত ধর্শচরধ্যা বা চরিত্রোথকর্ষ নাই। না! 
থাকিলেও একথা ঠিক যে, নিয়শ্রেণীর ইংরাজের অপেক্ষা নিষ্- 
শ্রেণীর হিন্দুর ধর্শজ্ঞান ধর্ণচর্যযা এবং চরিত্রোৎকর্ষ অনেকগুণ 
বেশি এবং একথাও ঠিক যে ধর্মজ্ঞান ধর্শচর্ঘ্য] এবং চরিত্রোৎকর্ষ 
সম্বন্ধে উচ্চশ্রেণীর হিন্দু ও নিম্শ্রেণীর হিন্দুর মধ্যে যত সৌসাঘৃস্ত 
ও সমত্ব আছে, উচ্চশ্রেণীর ইংরাঁজ এবং নিম্শ্রেণীর ইংরাজের 
মধ্যে তাহার এক শতাঁংশও নাই। ধর্ম এবং চরিত্র মন্বন্ধে 
উচ্চশ্রেণীর ইংরেজ এবং নিয্নশ্রেণীর ইংরাজ, দুইটি অতি ভিন্ন 
জাতীয় লোক, সত্যতার দুইটি অতি বিসৃশ স্তরের লোক, এমন 
কথা৷ বলিলে অতুযুক্তি বা অযথ1 উক্তি হয় না। ইংরাজ- 
জাতির শ্রেণী সকলের মধ্যে ধর্শচর্ধ্য1 ও চরিত্র সম্বন্ধে বড়ই 
পার্থক্য, বড়ই বিসদৃশ্তয, বড়ই [096৩:০০০১0165 দুষ্ট হয়। উচ্চ 
শ্রেণীর হিন্দু ও নিয় শ্রেণীর হিন্দুর মধ্যে ধর্শচর্য্যা ও চরিত্র সম্বন্ধে 
শিক্ষা ও অবস্থার বিভিন্নতা বশতঃ বতটুকু পার্থক্য বা! বিভিন্ন! 
ঘটিতে পারে তদ্দপেক্ষা,বেশি পার্থক্য বা! বিভিন্নতা নাই । এবিষয়ে 
উচ্চ শ্রেণীর হিন্দু ও নিয় শ্রেণীর হিন্দু এক-জাতীয় এবং সভ্যতার 
একই স্তরের লোক । সকল শ্রেণীর হিন্দুর মধ্যে ধর্মচর্যয] ধর্ম- 
জ্ঞান ও চরিত্র সম্বন্ধে এঁক্য বড়ই বেশি, সৌসাধৃশ্ত বড়ই বেশি, 
17010020109165 বড়ই বেশি, বড়ই অপূর্ব । ইংলগের শিক্ষিত 
ও উচ্চ শ্রেণীর লোকে খৃষ্টীয় ধর্টের কথা৷ বেশ ভাল রকম জানে, 
কিন্তু নিম্ন শ্রেণীর লোকে যীতু থুষ্টের নাম পর্য্যন্ত জানে না। 


ধর্ণতেদ ও জাতীয় চরিত্র । ১০ 





একবার একখানি ইংরাজি সংবাদপত্রে পড়িয়াছিলাম,_-একজন 
ইতরাজ ধর্মযাজক ইংলগ্ডের একটি কয়লার খনির ভিতর প্রবেশ 
করিয়া তথায় যে সকল মনুর খাটিতেছিল তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা 
করিয়াছিলেন--তোমরা যীণ্ থৃষ্টকে জান? তাহারা আপনারা 
বারকতক হীযু খুষ্ট,বীণড খষ্ট প্রভৃতি নান! রকম বিরত আকারে 
যীশুধৃষ্টের নাঁম উচ্চারণ করিয়া উত্তর করিল-_-57186 100)১0, 
গ্লশ্বোর"” অর্থাৎ নম্বর কত? কয়লার খনিতে মন্তুরদিগের 
নম্বর থাকে, নম্বর ধরিয়! তাহারা পরিচয় দেয়, তাহারা মনে 
করিয়াছিল যে যীশুধুষ্ট যদি তাহাদের মধ্যে একজন নম্বরধারী 
মজুর হয়। তবেই তাহারা তাহার কথা বলিতে পারিবে, নচেৎ 
নয়! যে জাতির মধ্যে ম্যাণিং মিলমানের স্তায় খৃষটয় ধর্ম 
শান্্জ্ঞ পণ্ডিত দেখিতে পাওয়া যাঁয়, সেই জাতির মধ্যে 

সহজ লোক বীশুপুষ্টের নাম পর্যন্ত জানে না! হিন্ুদিগেন্ণ 
মধ্যে এমন হয় না। যে হিন্দু অতি নীচ এবং অশিক্ষিত সেও 
তাহার দেবদেবীর কথা জানে, দেবদেবীর পুজা করে, এবং 
সাধ্যমত ধর্শচর্ধ্যা করে। আমাদের বাগ্দী ছুলেরাও দোল 
দুর্গোৎসব করে, পুর্রাণ-কথা শুনে, স্তরীপুত্রকে প্রতিপালন করে, 
শ্রেষ্ঠটকে সম্মান করে, দুর্্মকে দুর বলিয়া জানে ও ঘ্বণী করে। 
ভিক্ষৃককে ভিক্ষা! দেয়, নিঃসহায় জ্ঞাতিকুটুম্বকে সাধ্যমত নান 
করে। আমাদের নিয়শ্রেণর লোকের! যে রকম দরিদ্র এবং? 
অশিক্ষিত, তাহাতে তাহাদের ধর্শজ্ঞান এবং ধর্শচর্ধ্যা না থাকাই 
সম্ভব । কিন্তু তাহাদের যে পরিমাণ ধর্মজ্ঞান এবং ধর্মচর্যযা 
আছে তাহ! নিতান্তই সম্ভবাঁতিরিক্ত এবং বিশ্ময়কর। মোটা" 
মুটি ধরিতে গেলে এমন কথা বল! যাইতে পারে যে ধর্শজ্ঞান 


১০৬ ত্রিধারা। 


এবং ধর্মচ্য্যা নন্বন্ধে তাহায়া অনেক উচ্চ শ্রেণীর হিন্দুর প্রায় 
সমতুল্য । তাই বলিতেছি যে ধর্শচর্য্যা ও চরিত্রোৎকর্য সম্বন্ধে 
হিন্দুর ভিতর সকল শ্রেণীর মধ্যে যেমন অপূর্ব সমত্ব, সৌসাদৃষ্ত 
বা 89850881615 আছে, ইংঘ়াজ ধা অপর কোন ইউরোপীয় 
জাতির ভিতর শ্রেণী সকলের মধ্যে তাহার এক শতাংশও নাই। 
এই অপূর্ব সৌসাদৃষ্ঠের বা 11০:০08976র হেতু কি? কি 
কারণে হিন্দুর ভিতর উচ্চ শ্রেণীর লোকের ন্যায় নিমনশ্রেণীর 
লোকের ধর্শচরধ্যা এত বেশি এবং চরিত্র এত উত্তম? 

এই আশ্চর্য সমত্ধ বা সৌসার্ৃষ্টের অনেক কারণ থাকিতে 
পারে এবং বোঁধ হয় যে অনেক কারণই আঁছে। বোঁধ হয় যে 
প্রাকৃতিক কারণে এ দ্বেশের লোকে ইউরো পীয়দিগের অপেক্ষা 
বেশি ধর্শশীল এবং দেই জন্য ধর্্ান্থরাগ ও ধর্ণচর্য্য। সম্বন্ধে 
ইউরোপ অপেক্ষা এ দেশে উচ্চশ্রেণী এবং নিয়শ্রেণীর মধ্যে 
বেশি সমন্ব বা সৌসাদৃশ্ত আছে। কিন্ত এই সৌসাদৃশ্ঠের 
অন্যান্ত কারণ এ স্থলে নিরূপণ করিবার চেষ্টা করিব না। বর্ণ- 
ভেদ প্রথার সহিত এই সৌসাপৃষ্তের কোন সম্বন্ধ আছে কি না, 
তাহাই এ স্থলে বুৰিয়| দেখিব । 

পৃথিবীতে মান্গষের সম্বন্ধ ছুইটি জিনিসের সহিত। একটি 
পার্থিবত অর্থাৎ ধন, ষশ, প্রভৃতি পার্থিব ভোগসম্পদ, আঁর 
একটি আধ্যাত্মিকতা বা পারলৌকিকতা অর্থাৎ ধর্ম এবং ধর্ম 
চর্য্যা। এই ছুইটি ছাড়া আর কোঁন জিনিসের সহিত মানুষের 
লক্বদ্ধ থাকিতে পারে না। কেননা পার্থিবতা এবং আধ্যাত্মি- 
ভা ছাড়া আর কোন জিনিস নাই । মানুষের যাহা কিছু 
আছে তাহা হয় পার্থিবতার অন্তর্গত, নয় আধ্যাত্মিকতার অস্ত- 





রর্ণভেদ ও জাতীয় চরিত্র। ১০৭ 





গত। এই জন্য মান্ধ্যকে ধর্প্রধান করিতে হইলে তাহার 
পার্থিবতা কমাইয়া দিতে হয়। ইংলও প্রভৃতি দেশে জ্ঞানী 
লোকের কাছে ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতা অপেক্ষা পার্খিবতাঁর 
সম্মান বা গৌরব যে বেশি তা নয়। ইংরাজি-সাহিত্যে ধর্শের 
যত প্রশংস! এবং মধ্যাঁদা, ধনলম্পদের তত মর্ধাদা এবং প্রশংসা 
নয়। ইংরাঁজ-লেখকের! বলিয়া থাকেন যে ধনী বা বিদ্বান 
হওয়। অপেক্ষা! ধার্শিকি হওয়া বেশি আবগ্ঘাক। ইংরাজধর্্- 
যাজকের! পার্থিবতাঁকে অতি হেয় বা অপকৃষ্ট বলিয়া! নিন্দা 
করিয়ী আধ্যাম্মিকতারই প্রশংস| করিয়া থাকেন এবং লোককে 
পার্থিব পথ ছাড়িয়! ধর্দপথে প্রবেশ করিতে উপদেশ দিয়া 
থাকেন । তথাপি ইংরাজ জাতি সাধারণতঃ পার্থিব তা-প্রিয় 
এবং ধর্মহীন ও চরিত্র-্রষ্ট। ইংরাজের সাহিত্য ও ধর্মশিক্ষার 
সহিত ইংরাজের জীবনের এ অনৈক্য কেন? ইংরাজ তাহার 
শিক্ষাদাতার শিক্ষা বুঝে নাই বা কেন, অথবা! বুঝিয়া তদন্ুসারে 
জীবন নিয়মিত করে নাই বা ফেন? বোধ হয়, ইহার কারণ 
এই যে, ইংরাঞজজ শিক্ষক বা ধর্শযাঁজক ধর্মকে প্রধান বলিয়া 
কীর্ভন বা উপদেশ দিলেও ইংরাজের জীবনের এবং সমাজের 
ভিত্তি ধর্মের উপর স্থাপিত নয়, পার্থিবতার উপর স্থাপিত। 
ইংরাজ ধর্শ-যাঁজক ইংরাজকে বলেন-ধার্শিক হও, ধন- 
সম্পদের লোভে ধন-সম্পদ লইয়া থাকিও না এবং পরকাল নষ্ট 
করিও না। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে বা প্রকৃত জীবন-যাত্রায় ইংরাজ 
দেখে যে কর্মক্ষেত্র তাহার সম্মুখে অনীম আকারে স্থাপিত 
এবং বিরাট মৃত্তীতে বিরাজমান, কর্থ হইতে কর্মাস্তর অবলম্বন 
করিতে তাহার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা॥ অর্থের উপর অর্দ সঞ্চয় করিতে 


১০৮ ত্রিধারা। 


সে সদাই আহত। সে ধর্শ-মন্দিরে শুনিয়া থাকে পার্থিব 
জীবন বড়ই অকিঞ্চিৎকর, ধনসম্পদ বড়ই অনিষ্টকর, পার্থিব 
ভাঁব সন্কুচিত করাই মানুষের প্রধান কর্তব্য । কিন্তু কর্মক্ষেত্রে 
গিয়া! নে দেখে ষে পার্থিবতার দ্বার তাহার জন্য সম্পূর্ণ উন্ুক্ত 
রহিয়াছে, সেই উন্মুক্ত দার দিয়া পার্িবতা তাহাকে মোহিনী 
মুন্তিতে আহ্বান করিতেছে । তখন সে তাহার সেই কাণে-শুন! 
ছুই চারিটা কথা ভুলিয়! যায়, প্রবল পার্থিবতার প্রবল প্রলোতন 
তাহাকে অভিভূত করিয়া ফেলে; সে পার্থিবতার নেশায় 
বিহ্বল হইয়া পড়ে । ইংলগডে ধর্শশান্্র, ধর্মযাজক এবং ধর্শোপ- 
দেশ থাকিলে কি হইবে, ইংলগ্ডের জীবন-প্রণালী ও সমাজ- 
প্রণালী সে ধর্ষ্বোপদেশের উপর স্থাপিত নয়, সে ধর্মোপদেশকে 
কার্যে পরিণত করিবার পক্ষে অনুকুল ও উপযোগী নয়, দে 
জীবন-প্রণালীও সমাজ-প্রণালী সম্পূর্ণ পার্থিরতা-মূলক এবং 
উভয় প্রণালীই পার্থিব নেশ! বাড়াইয়া মানুষকে ধর্মনষ্ট ও 
ছুরাচার করিয়া ফেলে । এই জন্ব সামান্য ইংরাজ এত ছুশ্চ- 
রিত্র ও ধর্দহীন। কিন্ত অতি সামান্য হিন্দুও অনেকাংশে মচ্চরিত্র 
ও ধর্্মশীল। তাহার কারণ এই যে, হিন্দু কেবল শাস্ত্রকার বা 
ধর্দ্যাজকের মুখে পার্থিবতার অপকৃষ্টতা এবং ধর্মচর্ধ্যার উৎ্ুষ্+ 
তার কথা শুনে নাঁ। হিন্দুর জীবন-প্রণালীতে হিন্দু দেখে যে 
পার্থিবতার দ্বার বড়ই মন্কীর্ণ, পার্থিবতার পরিমাণ বড়ই কম, 
পার্থিবঘার আয়তন নিতাস্্ই মাপাজোঁকা, তাহার এ 
দিকেও যাইবার যো নাই ও দ্দিকেও যাইবার যে! নাই, পার্থি- 
বতা লইয়৷ দম্ত আক্ষাঁলন বা বেশি বাড়াবাড়ি করিয়! বেড়াই” 
বার যো নাই । সেই এক স্থির নির্দিষ্ট জীবিকা নির্বাহোপযোগী 


বর্ণভেদ ও জাতীয় চরিত্র । ১০৯ 





কর্ম,_যাহা! শত সহজ পূর্বপুরুষ করিয়। গিয়াছেন, আজ 
আমাকেও কেবল তাহাই করিতে হইবে, আর আমার পরে 
আমার বংশে শত সহস্র উত্তরপুকরুষ কেবল তাহাই করিবে। 
তবে পার্থিব কর্মক্ষেত্র ত আঁর বাহাছরি করিবার যায়গা 
নয়, সেখানে বাহাছুরি ত চলেও না। সে ক্ষেত্র এতই সঙ্কীর্ণ 
যে সেখানে পাঁশমোড় দিবারও স্থান নাই । যে সঙ্কীর্ণ স্থান- 
টুকু নহিলে নয়, তাহাই আছে। সে স্থানটা ভাল স্থান হইলে 
শান্কারেরা কি তাহা এত ক্ষুদ্র করিয়া, এত স্বল্প পরিমাণে 
দিতেন? পার্থিব কর্মক্ষেত্র অর্থাৎ যে কর্শক্ষেত্র প্রশস্ত হইলে 
পার্থিবতা প্রশ্রয় পহিয়! মান্গবকে পশুবৎ করিয়া ফেলে, পার্থিব 
কর্ণক্ষেত্র অপকুষ্ট বলিয়া হিন্দু তাহা এত সন্ধীর্ণ আকারে পাই- 
য়াছে। পাইয়া কি উচ্চশ্রেণীর হিন্দু কি নিয়শ্রেণীর হিন্দু, সকল 
হিন্দুই বুঝিয়াছে যে পার্থিবতা অপকৃষ্ট এবং ধর্মই উৎকৃষ্ট, 
এবং এইরূপ বুবিয়াই কি উচ্চশ্রেণীর হিন্দু, কি নিসনশ্রেণীর হিন্দু, 
সকল হিন্দুই ধর্মচর্ধ্যায় প্রায় সমান হইয়া উঠিয়াছে। হিনূর 
মধ্যে বর্ণভেদে ব্যবসায়ভেদ অর্থাৎ বর্ণামুলারে স্থির নিদিষ্ট 
ব্যবসায় থাকায় এই আশ্চর্য ফল ফলিয়াছে। 

পার্থিবতা এবং আধ্যান্মিকতা| বা ধর্শচ্ধ্যা, মানুষের কেবল 
এই ছুইটি জিনিসের সহিত সম্পর্ক। কারণ তৃতীয় জিনিস 
আর নাই। অতএব ইহার মধ্যে একটি যদি অপকৃষ্ট বলিয়া 
অনুভূত হয়, অপরটি কাজে কাজেই শ্রেষ্ঠতা লাভ করে। ভারতে 
বর্ণানুসারে নিষ্দিষ্ট ব্যবসায় থাকায় হিন্দু পার্থিবতাঁকে অপকৃষ্ট 
বলিয়া অন্গুভব করিয়াছে এবং ধর্শচর্ধ্যাকে শ্রেষ্ঠ বলিয়া বুঝি- 
স্বাছে। কাজেই হিন্দুর মনে পার্থিব ভাব অপেক্ষা ধর্মভাব 


১০ 


১১৬ ূ ত্রিধারা 


প্রবল হইয়াছে । এখন এই কথা বুঝাইতে চেষ্টা করিব যে 
বর্দভেদ প্রথার আর কতকগুলি গুণ বা লক্ষণ আছে, যদ্থারা 
ধর্ম্ভাবের প্রাধান্য বড়ই রাড়িয় গিয়াছে, এবং ধর্মচর্ধযা সমস্ত 
হিন্দু-সমাজে বড়ই সম্প্রসারিত হইয়াছে। বর্ণভেদ প্রথায় 
মান্য শ্রেষ্ঠ নিকষ্ট শ্রেণীতে বিভক্ত হয়। ইহার একটি ফল হয় 
এই যে, যে নিকুষ্ঠ সে শ্রেষ্ঠকে মানত করিতে শিখে এবং শ্রেষ্ঠকে 
মান্য করিতে শিখিলে শ্রেষ্ঠের আচার ব্যবহার অন্থুদরণ করিতেও 
তাহার প্রবৃত্তি ও চেষ্টা হয়। সেইজন্য হিন্দুর মধ্যে নিকুষ্ট 
বর্ণ শ্রেষ্ঠ বর্ণের আঁচাঁর ব্যবহার অনুসরণ করে। ইহার আর 
একটি ফল হয় এই যে যে শ্রেষ্ঠ সে নিক্ুষ্ট হইতে এক- 
কালে বিচ্ছিন্ন হয় না, অর্থাৎ যে শ্রেষ্ঠ সে তাহার নিকুষ্টের 
সম্বন্ধে শ্রে্ঠ এবং যে নিকৃষ্ট সে তাহার শ্রেষ্ঠের বন্বদ্ধে নিকুষ্ট। 
অতএব একটা স্ত্রে শ্রেষ্ঠ এবং নিকৃষ্ট পরস্পরের সহিত সম্বন্ধ 
রিশিষ্ট। শ্রেষ্ঠ বর্ণ নিকৃষ্ট বর্ণের সহিত একটা না একটা 
সম্বন্তে আবদ্ধ বলিয়া যে বর্ণে নিকৃষ্ট, তাহাকে শ্রেষ্ঠ বর্ণ লক্ষ্য 
করিয়া চলিতে হয় এবং সেইজন্য শ্রেষ্ঠবর্ণ যাহাকে উত্তম জীবন 
প্রণালী বলিয়া অন্ুদরণ করে নিকৃষ্ট বর্ণও সেই জীবন প্রণালী 
অন্ুনরণ করে । ইংলগ প্রভৃতি দেশে অর্থের পরিমাণ ছাড়া 
শ্রেষ্ঠ এবং নিকুষ্ট শ্রেণীর মধ্যে প্রকৃত সামাঁজিক সম্বন্ধ কিছুই 
নাই, এবং সেইজন্য সেখানে সকল লোকও যেমন নিকৃষ্ট 
শ্রেণীর লোকও তেমনি কেবল অর্থের এবং পার্থিবতীর জন্গু- 
সন্রণ করিয়। বেড়ায় । শ্রেষ্ঠ শ্রেণীর লোকের মধ্যে যদি কাহারো 
জীবন-প্রণালী ধর্পমূলক হয়, নিকৃষ্ট শ্রেণীর লোকে সে জীবন" 
প্রগালী অন্ধুপরগ করে না। এই দুই কারণে হিন্দুর ভিতর 





ধর্ণতেদ ও জাতীয় চরিত্র । ৯১১ 


শ্রেষ্ঠ শ্রেণীর শ্রেষ্ট জীবন-প্রণাঁলী নিকৃষ্ট শ্রেণীর মধ্যে সপ্রসারিউ 
হইয়াছে এবং এই ছুই কারণের অভাবে ইংলও প্রভৃতি দেশে 
শ্রেষ্ঠ শ্রেণীর শ্রেষ্ঠ জীবন-প্রণালী শ্রেষ্ঠ শ্রেণীর মধ্যেই সম্বন্ধ 
আছে, নিক্ুষ্ট শ্রেণী কর্তৃক অনুস্থত হয় নাই। ইহাত গেল 
শ্রেষ্ঠ নিকৃষ্ট বর্ণের ন্বদ্ব-নস্ভত ফল। 

আবার ধর্মচরধ্যা বৃদ্ধি করিবার পক্ষে বর্ণগত ছুই একটি 
বিশিষ্ট কারণ আছে। সাধারণ লোকে যতই কেন ধর্ম্মভাবাপন্ন 
হউক না, তাহারা একেবারে পার্থিব আসক্তি বা স্পৃহা পরি- 
হার করিতে পারে না। সমীজে যশম্বী বা ক্ষমতাশালী হইতে 
তাহাদেরও ইচ্ছা! হয় । কিন্তু সমাজ সমুদ্রবৎ স্তদুর- প্রসারিত 
কুলকিনারা শূন্য হইলে, সাধারণ লোকের যশন্বী ব1 ক্ষমতশালী 
হইবার ইচ্ছ! সহজে হয় না, হইলেও সে ইচ্ছা প্রায়ই মনের 
মধ্যে মিলাইয়া যায় । যেখানে লোকসমাজ অনস্ত সাগর সদৃশ 
সেখানে তুমিও যেন কোথায় ভুবিয়া থাক আমিও যেন 
কোথায় ভূবিয়া থাকি, তোমারও সমাজে প্রতিপত্তি লাভের 
আশা যেমন বামনের চশদ ধরিবার আশার অনুরূপ, আমারও 
সমাজে প্রতিপত্তি লাভের আশণ তেমনি বামনের চাদ ধরিবার 
আশার অনুরূপ । যে সমাজে কর্তলোক রহিয়াছে এবং কত 
বড় লোক, আরে! কত বড় লোক, আরো! কত বড় লোক 
রহিয়াছে, সে সমাজে তোমার আমার বড় হইবার আশ! 
হইবেই বা কেমন করিয়া? এই ত আমাদের সামান্য বাঙ্গাল! 
সাহিত্য-মগুলীতে থাকিয়৷ ছুকলম লিখিয়া যশোঁলাভের আশা! 
করিতেছি, কিন্ত কৈ চল দেখি, ইংলগডের বিরাট-সাহিত্য- 
মগডলীতে গিয়া কেমন করিয়া! লিখিয়া যশোলাত ক'রবার আশ! 


১১২ তরিধায়!। 





করিতে পারি? ইংল্ডে মহ্ুষ্যসমাজ সমুক্রের ন্যায় বৃহৎ ও 
একাকার । সেখানে সামান্য এবং দিম্শ্রেণীর লোকের সমাজে 
প্রতিপতিশালী হইবার আশা! সহজে হয় না। ভারতে হিন্দু 
সমাজ সমুদ্রবৎ বৃহৎ কিন্তু ইংলগ্ের মনুষ্য সমাজের ন্যায় একা- 
কার নয়। হিন্দুসমীজ অনেক বর্ণে বিভক্ত । প্রত্যেক বর্ণ 
সমস্ত সমাজের তুলনায় অতি ্ষুত্র। অতএব আপন আপন 
বর্ণের মধ্যে বড় হইবার ইচ্ছা! সকল হিন্দুরই সহজে হইতে পারে । 
সীমার ভিতরে সামান্য লোকও বড় হইতে পারে, অসীমের 
ভিতর অসীম শক্তি সম্পন্ন ব্যক্তি ভিন্ন আর কেহ বড় হইতে 
পারে না, বড় হইবার আশাও করিতে পারে না। যে আপন 
বর্ণের মধ্যে বড় হইতে চায়, তাহাকে সমস্ত সমাজের বড় 
লোকের প্রতিঘন্দীতার ভয় করিতে হয় না, তাহার আপনার 
বর্ণের যাহারা বড়লোক কেবল তাহাদের প্রতিদ্বন্দ_ীতারই ভয় 
করিতে হয়। দে ভয় বড় বেশি ভয় নয় এবং সেই জন্য এদেশে 
হিন্দুর ভিতর অতি নিয্শ্রেণীর মধ্যে অনেক লোকে সৎকর্ট্ের 
দ্বারা আপন আপন বর্ণের মধ্যে সম্মান ও সামাজিক ক্ষমত] লাভ, 
করে। দেবালয়, সদাত্রত, অতিথিশালা, পথ, ঘাঁট, পুক্ষরিণী, 
সরাই, কূপ, কুঞ্জ, প্রভৃতি পরোপকারার্থ এবং পারলৌকিক 
হিতার্থ অনেক সৎকর্ম এদেশে হইয়! গিয়াছে এবং এখনও কিছু 
কিছু হইতেছে । সকলেই বোধ হয় জানেন যে এই নকল 
সদনুষ্ঠান উচ্চশ্রেণীর হিন্দুতে যে পরিমাণে করিয়াছে, নিম্ন 
শ্রেণীর হিন্দুভেও প্রায় সেই পরিমাণে করিয়াছে। ইংলগু 
প্রভৃতি দেশে বর্ণভেদ নাই বলিয়া সেখানে জনকতক করিয় 
খুব বড় ব| ভাল লোক হয় ।কিন্ত ভারতে বর্ণভেদ আছে বলিয়া 


বর্ণভেদ ও জাতীয় চরিত্র । ১১৩ 


সমাজের নকল শ্রেণীতে খুব বড় রকমের লোক না হউক, অসংখ্য 
ভাল লোক হয়--অতি নীচ জাতিতেও অনেক অতি উত্তম 
লোক দেখা যায়। হিন্দুসমাজে অসংখ্য গহক চণ্ডাল দেখা 
রা পারে, ইউরোপীয় সমাজে বোধ হয় ছুই চারিটার বেশী 

য়, হয়ত তাও নয়। 

আবার কোন একটি বর্ণের মধ্যে কেহ সৎকর্শের দ্বারা 
প্রতিষ্ঠাবান হইলে সেই বর্ণের মধ্যে অনেকেই তাহার কার্ধ্যের 
অনুকরণ করিয়া থাকে । নিকৃষ্ট বর্ণ শ্রেষ্ঠ বর্ণকে যে কারণে 
অন্থকরণ করে, তাহারাও নেই কারণে সেই প্রতিষ্াবান্‌ 
লোকের অন্থকরণ করে। অধিকন্ত প্রতিষ্ঠাবান্‌ ব্যক্তি আপন 
বর্ণের মধ্যে বর্ণপন্বদ্ধীয় ব্যাপারে বেশি ক্ষমতা লাভ করে বলিয়া 
তাহার আপন বর্ণের লোক ভয়েও তাহার দৃাস্তান্থরণ করে। 
এই প্রকারে বর্ণ বিশেষের দ্বারা বর্ণ বিশেষ ধর্মপথে পরিচালিত 
হয়। 

এখন বোধ হয় বুঝ! গেল যে হিন্দুর ভিতরে উচ্চ মধ্যম এবং 
নিয় সকল শ্রেণীর লোকের মধ্যে ধর্শচর্য্যা এবং চরিত্রোৎকর্ষ 
সম্বন্ধে যে অপূর্ব দমন্ব সৌসাদৃশ্ত ব111010887৩1 আছে, হিন্দুর 
বর্ণভেদ প্রথ তাহার একটা প্রবল কারণ । তবে কি বর্ণভেদ্‌ 
থাকিয়া যাইবে, বর্ণভেদ প্রথ| উঠান হইবে ন1? বর্ণভেদ প্রথ! 
থাকিবে কি না বলিতে পারি না, বর্ণভেদ প্রথা উঠান উচিত 
কি না, তাহাও এপ্রবদ্ধে বলিতে প্রস্তুত নহি। এই পর্য্যন্ত 
বলিতে পারি যে কালে বর্ণভেদ প্রথার কি হইবে, তাহা এখন 
কাহারে! বলিবার সাধ্য নাই । যাইবার হয়, সে প্রথা যাইবে, 
না যাইবার হয় থাকিবে; ভিন্ন আকারে থাকিবার হয়, ভিন্ন 





১১৪ ত্রিধারা ৷ 





আকারে থাকিবে। আমরা ষথার্থই দৃষ্টিহীন এবং বুদ্ধিহীন। 
এত বড় সামাজিক কথা মীমাংসা করিবার ক্ষমতা আমাদের 
নাই। অতএব বর্ণভেদ প্রথার কি হইবে একথার মীমাংসা 
করিবার চেষ্টাও করিব নাঁ। তবে এই পর্য্যন্ত বলিব যে, শুধু 
উপদেশবাঁক্যে বা উচ্চভাবের জোরে সমাজকে বাঁধিয়া! রাখা যায় 
না। উপদেশবাক্য উচ্চ প্রকৃতির লোকের জন্ত--উচ্চভাব উচ্চ- 
দ্বরের লোকের জন্য । কিন্তু সমাজ গুধু উচ্চদরের লোক লইয়া 
নয়, প্রধানতঃ সামান্য লোৌক লইয়াই সমাজ। কিন্তু সামান্ত লোক 
শুধু উপদেশে আবদ্ধ হয় না, উচ্চভাবে মজিয়া উচ্চভাবে জীবন 
যাপন করিতে পারে না। সমাক্কে বাঁধিতে ও সদাঁচার সম্পন্ন 
করিতে হইলে, মুখের উপদেশও চাঁই, উচ্চভাবও চাই, আবার 
বর্ণভেদ, পারিবারিক শাঁসন, প্রভৃতি ঠেকাঁঠোকাও চাই। মানু 
যকে যেমন উপদেশ দিয়! এবং উচ্চভাবের তরঙ্গের মধ্যে ফেলিয়া 
দিয় ভাল করিবার চেষ্ট1! কর! চাই, আচার ব্যবহার সামাজিক 
প্রথা ও অনুষ্ঠান প্রভৃতি ঠেকাঠোক। দিয়াও তেমনি ভাল করি- 
বার চেষ্টা করা চাই। বর্ণভেদ ক্রিয়াকাও প্রভৃতি সকল প্রকার 
ঠেকাঠোকা ফেলিয়া দিয়া ধু উচ্চ উপদেশ ও ভাবের উপর 
সমাজ দাড় করাইবার চেষ্টাও হইয়া গিয়াছে। বুদ্ধদেব একবার 
সেই চেষ্টা করিয়াছিলেন । ঠৈতন্য দেব আর একবার সেই 
চেষ্টা করিয়াছিলেন । কিন্তু উভয়. চেষ্টাই বিফল হইরাছে। 
বৌদ্ধমমাজ এদেশে আর নাই বলিলেই হয়, আর বঙ্গের সাধারণ 
বৈষ্ণব চৈতন্যদ্দেবের কলঙ্কের কথ] হইয়! ধ্াড়াইয়াছে । চৈতন্য 
দেবের পরম পবিত্র বিশ্বব্যাপী প্রেম পাশব প্রেমে পরিণত হই- 
য্লাছে! তাই বলি যে, শুধু উচ্চ উপদেশে বা ভাবে সমাজকে 


বর্ণভেদ ও জাতীয় চরিত্র । ১১৫ 


স্পা 


বাঁধিয়া সৎপথে রাখা ধায় না। সমাজকে বাঁধিতে বা সৎপথে 
রাখিতে হইলে উচ্চ উপদেশ ও উচ্চ ভাব যেমন আবশ্তক আচার 
ব্যবহার প্রথা প্রণালীরূপ সামাজিক ঠেকাঠোকাঁও তেমনি আব- 
শ্তক। তাই উপনংহারে একটি কথ৷ বলিতে হইতেছে । দেখি- 
তেছি, এখন আমাদের মধ্যে কেহ কেহ বর্ণভেদ প্রথ৷ ছাড়িয়া 
ইংরাজদের ন্যায় একাকারভাব অবলম্বন করিতেছেন । তাহা- 
দিগকে বলি যে, তীহার! বদি বর্ণভেদ প্রথাকে যথার্থই বড় 
অনিষ্টকর বলিয়া বুঝিয়া থাকেন, তবে সে প্রথা ছাড়িয়। দিয়া 
ভালই করিয়াছেন। কিন্তু তীহারা যেন শুধু উচ্চ উপদেশ বা 
উচ্চ ভাবের উপর নির্ভর করিয়া থাকেন না, কেন না তাহা 
হইলে তাহাদের সমাজ টিকিবে কি না সনেহ, সৎপথে 
কিছুতেই থাকিবে না । অতএব তীহারা যেন সামাজিক ঠেকা- 
ঠোঁকার অনুসন্ধান করেন এবং যত শীঘ্র পারেন ঠেকাঠোকা 
প্রয়োগ করেন । আর আমাদের সমস্ত হিন্দু জাতির সম্বন্ধে এই 
কথা বলিতে চাই যে, কালে আমাদের বর্ণভেদ প্রথা ন! 
থাকিতে পারে । ন|! থাকিবাঁর হইলে, কখনই থাঁকিবে না, 
এবং তখন সে প্রথাকে রাখিবাঁর চেষ্টা করিলে আমাদের অমঙ্গল 
বই মঙ্গল হইবে না। যদি সে প্রথা নাখাকে, অথবা আব- 
শ্তকমত পরিবর্তন করিয়া! লওয়া না চলে, তবে বড়ই ভয় হয় 
যে, সুদূর ভবিষ্যতে আমাদের বংশোদ্ভূত মহাপুরুষদিগকে 
সামাজিক ঠেকাঠোকার জন্য ব্যতিব্যস্ত হইতে হইচুর, এবং 
সামাজিক ঠেকাঠোকা না মিলিলে _ পবিত্র আর্ধযভূমের 
পবিত্র আখ্যা ঘুচিয়া যাইবে এবং অপবিত্র আধ্যতূমে সেই 
মহাপুরুষদিগকে কোটি কোটি ধর্মহীন চরিত্রত্র্ট পিশাচের 








১১৬ ত্রিধারা। 





সহিত এক বিকটাকার সমাজে কোন মতে দিন যাপন করিতে 
হইবে । . 


দেব-ধন্মী মানবঞ্। 


দিন রাত্রি, আলে অন্ধকার, শুরুপক্ষ কৃষ্ণপক্ষ, মুখ ছুঃখ, 
তিক্ত মধুর, শীতল উষ্ণ, পৃথিবী ছুইটি দিক, ছুইটি রূপ, হুইটি 
ভাগ। ইহার মধ্যে একটি মাত্র দেখিলে পৃথিবী দেখা হয় নাঃ 
পৃথিবীর অর্ধেকও দেখা হয় না । যে শুধু তিক্তরণ আন্বাদন 
করিয়াছে, কখনও মধুর রস আস্বাদন করে নাই, সে তিক্তরসও 





1 আস্বাদন করে নাই। অতএব পৃথিবী বুঝিতে হইলে তাহার 


_ ছুইটি দিকই বুঝা! আবশ্তক, একটি দিক মাত্র বুঝিলে তাহার 
কোন দিকই বুঝা হয় না। কিন্তু পৃথিবীর যেমন মান্থুষেরও 
তেমনি ছুইটি দিক আছে। একটি ভাল দিক একটি মন্দ দিক। 
: মানুষের পদতলে পৃথিবী, মানুষের মন্তকোপরি স্বর্গ । তাই বুঝি 
মানুষ এক দিকে পশু, আর একদিকে দেবতা । কিন্তু কারণ 
: যাহাই হউক, কাট! ঠিক যে মানুষ এক দিকে পশু আর এক 
দিকে দেবতী। অতএব মান্গষকে বুঝিতে হইলে তাহার পশু- 
ধর্শও বুঝা চাই, দেবতা-ধর্্মও বুঝা চাই। অক্ষয় বাবুর কল্যাণে 
গাঠক পণ্ড বা জন্ত-ধন্মাঁমানব দেখিয়াছেন। এখন তাহাকে 
দেব-ধন্ম্ মানব দেখাইব। 
* নবজীবনে অক্ষয় বাবু 'জন্তধন্মী মানব” এই নামে একটি চমৎকার 
প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন। দেই প্রবন্ধটি গড়িয়া আমি এই প্রবন্ধটি লিখি। 
জঙ্ষয় বাবুর প্রবন্ধটি পরিশিষ্টে দিলাম। 


দেব-যক্মী মানব । ১১৭ 





জন্ত-ধন্ম মানবের ন্যায় দেব-ধন্মণ মানবও নানা শ্রেণীর 
ও নাঁন। প্ররুতির । জন্ত-গ্রকৃতিও যেমন বহুবিধ, দেব-প্রক তিও 
তেমনি বহুবিধ। অন্তর মধ্যে সর্প, বৃশ্চিক, সিংহ, ব্যাত্র, শৃগাল, 
কন্ধুর, মার্জার, প্রভৃতি সকলে ভিন্ন ভিন্ন প্রক্কৃতি সম্পন্ন । 
দেবতাদিগের মধ্যে ব্রদ্মা, বিষ, মহেশ্বর, ছুর্া, কালী, জগন্ধাত্রীঃ 
লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ প্রভৃতি সকলে ভিন্ন ভিন্ন 
প্রকূতি বিশিষ্ট । অতএব জন্ত-ধর্ম্ণ মন্গয্যের মধ্যে সকল রক- 
মের মনুষ্য যেমন বর্ণনা করিয়া উঠা যাঁয় না দেবতা-ধন্ব মনথ- 
য্যের মধ্যেও তেমনি নকল রকমের মনুষ্য বর্ণনা! করিয়া উঠা 
যায় না। ফলতঃ মকল রকম বর্ণন! করিবার আবশ্তকও নাই। 
উদাহরণ ম্বরূপ ছুই তিন রকমের দেব-ধশ্মাঁ মানুষের কথ 
বলিলেই পাঠক সকল রকমের দেব-ধন্ী মানুষ ঠিক করিয়! 
লইতে পারিবেন। অতএব তাহাই করিব। 

__তত্র অন্নপূর্ণা-ধন্মী ৷ 

জগন্মাতী অন্নপূর্ণ জগৎকে অন্ন দিয়া রক্ষা করেন। মনুষ্য 
মধ্যেও অন্নপূর্ণা আছে। 

এই সেদিনকার কথ! বলিতেছি, সেদিন ভুমি আমিও 
একটু একটু দেখিয়াছি--সেইদ্িনকার সেই পিতামহ ঠাকুরের 
কথা বলিছেছি। পিতামহ ঠাঁকুরের গৃহে লোক ধরে নাঁন্্ী 
পুত্র কন্যা ভাই ভাইপো আছেই ত। কিন্তু আরো যে কত 
আছে তাহা বলিতে পারি না। আহী! জ্ঞাতি কুটুম্বের মধ্যে 
স্রীবল পুরুষ বল যে যেখানে নিরন্ন নিরাশ্রয় হইয়াছে সেই 
আমার পিতামহ ঠাকুরের গৃহে পুত্র কন্তা অপেক্ষাও প্রিয়, 
গৃহদেবতা অপেক্ষাও সমাদৃত, গুরুদেব অপেক্ষাঁও সম্মানিত। 


৯১১৮ ত্রিধায়া। 





পিতামহ ঠাকুরের বেশভৃষা নাই-__তীহাঁর পায়ে একটি যোড়া 
_খড়ম, পরণে এক খানি থান কাপড়, স্কদ্ষে একখানি সেইরূপ 
উত্তরীয়। তীহার ভোগবিলাম নাই-তিনি গাড়ী খোড়া 
কখনও চক্ষে দেখেন নাই, আতর গোলাপের নাম শুনিয়াছেন 
মাত্র, ভোজন করেন আশ্রিত অনাথা অনাঁধিনীরা যা তাই, 
তাহার চেয়ে খাঁরাঁপ ত ভাল নয়। ভীাহার বিষয় সম্পর্দের 
ভাবনা নাই-তিনি মনুষ্য মধ্যে অন্নপূর্ণা_তাহার একমাত্র 
ভাবনা, কিসে তীহার দেই অন্নের কাঙ্গালগলি অন্ন পাইবে। 
তিনি সকলের পেটের জালা বোঝেন, কিন্তু তাহার আপনার 
পেটের জ্বালা নাই । বেলা ছুই প্রহর হইয়াছে, তখনও তিনি 
আহার করেন নাই, কেন না তখনও তিনি অনুসন্ধান করিতে" 
ছেন পাড়ার হাঁড়ি মুচি কাওরা কৈবর্তের মধ্যে কাহারো অন্ন 
জুটিল কিনা । যাহার অন্ন যুটে নাই তাহাকে অন্ন দিয়া তবে 
আপনি বেল! প্রায় তিন প্রহরের সময় শ্বয়ং এক মুটা ভক্ষণ 
করিলেন। তিনি মনুষ্য মধ্যে অন্নপূর্ণা। তেমন অন্নপূর্ণা 
আমরা আর দেখিব না। আমাদের সে অন্পূর্ণার পুরী ভায়া 
গিয়াছে । 
আর সেই রাঙ্গ! দিদির কথ! মনে পড়ে কি? সেই অসী- 
মান্ধ রূপলাবণ্যসম্পন্ন৷ সেই কালের-ছায়া-মাখা-রক্তপন্ম-রূপিণী 
বালবিধবা রাঙ্গাদিদিকে মনে পড়ে কি? যদ্দি মনে না পড়ে 
তবে সেই কৈলাসবাপিনী ভিখারী ভূতনাথের অন্পূর্ণাকে মনে 
কর, ভাহা হইলেই সেই বঙ্গের বাঁলবিধবা রাঙ্গাদিদিকে মনে 
করা হইবে । “তিনি যখন শুভ্র পটবস্ত্র পরিধানে আলুথালু কাল 
কেশরাশি কপালের উপর ভ।গে এল বন্ধনে, রাজ। হস্তে দর 


দেঘ-ধন্ম মানব । ১১৯ 





ভরিয়া গৃহপ্রাঙ্গণে শত শত বালক বালিকাকে ্বহন্তে অন্ন বিত- 
রণ করিতেন, সকলে কাণাকাঁণি করিত যেন সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা 
অবতীর্ণ হুইয়াছেন। বিবাহ শ্রীন্ধ ক্রিয়াকলাপে সমস্ত গৃহ- 
কাধ্যনির্ব্বাহকারিণী, রাঙ্গ! ঠাকুরাণীই প্রধান ভাগারিী ছিলেন, 
তিনিনিজ হস্তে যাহাকে যাহা দিতেন তাহাই তৃপ্তিকর, তাহার 
দ্বিপ্ণ অপরের হস্ত হইতে প্রাপ্ত হইলেও কেহ স্থথী হইত না। 
আম হউক বা! কুল হউক, রাঙ্গাঠাকরুণ বাঁটিয়া না দিলে 
কাহারো মঞ্জর নাই । আজ অন্নমেরু, কাল তুলা, পরশ্ব সাবিত্রী- 
ব্রতদানে রাঙ্গাদিদির রাঙ্গা তবু নিয়ত ম্লান মুখটি কখন কগন 
্রচুল্লতায় উজ্দ্বল হইত। শ্বয়ং নিঃসভ্তান কিন্তু দেশের ছেলে 
তাহার সন্তান ছিল বলিলে অত্যুক্তি হয় না * 1” 

এ রাঙ্গাদিদিকে যে মানবী বলে দেবতা কাহাকে বলে সে 
জানে না। হিন্দুর গৃহে গিয়া অন্নপূর্ণারূপিণী হিন্দুরিধবাকে 
দেখিলে সে প্রকৃত দেবতত্ব শিখিতে পারে । রাঙ্গাদিদির ন্তায় 
নন্্পূর্ণা এখনও আমাদের ঘরে আছে। তাঁই আমরা এখনও 
একেবারে উৎসন্্ন হই নাই। তাই বিষণ এখনও আমাদিগকে 
পালন করিতেছেন এবং বিষুপ।লিত বিশ্বে আমাদের এখনও 
াড়াইবাঁর স্থান আছে। তাই মন্ুয্য মধ্যে আমাদের মনুষ্য 
বলিয়া এখনও কিছু মান সম্রম আছে। 

আমার মেজকাকী আর একটী অন্নপূর্ণা । ষ্ কাকীর 
বয়স চল্লিশের বেশি, কাঞ্চনের ন্যায় বর্ণ, পাতলা ছিপছিপে, 

* জটাধারীর রোজনামচা নামক গ্রন্থের ৬০ পৃষ্ঠা। রাঙ্গাদিদি কবির 

না নয়, এক সময়ে একটি সন্ত্রস্ত পরিব(৫র রাঙ্গাদিদি যথার্থই জীবিভ 

লেন, একথা আমর! জানি। রাঙ্গাদিদির আসল নাম ছিল অন্পূর্ণা। 





5২০ ত্রিধারা । 





যেন স্ষুপ্র ঠাপার কলিটি। মেজকাকী গৃহের মধ্যে একজন' 
গৃহিণী কিন্তু অর্ধাবগুঠনবতী, ছেলেপুলেরাঁও তীহার মুখখানি 
ভাল করিয়। দেখিতে পায় না। মেজকাঁকীর গল! নাই, তিনি 
এখনও আস্তে আস্তে ফিস্‌ ফিন্‌ করিয়া কথা কন। মেজ- 
কাকীর ছেলেপুলে নাই। মেজকাকীর ঝাড়া হাত পাঁ। কিন্ত 
মেজকাকীর ঘরে ছেলে ধরে না। ঘোষেদের ছেলে, মিত্রদের 
ছেলে, সরকাঁরদের ছেলে, গ্রামের কলের ছেলেমেয়ে, মেজ- 
কাকীর ঘরে সদাই ছেলের হাট । মেজকাঁকী কোন ছেলেকে 
খাওয়াইতেছেন, কোন ছেলেকে পরাঁইতেছেন, কোন ছেলেকে 
ঘুম পাড়াইতেছেন, কোঁন ছেলের গ1 মুছাইয়া দিতেছেন। 
মেজকাঁকী উপর হইতে নীচে যাইতেছেন, সঙ্জে সঙ্গে পাচ 
মাতটা ছেলে যাইতেছে; নীচে হইতে উপরে আসিতেছেন, 
সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ সাতটা? ছেলে আমিতেছে । মেজকাকী ঠাকুর 
প্রণাম করিতেছেন, তাহার এপাশে ওপাঁশে সামনে পিছনে 
ছেলের পালও 'ঠীকুল বাল কল' বলিয়া টিপ. টিপ করিয়া 
ঠাকুর প্রণাম করিতেছে । রাত্রি এক প্রহর, তখনও মেজকাকীর 
ঘরে পাঁচটা ছেলে । মেজকাকী তাহাদিগকে দুধ খাঁওয়াইয়া 
গুণ ৭ ন্বরে গান গাইয়া ঘুম পাঁড়াইলেন, ছেলেদের মায়ের 
আগিয়া তাহাদিগকে লইয়া! গেল। একটি ছেলে মেজকাঁকীর 
ঘরেই রহিল। সে ছেলেট! বড় ছুরস্ত এবং তাহার মার আর 
পাঁচটা ছেলে আছে। তাহার মা তাহাকে মেজকাঁকীর কাছে 
রাখিয়া বাচিল। মেজকাকীর একটি পয়সাও খরচের দরকার 
নাই। কিন্তু খেলনায় ও সনেশ মিঠাই খে বাতাসায় তাহার 
মাসে পনর যোল টাকা! ব্যয় হয়। মেজকাকা একটু একটু 


দেব-ধর্ধ্শী মানব । (১২১ 


আকিঙ্গ খান, তাই তাহার প্রতিদিন সেরটাঁক্‌ ছধের দরকার, 
তার বেশি নয়, কিন্ত প্রতিদিন তাহার ঘরে পাচ ছয় সের হুধ 
খরচ হয় । মেজকাকীর ঝাড়া হাত পা, কিন্ত দিনে রেতে 
ভাহার সাবকাঁশ নাই-এমন কি, মেজকাঁক পাঁচ বার চাঁহি- 
ফ়াও একবার এক ঘটি জল পান না। মেজকাকী জগস্ধাত্রী, 
যাহার ধাত্রীর আবশ্তক সেই তাহার কাছে আমে। তিনি 
অন্পূর্ণা, ন্নেহের ভিখারী শিগকে তিনি দিবারাত্রি স্্েহ স্থধা 
পান করাম। 9৩71 

আর $ ছোট দাদা? উনিও অন্নপূর্ণা। দশ ঘর জ্ঞাতির 
মধ্যে উনিও এক ঘর | কিন্ত এক ঘর ₹ইয়াও উনি সকল ঘরেই 
সমান । আপনার ঘরেও যেমন, জ্ঞাতির ঘরেও তেমনি । 
ও'র আপনার ছেলে মেয়ে ভাই ভাইপোও যেমন জ্ঞাতির 
ছেলে মেয়ে ভাই ভাইপোও তেমনি । জ্ঞাতি সুখী হইলে 
ও'র সুখ উলিয়া উঠে। জ্ঞাতি কষ্ট পাইলে ও'র প্রাণ 
কাদিতে থাকে । জ্ঞাতিও যেমন ও'র আপনার গ্রাম শুদ্ধ 
লোকও তেমনি ওর আপনার । উনি সকলেরই ছোট কাদা । 
ৰাপও উ"হাকে ছোট দাদ। বলে, ছেলেও উহাকে ছোট দাদ 
বলে। উনি “কোম্পানির ছোট দাদা । ওর গুণে সমস্ত 
গ্রাম খানি একটি কোম্পানি-_-এক পথে চলে, এক স্থরে কাদে, 
এক স্থুরে হাসে। উহাকে ধরিয়া গ্রামখানি বাঁচি আছে। 
উনি গ্রাম খানির প্রাণ । উনি গ্রামের অন্নপূর্ণা । কিন্তু হায়! 
উহাকে এখন আর বড় দেখিতে পাই না । ভথন বঙ্গের গ্রামে 
গ্রামে কোম্পানির দাদা, কোম্পানির কাক] দেখিতে পাইভাম। 
এখন আর বড় পাই না। বজদেশ এখন দেবতাশৃন্ত হইতেছে 


১১ 





১২২ ভ্রিধারা 


সত্যই বঙ্গে ছুর্দিন উপস্থিত হইয়াছে! তুমি বঙ্গীয় প্রাচীন 
সমাজের কতই নিন্দা কর এবং বলিয়া থাক যে ইংরাজি 
শিক্ষার প্রভাবে সে সমীজ অনেক উন্নতি লাভ করিয়াছে । কিন্তু 
মহ দোষ সত্বেও সে সমাজে দেবতা ও দেব-চরিতর ছিল । সে 
দেবতা ও দেব-চরিত্ব হারাইয়া তোমাঁদের যে ক্ষতি হইয়াছে, 
তোমাদের কথিত উন্নতি তাহার এক শতাংশও পূরণ করিতে 
পারিবে না। গণ বল, বুদ্ধি বল, বিদ্য! (বল, স্বাধীনতা বল, 
সাম্য বল, চরিত্রের সমান কিছুই নয়। আমর সেই চরিত্র 
হারাইভেছি। বিধাভা জানেন আমাদের উন্নতি হইতেছে কি 
অবনতি হইতেছে । 
- তত্র দিকপালধন্মী। 

হিন্দুশান্জে ইন্দ্র, চন্দ্র, বায়ু, বরুণ প্রভৃতি দিকপাল দেখিতে 
পাই । সকল দিক রক্ষিত ন! হইলে কোন দ্বিকই থাঁকে না। 
আপনার দ্রিকও যায় । সেই জন্য দিকৃপাল চাঁই। মনুষ্য 
ধ্যেও দিকৃপাঁল-ধন্মণ আছে । গর্দন ও গারিবল্দি উচ্চ শ্রেতীর 
দিকপাল । গর্দন যখন শ্তুদানে ও চীন দেশে যান তখন দিক 
রক্ষার্থ দিকপাল স্বরূপ গিয়াছিলেন। গ্রারিবল্দি যখন গাস্বে- 
ভার রিণবলিকের পক্ষে যুদ্ধ করিতে যাঁন তখন তিনি দিক 
রক্ষার্থ দিকপাল স্বরূপ গিয়াছিলেন। একটা দিক যখন জলিয়! 
যাইবার উপক্রম হয় তখন দিকপাল ররুণ যেমন বারিবর্ষণ 
রিয়া মেই দিকটা রক্ষা করেন, ভেমনি পৃথিবীর এক একটা 
দিক যখন উৎসন্্ন হইবার উপক্রম হইয়াছিল তখন গর্দন ও 
গারিবল্দি দিকপাল স্বরূপ সেই সেই দিক রক্ষা করিতে গিয়া- 
ছিলেন । কিন্ত সত বড় দ্দিকগাল পৃথিবীতে বড় কম । নামান্য 





দেবধ্ম্ণ মানব । ১২৩ 





সংসারধন্থ মানবের অত বড় দিকপালের কথা শুনিয়াও বিশেষ 
লাভ নাই । অতএব সমাজে নিত্য যে সব ছোট ছোট দিক- 
শাল দেখিতে পাওয়া যায় তাহাদের কথা বলাই ভাল । আগে 
আমাদের নমাজে তেমন ছোট ছোট দিকপাল অনেক ছিল। 
রঘুনাথ দিব্য জোয়ান পুরুষ-_বয়ন ৩০৩৫ । রখুনাথ অসহা- 
য়ের সহায়, ছুর্ধলের বল। তোমার বাড়ীতে আজ একটি বৃহৎ 
ক্রিয়া। তোমার লোকবল নাই। রঘুনাথ আসিয়া তোমার 
জিনিসপত্র ক্রয় করিয়। দিল, ঘরবাড়ী পরিষার করাইয়া দিল, 
চালাুল্লী প্রস্তত করাইয়া দিল, লোকজন খাওয়াইয়া দিল। 
দশ দিন ধরিয়! রঘুনাথ এই সব করিল। তুমি রতুনাথকে 
আশীর্বাদ করিলে । রঘুনাথ তোমাকে নমস্কীর করিয়া গিয়া 
তাহার পর দিন হইতে আবার এ দিংহ মহাশয়ের কন্তার বিবা- 
হের আয়োজনে প্রবৃত্ত হইল। রখুনাথ চিরকালই এইরূপ 
করে-শ্রান্তি নাই, ক্লান্তি নাই, অন্ুয়া নাই, অভিমান 
নাই। রঘুনাথকে কি কখনও দেখ নাই? এযে মিত্র 
মহাশয়ের মাতৃত্রাদ্ধে এঁ প্রশস্ত প্রাঙ্গণে সহতধিক লোক 
একেবারে ভোজন করিতে বসিয়াছে, আর এ যে রঘুনাথ-_- 
যুবা রঘুনাথ, দীর্ঘাকার রঘুনাথ, বলিষ্ঠ রঘুনাথ-_-কোমরে 
গামছা! বীধিয়া পৌষ মাসের দারুণ শীতে ধর্্মাক্ত কলেবরে 
অন্থ্র বিক্রমে এ লহত্রাধিক ভোক্তাকে অন্ন ব্যঞ্জন ক্ষীর 
দধি মিঠাই মোড পরিবেশন করিতেছে । প্রশস্ত প্রাক্ষণ তাহার 
পদ তরে টলমল করিতেছে। বল দেখি, রঘুনাথ যথার্থই অগ্নি 
ইন্্র বায়ু বরুণের ন্যায় দিকপাল কিনা । আবার মিত্র মহা 
শরের অন্দরে যাঁও-_নেখানে রঘুনাথের মাকে দেখিবে, তিনিও 


১২৪ ব্রিধারা। 


এক দিকৃপাল। নৃর্য্যোদয়ের পুর্বে শান করিয়া ভিনি রন্ধন 
আরম করিয়াছেন। দ্বাদশটা চুলী জবলিতেছে, রঘুনাঁথের মা 
রন্ধন করিতেছেন। বেল! তৃতীয় প্রহর অতীত, এখনও 
রন্ধন করিতেছেন। কোমরে অঞ্চল জড়ান, মস্তকোপরি কেশ 
চুড়ার আকারে বীধা, মুখ রক্তবর্ণ, শরীর ঘর্্াক্ত_ এখনও রঘু. 
নাথের মা অসীম উৎসাহ্থে অসীম তেজে রন্ধন করিতেছেন । 
মিত্র বাড়ীর গৃহিণী বারশ্বার বলিতেছেন _রহুর মা, এক ফোটা 
চিনির পান! গলায় দিয়। যাও । রঘুর মা এখন উন্মাদিনী, সে 
কথায় তাহার কাণ নাই । বল দেখি, রখুনাথের মা যথার্থ অগ্রি 
ইন্ত্র বায়ু বরধণের ন্যায় দিকৃপাল কি না। 

দিকৃপাল-ধন্মীকে দিবাভাগে কেহ তাহার আপন বাড়ীতে 
দেখিতে পায় নাঁ। পূর্বাহ্ন হউক, অপরাহ্ছে হউক, যখন 
হউক, রঘুনাথের বাড়ীতে গিয়া রঘুনাথকে ভাকিলে । রঘুনাথের 
সাড়া শব্ধ পাইলে না । আবার ভাকিলে, একটি ছেলে আমিয়া 
বলিল _ বাবা বাড়ীতে নাই,ঘোষেদের বাড়ীতে আছেন । ঘোষে- 
দের বাড়ীতে গিয়া দেখিলে রঘুনাথ ভিয়ানশালায় ভোক্তার 
সংখ্যার সহিত হিসাব করিয়া মিষ্টান্সের পরিমাণ ঠিক করিতে- 
ছেন। রঘুনাথ কখন্‌ একটিবার বাড়ীতে আপিয়া চারিটি ভাত 
খাইয়া যায় কেহ জানে না, কেহ বলিতে পারে না। রাত্রিকালে 
দ্িকপালধন্মাঁর নিদ্রা বড় কম । যে নিদ্রাটুকু হয় তাহাও কাক- 
নিদ্রাব, একটা টিকৃটিকির শবে সে নিদ্রা ভাঙ্গিয়া যায়। 
নিদ্রায়ও দিকৃপাল-ধন্মীর কর্ণ চারিদিকে । রাত্রি ঘোর অন্ধকার, 
আকাশ মেঘাচ্ছন্, টিপ্‌টিপ্‌ করিয়া বৃষ্টি পড়িতেছে, মেঘ গর্জন 
করিতেছে, বিছ্বাৎ চম্কাইতেছে। দিকৃপাল রঘুনাথ ঘুমাইয়াও 





দেখ-ধন্তী মানব । 5২৫ 


জাগ্রত। রোদনধ্বনি গুনিয়। বুঝিলেন, অনাধিনী হ্রন্ন্দরীর 
পুত্রটি প্রাণত্যাগ করিয়াছে । অমনি শয্যা ত্যাগ করিয়া আপ- 
মার ন্যায় আরো ২1৩টি দিকৃপালকে ডাকিয়া লইয়া! গিরা, মত 
পুত্রটির সৎকার্ধ্য করিয়া আঁদিলেন । রঘুনাথ দিকপাল বৈকি 
রঘুনাথ দেবতা । কিন্ত রঘুনাথকে আর বড় দেখিতে পাই না। 
রঘুনাথ সভ্য হইয়! কিছু সৌথিন হইয়াছেন। রঘুনাথ এখন 
সর্বত্র উঁকি ঝুঁকি মারেন, কিন্তু ঘাড় পাঁতিবার ভয়ে কোথাও 
আর দেখা দেন না । রথুনাথ এখন বাবু । আমাদের কি কম 
উন্নতি হইয়াছে! 
_ তত্র নারায়ণ-ধম্মী | 

অনন্ত শয্যা-শায়ী নারায়ণ স্বয়ং কিছু করেন ন1। তিনি সেই 
অনন্ত শয্যায় শয়ন করিয়া এক রকম নিদ্রিত বলিলেও হয় । সব 
জানেন, সব দেখেন, কিন্তু নিদ্রিত। দেবতারা যখন বিপদে 
পড়েন, কি করিলে বিপদের শাস্তি হয় ঠিক করিয়া উঠিতে 
পারেন না, তখন তাহারা নারাঁয়ণের নিকট গমন করেন, এবং 
তাহার পরামর্শ লইয়া! বিপদ খণ্ডন করেন। গ্রামবৃদ্ধ গুরুচরণ 
সরকার মহাশয়ও নারায়ণ-ধন্মা। তাহার বড় একটা| নড়া চড়া 
নাই। দিবা রাত্রি সেই বহির্বাটার বৈটকখানার ঘরটির ভিতর 
বসিয়া আছেন। একথানি মাছুরের উপর একখানি ক্ষত্র 
তোষক, তদুপরি বসিয়া আছেন । সম্মুখে একটি হু কা, তাহাতে 
একটি পাতার নল। এক পাশে একটি জলপাত্র, তছুপরি এক 
খানি প।ট-করা গাম্ছ' । ঘরের দেয়ালে ছুই চারিখানি ঠাকুর- 
দেবতার পট। ঘরে সর্বদাই ছুই একটি লোক আছে । গ্রামের 
ছোট বড় সকলেই তীহার নিকট পরামর্শ লইতে আইনে । তিনি 





৮২৬ ত্রিধারা 





গ্রামের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ও প্রবীণ এবং থামে সকল 
লোকের মকল কথাই জ্ানেন। তিনি গ্রামের মধ্যে গ্রামের 
সর্বজ্ঞ ও গ্রামের ত্রিকালজ্ঞ পুরুষ। তাই সকলেই তাহার পরা- 
মর্শ লইতে আইসে। তিনিও তাহাদের সমস্ত কথা সমস্ত ইতি- 
হাস জানেন, তাহারাও তাহাকে সকল কথা খুলিয়া বলে, 
তাহার নিকট হইতে কোন কথ! গোপন করে না, গোপন করা 
প্রয়োজনও মনে করে না। তাহার নিকট হইতে গোপন 
করিবার কোন কথাও তাহাদের নাই। যাহার। শাপ্্রানহ্সসারে ও 
গ্রামবৃদ্ধদিগের দৃটান্ত ও উপদেশাহ্সারে সংসার-ধর্শা করে, 
তাহাদের কাহারো নিকটে গোপন করিবার কোন কথা থাকে 
না। তাই গ্রামবৃদ্ধ সরকার মহাশয় বাল্যকাল হইতে তাহাদের 
সকলের সকল কথ জানিয়! আসিয়াছেন এবং তাহার পিত! 
পিতামহের নিকট তাহাদের সকলের আগেকার সকল কথা 
শুনিয়াছেন। এখনকার মতন লেকের ঘরের কথা জানিয়া 
তাহাদের কুৎসা রটাইবার জন্য জানেন নাই। সছুপদেশ দিয়! 
তাহাদিগকে সৎ্পথে রাখিবেন বলিয়া তাহাদের সকল কথা! 
জানিয়াছেন। তাই ভাহারাও তাহার কাছে কোন কথা গোপন 
করে না এবং তিনিও সকল কথা! শুনিয়! ঠিক পরামর্শ দিয়া 
তাহাদের অশেষ কল্যাণ সাধন করেন। সর্বজ্ঞ না হইলে 
বিধাতা হওয়া যায় না। নারায়ণ সর্বজ্ঞ বলিয়া জগতের 
বিধাতা এবং দেবতারাঁও তাহার নিকট ঠিক পরামর্শ পান। 
গ্রামবৃদ্ধ মরকার মহাশয়ও গ্রাম সম্বন্ধে সর্কজ্ঞ। তাই তিনি 
গ্রামের বিধাতা এবং গ্রামের সকল লোকই তাহার নিকট ঠিক 
পরামর্শ পায় । সামান্য মংসারী লোকের পক্ষে তেমন একট! 


দেব-ধন্ষী মানব । ১২৭ 





বিধাতা বা পরামর্শদাতা থাকা কি কম ন্বখ ও সৌভাগ্যের 
কথা? ইউরোপ বলেন এবং আমরাও ইউরোপের দেখাদেখি 
বলিতে আরম করিয়াছি যে, আপনার বিষয়কর্টে আপনিই 
আপনার উৎকৃষ্ট পরামর্শদাতা, অন্যে ঠিক পরামর্শ দিতে পারে 
না। এ কথার গুঢ় অর্থ এই যে, ইউরোপে কেহ কাহাকে 
আপনার প্রকৃত মঙ্গলাকাজ্ফী বলিয়া বুঝে না এবং সেই জন্ 
কেহ কাহাকে বিশ্বাস ও. ভক্তি করিয়া আপনার সকল কথা! 
খুলিয়া বলে না। এই কারণে ইউরোপীয় সমাজে কেহ গ্রাম- 
বৃদ্ধ সরকার মহাশয়ের ন্যায় সর্বজ্ঞতা লাভ করিতে পারে ন! 
এবং সেই জন্ত ঠিক পরামর্শও দিতে পারে না। তাই ইউরো- 
পীয় সমাজে নারায়ণ ব1 বিধাতা-ধন্মী মানুষ দেখিতে পাওয়া 
যায় না। ছুঃখের বিষয় আমাদের সমাজও ইউরোপীয় সমা- 
জের সমান হইয়া আমিতেছে। আমাদের শিক্ষিত সমাজে 
নারায়ণ-ধম্ম্শ মালষের আর স্থান নাই। আমর! ধর্শান্থপারে 
চলি না। তাই আমরা কাহাকেও আমাদের সকল কথা 
খুলিয়া বলিতে পারি না এবং সেই জন্ত কেহ আমাদিগকে ঠিক 
পরামর্শ দিতে পারেন না । অগত্যা আপনি আপনার পরামর্শ 
দাতা হইলে যে তুল ভ্রান্তি হয় তাহার বিষময় ফল ভোগ 
করিতেছি । এবং আপনি আপনার পরামর্শদাতা হইয়া আপন 
আপন বিদ্যা বুদ্ধিকে এতই শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করিতে অত্যন্ত হই- 
তেছি যে অন্তে ঠিক কথা বলিলেও তাহা ঠিক বলিয়া বুঝিতে 
ও স্বীকার করিতে অক্ষম হইতেছি এবং আপনার তুল ভ্রান্তি 
হইলে আপনাকে ভ্রান্ত বলিয়া বুঝিতে অশক্ত হইতেছি। 
ইহার অপেক্ষা উন্নতির প্রতিকূল অবস্থা আর কি হইতে 


১২৮ ত্রিধারা 


পারে? নারায়ণ-ধস্বা মনথব্য হারাইয়া আমরা দৈব-বল 
হারাইতেছি। 3 
আমরা লেখাপড়া করিতেছি, গাড়িঘোড়া চড়িতেছি, 
পুস্তকপ্রবন্ধ লিখিতেছি, সমাজসংস্কার করিতেছি, নংবাদগত্র 
লিখিতেছি, এখানে যাইতেছি ওখানে যাইতেছি, সভা সমিতি 
করিতেছি, বড় বড় বক্ততা করিতেছি। এত তাড়াতাড়ি এত 
কাণ্ড করিলে মকল দেশে সকলেরই মনে হয়, কতই উন্নতি 
করিতেছি। কিন্ত একবার নিশ্বান ছাড়িয়া স্থির হইয়া বসিয়া 
ভাবিয়া দেখা উচিত যে আমরা প্রকৃত পক্ষে উন্নত হইতেছি 
না অবনত হইতেছি--আমাদের মধ্যে যে দেবচরিত্র ছিল, যে 
দেবচরিত্র মাষের সর্বোৎকৃষ্ট সম্পদ ও আভরণ সে দেবচরিত্র 
লয় প্রাপ্ত হইতেছে কি পূর্বাপেক্ষা স্কুপ্তি লাভ করিতেছে। 
আমি কিছুরই বিরোধী নহি-_গাড়িঘো ড়া, পুস্তক প্রবন্ধ, সমাজ 
ংস্কার, সভাসমিতি_-কিছুরই বিরোধী নহি। কিন্তু সে সমস্ত 
পূর্ণ মাত্রায় পাইয়াও যদদি সেই দেবচরিত্র হারাই, তবে অবস্ই 
বলিব আমাদের সে সব পাওয়া বৃথা হইল। মেসবপাইয়া 
আমাদের লাভ কিছুই হইল না, বরং মর্শঘাতী ক্ষতি হইল । 





পাপপুণ্য। 


৯পাশিহিকিত বাসি 


পুণ্য কিসে হয়, পাঁপ কিসে হয়,এই প্রশ্ন আজকাল কাহারো! 
কাহারো মুখে শুনিতে পাওয়া যায়, দশ পনর বৎসর পূর্বে বড় 
একটা শুনা যাইত না। এখন ধীহারা এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন 
তাহার! পূর্বের প্রশ্নকারিদিগের স্তায় তর্ক করিবার জন্য জিজ্ঞামা 
করেন না। পাপপুণ্যের প্রকুতি বুঝিয়া ধর্মপথে চলিবার বাসনা- 
তেই জিজ্ঞাসা করেন বলিয়া বোধ হয়। তাঁকিকের সহিত ধর্ম 
সন্বন্ধীয় কোন কথাই চলে না, এবং বোধ হয় যে কোন কথা! 
হওয়াও উচিত নয়। ধর্মকথাকে তর্করূপ ক্রীড়া বা কৌতুকের 
বিষয় হইতে দেওয়। অধর্্ম। ধর্মপিপাস্থর সহিতই ধর্মকথা 
কহিতে হয়। অতএব বাহার! ধর্্পিপান্থ হইয়া গাপপুণ্যের 
প্রকৃতি বুঝিতে ইচ্ছা৷ করেন তীহাদিগের জন্যই এই প্রবন্ধটি 
লিখিলাম। 
কিসে পুণ্য হয় এবং কিসে পাপ হয় ভিন্ন ভিন্ন দেশে ও ভিন্ন 
- ভিন্ন ধর্মশাস্তরে এ প্রপ্ণের ভিন্ন ভিন্ন উত্তর পাওয়া যায় এবং 
দার্শনিকেরা প্রায় সর্বত্রই এই প্রশ্ন লইয়া বিষম গণ্ডগোল করিয়া 
থাকেন। সেই সকল উত্তর ও দার্শনিক মতের সমালোচন 
নিশ্রয়োজন। ধর্মের পথ মোজা, তর্কজালে আকীর্ণ নয়। অতএব 
যে নকল ধর্মপিপাস্থ পাপপুণোর প্রকৃতি জানিতে ইচ্ছা কলেন 
তাহাদিগকে সোজা উপায়ে পাপপুণ্যের প্রকৃতি বুঝাইতে চেষ্টা 
করিব। সে সোজা! উপায়, হিন্দুধর্ম পাপপুণ্য কাহাকে বলে 
তাহাই বুঝিয়! দেখা। 


ও 


. ১৩৩ ত্রিধার! । 





একটু অভিনিবেশ সহকারে আমাদের ধর্শশান্্র পাঠ করিলে 
বুঝিতে পার' যায় যে আমাদের শান্ত্রকারদিগের মতে যে কাধ্য 
মুক্তির অনুকুল তাহ পুণ্য এবং যে কার্ধ্য মুক্তির প্রতিকূল তাহা 
পাপ। অতএব পাপপুণ্যের প্রকৃতি বুঝিতে হইলে মুক্তি 
কাহাকে বলে তাহা অগ্রে বুঝিয়া' দেখা আবশ্তক। মুক্তির 
অর্থ জীবাম্মার প্রকৃতি পরিত্যাগ বিনাঁশ বা অতিক্রম করিয়া 
পরমাস্মার প্রকৃতি লাভ করা। জীব বা মনুষ্য সাধারণতঃ 
নানা ইন্দ্রিয়ের বশ, হিংসা দ্বেষ লোভ মোহ প্রভৃতি নানা 
ছুপ্রবৃত্তির অধীন, বিষয় বাসনা যশোলিপ্পা প্রভৃতি নানা কাম- 
নায় উত্তেজিত। অতএব সাধারণ জীব ব1 মনুষ্য কখনও স্বৃথ 
ভোগ করে, কখনও ছুঃখ ভোগ করে, কখনও উল্লসিত, 
কখনও বিসন্ন, কখনও আহ্লার্দে গদগদ, কখনও শোকে 
অভিভূত, কখনও ্বচ্ছন্দভোগী, কখনও যন্ত্রণায় অস্থির, 
কখনও হিংসায় জরজ্বর, কখনও ক্রোধে অগ্রিবৎ প্রজ্ছলিত, 
এই রূপ মুহূর্তে মুহূর্থে ভিন্ন অবস্থাপন্ন । যাহার মনের অবস্থা 
মুহর্থে মুহর্তে পরিবর্তন হয়, যে মুহুর্তে মুহূর্তে মোহে আচ্ছন্ন, 
শোকে অভিভূত, ক্রোধে জ্ঞানশৃন্য বা লোভে মুগ্ধ হয়, সে কখ-" 
নই প্রকৃত স্থখ ভোগ করিতে পারে না, আপনাকে আপনি 
জানিতে পারে না, আপনাকে আপনি পরিচালিত করিতে 
পারে না, স্থিরপ্রতিজ্ঞ হইয়া সৎকর্্ণ বা ধর্চর্য্যা করিতে 
পারে না । সে এই মূহর্তে যে ব্যক্তি পর মুহূর্তে তাহা হইতে 
ভিন্ন ব্যক্তি। তাহার অস্তিত্ব ইন্দ্িরপ্রধান পশুর অস্তিত্ব হইতে 
বড় ভিন্ন নয়। অতএব আমাদের শান্বকারদিগের মতে 
জীবপ্রকৃতি বা জীবের অস্তিত্ব বড়ই হেয় বড়ই অপকৃষ্ট। এবং 


গাপপুণা । ৯৩৯ 


ধাহার বুদ্ধি ও সদৃত্তির কিঞ্চিন্মাত্র উদ্রেক হইয়াছে বোধ হয় 
তিনি স্বীকার করিবেন যে এরপ প্রকৃতি বা অস্তিত্ব প্রকৃত 
পক্ষেই বড় অধম । শুধু আমাদের মধ্যে নয়, সকল দেশেই 
জ্ঞানীও ধার্শিক লোকেরা এরপ প্রকৃতি বা অস্তিত্বকে অধম মনে 
করিয়া থাকেন এবং এরপ প্রর্কতি বা অস্তিত্ব পরিত্যাগ করিয়। 
ইছার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ প্রকৃতি বা অস্তিত্ব লাভ করিতে চেষ্টা 
ফরেন। আমাদের শান্্রকীরদিগের মতে ব্রহ্মপ্রকূতি বা 
ত্রন্মের অন্থরূপ প্রকৃতিই সেই শ্রেষ্ঠ প্রকৃতি এবং ব্রদ্দের অস্তিত্ব 
বা ত্রন্মের অস্তিত্বের অন্থরূপ অস্তিত্বই সেই শ্রেষ্ঠ অস্তিত্ব । এখন, 
ত্রন্ষের অর্থ চ্চিদাননা-_সৎ, নিত্য পরিবর্তন-বিবর্জিত অস্তিত্ব $ 
চিৎ, বিশুদ্ধ ভ্রমশৃন্ত বিমল চৈতন্য ; আনন্দ, নির্মল নিরাধার 
নিত্য আনন্দ। মন্ুষ্যের ভাষায় ব্রন্মের অর্থ নির্দেশ করা যায় 
না, ত্রহ্মপনার্থ মুক্তমন্গষ্যের আত্মাতেই উপলব্ধ । তথাপি 
ব্রদ্মের যে মোটামুটি অর্থ করিলাম তাহা গ্রহণ করায় ক্ষতি 
নাই। 

এখন একটু চেষ্টা করিলেই বুঝা যাইবে যে জীবপ্রকুতি ও 
ব্রহ্মপ্রকৃতির মধ্যে প্রধান প্রভেদ এই যে পরিবর্তনশীলতা 
বা অনিত্যতা, আচ্ছন্নতা ও বিকারগ্রস্ততা জীবপ্রকৃতির * লক্ষণ 
এবং তদ্বিপরীত পরিবর্তনীভাঁব বাঁ নিত্যতা, নির্শলতা ও 
নির্ককীরত্ব ব্র্মপ্রকৃতির লক্ষণ । ধাঁহারা জীবপ্রকৃতি দমন 
করিয়া ধর্মপথে অগ্রসর হন তীহারা ভিন্ন আর কেহ এই প্রতেদ 
বিশিষ্টরূপে বুবিতে বা উপলব্ধি করিতে পারেন না। কিন্তু 
অগরকেও এই প্রভেদের কতকটা আভাস দিবার চেষ্টা কর! 
মাইতে পারে । ক্ষণেক নুর্যালোকোন্দীগ্ত, ক্ষণেক ঘন কৃষ্ণ 


১৩২ তরিধারা। 


মেঘচ্ছায়ায় ভামসীকৃত, ক্ষণেক নির্মল নিফম্প, ক্ষণেক বাত্যা- 
দ্দোলিত আবিলসলিলা সরোবর--এই এক জিনিস, ইহা জীব- 
প্রকৃতির অন্থরূপ ; আর চিরাঁলোকিত, চির নির্ল, চির নিফম্প 
চিরপ্রফুল্ল সরোবর-_-এই এক জিনিস, ইহ ব্রন্ষপ্রকৃতির অন্থুরূপ। 
ধাহার শরীর সর্বদা কগ্ন, যিনি সর্বদা রোগের নানাবিধ যন্ত্রণা 
ভোগ করেন, জীবপ্রকৃতি ফি ধরণের জিনিস তিনি হয়ত বুঝি- 
বেন,আর তাহার শরীর যদি কখনও নিরোগ হয়, এমন কি একটা 
মুহূর্তের নিমিতও যদ্দি আর তাঁহাকে অতি সামান্য শিরঃগীড়ার 
যন্তরণাও জানিতে না হয় তাহা হইলে ব্রন্গপ্রূতি কি 
ধরণের জিনিস তিনি হয়ত বুঝিবেন ৷ এক সময়ে কামক্রোধাদির 
তাড়নায় কখনও জর্জরিত, কখনও প্রজ্জবলিত, কখনও জ্ঞানত্রষ্, 
কখনও শোঁকীচ্ছন্ন, কখনও ব্যাকুল, কখনও উন্মত্ত, কখনও 
হতাঁশ, কখনও উল্লমিত, কখন চিন্তানিমজ্জিত হইবার পর যিনি 
বয়োধিক্য বশত ব) আত্মসংযমের গুণে দেহের মনের হৃদয়ের 
নিরবচ্ছিন্ন প্রশান্ত ভাব অনুভব করেন জীবপ্রকৃতি কি ধাতুর 
জিনিস এবং ব্রন্ধপ্রকৃতি কি ধাতুর জিনিস তিনি হয়ত কিঞ্চিৎ 
কুঝিবেন। যে টুকু বুঝিবেন সে কিছুই নয় বলিলেই হয়, কারণ 
জীবপ্রকৃতি হইতে ব্রন্ষপ্রকুতির প্রভেদের পরিমাণ যথার্থই 
অপরিমীম এবং অপরিসীম সাধন] ব্যতীত তাহা৷ উপলব্ধ হইবার 
নয়। আমাদের ন্তায় সাধনাহীন লোকের দ্বারা উপমার সাহায্যে 
তাহা উপলন্ধ হওয়! এক রকম অসম্ভর। তথাপি উপমাদি ছারা 
যতটুকু হদক্ষম হয় ততপ্রতি লক্ষ্য রাখিয়া! বুঝিতে হইবে ষে 
আমাদের শাম্কারদিগের মভে ধম জীবপ্রকৃতি পরিত্যাগ 
করিয়! অপূর্ব রহ্মপ্রকৃতি লাভ করার নাম মুক্তি। 


পাঁপপুণ্য । ১৩৩ 





পূর্ব বলিয়াছি যে আমাদের শান্্কারদিগের মতে যে কাঁধ্য 
মুক্তির অনুকুল তাহাই পুণ্য এবং ষে কার্ধ্য মুক্তির প্রতিকূল 
তাহাই পাপ। অতএব এখন বল! যাইতে পারে যে যে কার্ধ্য 
মান্থষকে ত্রদ্মের নিকটবর্তী করে বা মানের জীবপ্রকৃতিকে 
্রহ্মপ্রকুতির অনুরূপ করিয়া তোলে তাহ পুণ্য এবং যে কার্য 
মানুষকে ব্রন্ম হইতে দূরে লইয়! যাঁয় ব! মানুষের জীবপ্রকৃতিকে 
ত্রন্ম প্রকৃতির বিপরীত করিয়া তোলে তাহা পাঁপ। অর্থাৎ ষে 
কার্ধ্য মান্ষের আবেশ-আচ্ছন্নত।-পরির্নশীলতাপূর্ণ প্রন্ৃতি 
নষ্ট করিয়া! তাঁহাকে জ্ঞানালোকপূর্ণ আক্ষেপ-আঁবেশ-বিবর্জিত 
নির্ব্বিকার নিত্যত্ববোধক প্রকৃতি লাঁভ করিতে সক্ষম করে তাহা 
পুণ্য এবং ষে কা্ধ্য মানুষের আবেশ-আঁচ্ছন্নতা-পরিবর্তনশীলতা- 
পূর্ণ প্রন্ততিকে আরে। আঁবেশ-মীচ্ছন্নতা-পরিবর্তনশীলতা পূর্ণ 
করে তাহা পাপ। মোট. কথ! এই ষে আমাদের শান্কারদিগের 
মতে ব্রহ্ম মন্য্যেব চরম আদর্শ এবং যে কার্ধ্য মন্ুষ্যকে সেই চরম 
আদর্শনুসারে আপন চরিত্র বা প্রন্তুতিকে উন্নত করিতে সক্ষম 
করে তাহা পুণ্য এবং যে কাধ্য মন্ুযাকে সেই চরম আদর্শানুসারে 
-আপন চরিত্র বা প্রকৃতিকে উন্নত করিতে অক্ষম করে তাহা 
পাপ। হিনুশান্ত্রে পাপপুণ্যের অন্য অর্থ নাই। কিন্তু দুঃখের 
বিষয়, আমাদের মধ্যে অনেকেই এখন এই অর্থে পাপপুণ্য 
বুঝেন না, বড় ভিন্ন অর্থে বুঝেন । এখন অনেকে পুণ্যের সহিত 
চরিত্রের বা মানসিক প্রকৃতির উন্নতির সংস্রব বা সম্পর্ক বুঝেন 
না ও দেখেন না। চরিত্র ভাল হউক আর নাই হউক, মনে 
পাপ থাকুক আর নাই থাকুক, গঙ্গান্সান করিলেই পুণ্য হয়, 
ভীর্থদর্শন করিলেই পুণ্য হয়, উপবাস ব্রত করিলেই পুণ্য হয়__: 
১২ 


১৩৪ ত্রিধায়া। 





অনেকেরই এইরূপ সংস্কার। কিন্তু ইহার অপেক্ষা ভ্রান্ত ও 
অনিষ্টকর সংস্কার আর হইতে পারে না। এই বিষম অনিষ্টকর 
সংঙ্কারের বশবর্তী হইয়া পুণ্য সঞ্চয় করিবার চেষ্টা করি বলিয়া 
আমাদের মধ্যে প্রকৃত পুণ্যের এত অভাব এবং ধর্শচর্ধ্যা দ্বার 
চরিত্রের উৎকর্ষ লাভ এত কম । গঞ্গাক্সান করিলে পুণা হয় 
একথা সত্য-_কিন্তু গঙ্গ। কি জিনিস, গঙ্গার উৎপত্তি কোথায়, 
লয় কিসে, গঙ্গার সলিলের সহিত ভারতের সভ্যতার কি 
ংযোগ, ঘুগযুগান্তর হইতে গঙ্গার সলিল ভাঁরতবাদীর কি 
উপকার করিতেছে--এই সকল উচ্চ ও সুন্দর ভাবে ভোর 
হইয়] গঙ্গাত্সান না! করিলে গঙ্গান্নান করিয়া কি মন উন্নত 
ও বিশুদ্ধ হয়, না পুণ্য সঞ্চয় করা যায়? তীর্ঘদর্শন সম্বন্ষেও 
এই কথা খাটে, বারত্রত সন্বন্বেও এই কথা খাটে। তীর্থদর্শন 
করিতেও চিন্তদংঘম চাই, বাঁরত্রতাদি করিতেও চিত্তমং্যম চাই | 
তীর্থদর্শনের ফলম্বরূপ চিত্তের বিশুদ্ধতা হওয়া বা বৃদ্ধি হওয়া! 
চাই। বারত্রতাঁদির ফলন্বরূপও চিত্তের বিশুদ্ধতা হওয়া বা বৃদ্ধি 
হওয়া চাই । নিলে তীর্ঘদর্শনেও পুণ্য হয় না, বারব্রতাদিতেও 
পুণ্য হয় না। এই কথাগুলি হ্থাদ়ঙ্গম করা এখন আমাদের বড়ই 
আবশ্ঠক হইয়া উঠিয়াছে। কারণ এই কথাগুলি বিস্বৃত হওয়াঁতেই 
এত ধর্মচর্ধ্যা সত্বেও আমাদের মধ্যে প্রকৃত পুণ্য বা ধার্টিকতা 
এত কম হইরা পড়িয়াছে। এই বিষয় সম্বন্ধে আমাদের সমাজে 
সংস্কণর বড়ই প্রয়োজন হইয়াছে । জ্ঞানী ও ধার্শিক মাত্রেরই এই 
গুরুতর সংস্কারে প্রাণপণে নিযুক্ত হওয়া! আবশ্তক  দকলে আপন 
আপন পরিবারে এই সংস্কার সাঁধনে যত্রবান হইলে ইহা সহজেই 
লংসাঁধিত হইবে । এ সংস্কার মাধন করিবার ইহাই প্ররুষ্ট প্রণালী । 


পাপপুণয। ১৬৫ 





পুণ্য নশ্বন্ধে যেমন পাপ লম্বদ্ধে ও আমর! তেমনি ভ্রান্ত 
নংস্কারের বশবর্ভা হইয়াছি। আমরা মনে করি যে যদি আমরা 
কেবল অখাদ্য ভক্ষণ না করি, ঠাকুর দেবতাকে প্রণাম করি, 
সংক্রান্তিতে ত্রাহ্ষণ ভোজন করাই ভাহা হইলে দুর দ্বারা 
আমাদের চিত্ত কলুষিত ও বিকারগ্রস্ত হইলেও. আমাদের 
পাপাচরণ করা হয় না। আমর! ইহাও মনে করি যেপাপ 
করিয়া! ছুই কাহন কড়ি উৎসর্ণ করিলেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত 
হয় এবং পাপ হইতে মুক্তিলাভ করা যায়। এই ছুই সংক্কারই 
যার পর নাই ত্রান্ত ও অহিতকর। চিত্রশুদ্ধি লাভার্থ খাদ্যা- 
খাদ্যের বিচার বড় আবশ্তক। কিন্তু তাই বলিয়। চিত্তের 
কনুবনাশের প্রতি দৃষ্টি না রাখিয়া কেবল অথাদ্য তক্ষণে 
বিরত থাকিলেই যে পাপ ম্পর্শ করে না তাহা নয়। সেইরূপ 
এ কথাও ঠিক যে দেবতার প্রতি প্রকৃত ভক্তিমান না হইয়] 
দেবমৃদ্তির নিকট কেবল মাথা হেট করিলেই যে পাপ স্পর্শ 
করে না তাহা নয়। আবার পাপ করিয়! অর্থাৎ চিত্তের 
বিশুদ্ধতা হারাইয় পুনরায় চিত্তের বিশুদ্ধতা লাভ না করিয়া 
"কেবল কয়েক কাঁহন কড়ি উৎসর্গ করিলেই যে পাপের প্রায়- 
শ্চিত্ত হয় তাহ! নয়, এবং শান্ত্রেও এমন কথা বলে না ।. অত- 
এব এই সকল বিষম অনিষ্ককর কুসংস্কার নাশ করা বর্তমান 
কালে আমাদের সংস্কার কার্যের প্রধান উদ্দেশ্ত হওয়া উচিত। 
এ সংস্কার প্রতি গৃহে প্রতি দিন শান্্রকথা ও সছুপদেশ 
দ্বারা সম্পন্ন করিতে হইবে। অন্ত উপায়ে এ সংস্কার সহজে 
সংসাধিত হইবে না। এ সংস্কার গুরুপুরোহিতাদি দ্বারা 
হওয়াই উচিত। কিন্তু তাহারা এমন যেরূপ অপদার্থ হইয়। 


১৩৬ ত্রিধারা 1 


১২০০০০০০০১৪ 
পড়িয়াছেন তাহাতে তাহাদের দ্ব'রা এ সংস্কার সম্পন্ন হওয়া 
অসম্ভব । 
অন্ঠান্তি ধর্শশান্ত্রে বলে যে মানুষ পাঁপপুণ্যের নিমিত্ত জগ- 
দীশ্বরের নিকট দায়ী বা 'জবাবদিহি' করিতে বাধ্য। কিন্ত 
হিন্দুশান্ত্ান্ছসারে পাপপুণ্যের যে অর্থ তাহা বিবেচন! করিলে 
বুঝিতে পারা যায় যে মানুষ পাপপুণ্যের নিমিত জগদী- 
স্বরের নিকট দায়ী বা “জবাবদিহি” করিতে বাধ্য নয়। 
ফলতঃ হিন্দুশান্রানসারে চিত্ত ও চরিত্রের উন্নতি ভিন্ন পণ্যের 
অন্ পুরক্কার নাই এবং চিত্ত ও চরিত্রের অবনতি ভিন্ন পাঁপের 
অন্য দণ্ড নাই। পুরণাদিতে ্বর্গভোগ, চন্দরলোকপ্রান্তি, নক্ষত্র- 
লোকপ্রাপ্তি প্রভৃতি পুণ্যের যে সকল পুরস্কারের কথা আছে 
এবং নরকভোগ শৃগালযোনিপ্রাপ্তি, কীটযোনিপ্রাপ্তি প্রভৃতি 
পাপের যে সকল দণ্ডের কথ! আছে তাহার প্রকৃত অর্থ চিত্র 
উত্তম ও অধম অবস্থার ভিন্ন ভিন্ন পর্ধ্যার মাত্র । সামান্য ও নিরক্ষর 
লোকের শিক্ষার্থ তাহা চিত্তের অবস্থা হইতে স্বতন্ত্র পদার্থ রূপে 
বর্ণিত। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তাহা চিত্তের অবস্থা হইতে স্বতন্ত্র কিছু 
নয় । অতএব হিনুশান্রানুসারে মান্য আপন পাপপুণ্যের নিমিত্ত 
আপনারই নিকট দায়ী। আপন পাপপুণ্যের নিমিত্ত আপনারই 
নিকট দায়ী করিয়া হিন্দুশান্র মানুষকে যত বড় যত মর্ধ্যাদাবান 
করিয়াছে অন্য কোন শান্তর তত করে নাই৷ এই মহত্ব ও মর্যাদা 
মনে করিয়া আপনার নিকট আঁপন পাপপুণ্যের দায়িত্ব সন্বন্ধে 
জয়লাভার্থ হিন্দুমাত্রেরই প্রাণপণে চেষ্টা করা কর্তব্য । 
পাপপুণ্য সম্বন্ধে আর একটী বিষয়ে হিন্দুশান্্ ও অপরাপর 

শান্্বের মধ্যে গুরুতর প্রভেদ আছে। আন্তান্য শান্বান্থসীরে 


পাপপুণ্য । ১৩৭ 





পাপপুণ্য মাহ্ছষের সকল কাজ নশ্বদ্ধে হয় না, কতকগুলি 
কাজ সম্বন্ধেই হয়; খাওয়া পরা ঘুমান বেড়ান প্রভৃতি সম্বন্ধে 
হয় না, চুরি করা খুন করা মনোকষ্ট দেওয়! প্রভৃতি সম্বন্ধে 
হয়। কিন্ত হিন্দুশান্্াহগসারে পাপপুণ্য সকল কাজ নন্বন্ধেই হয়। 
অপরিমিত ভোজনে পীড়া হয়, গীড়া৷ হইলে চিততস্টৈর্য নষ্ট হয়, 
চিন্তস্থরধ্য নষ্ট হইলে চিত্তবিকার জন্মে, চিত্তবিকার জন্মিলে মানুষ 
চরম আদর্শ হইতে দূরে গিয়া পড়ে । অভএব পানভোজনাদির 
অনিয়ম পাপ এবং পানভোজনাদিতে সংযম পুণ্য। এমন 
সার ও ন্ন্নর কথ! আর কোন ধর্শশান্ে শুন। যাঁয় না। 
আমার বোধ হয় যে আমাদের শান্তে পাপপুণ্যের যে মান, . 
কষ্টি বা ৪627021 নির্দিষ্ট হইয়াছে তদপেক্ষা সহজ ও সুন্দর 
মান; কষ্টি বা 9620050 অন্য কোন শাস্ত্রে নির্দিষ্ট হয় নাই। 
এক একটা কাজ ধরিয়া বিচার করিলে দেখা যায় যে পাপপুণ্য 
নিরূপণ করিতে হইলে আমাদের শাস্ত্রের নির্দি্ মান বা কষ্টি 
প্রয়োগ করিলে নিরূপণ কার্ধ্য যত সহজ হয়, 0089010209 ঝ 
. বিবেকের মাঁন বা কষ্টিই বল, ৪11 বা উপকারিতার মান বা 
ক্টিই বল, 10119 7111] বা ঈশ্বরেচ্ছার মান বা কষ্টিই বল অন্ত 
কোন মান বা কষ্টি প্রয়োগ করিলে তত সহজ হয় না। 0৮15 
বা! 101%105 ছা] খুঁজিয়া নিরূপণ করিতে হয়। সে অন্থসন্ধান 
বড় জটিনন এবং তাহার ফলও সকলের পক্ষে সমান হয় না। 
কেহ এক সিদ্ধান্তে উপনীত হন কেহ অন্ত দিদ্ধান্তে উপনীত 
হুন। কিন্ত মনের উপর কার্্যের ফলাফল মনেই অনুভূত হয়। 
অতএব মনের উপর কার্য্যের ফলাফল দৃষ্টে পাপপুণ্য নিরূপণ 
করা অতি সহজ। যে কেহ কিছুদিন যুহকারে আপন 


১৩৮ ত্রিধারা। 


মনের উপর আপন কার্ধ্ের ফলাফন নক্ষ্য করিলে কোন্‌ 
কার্ধ্যে পুণ্য হয় কোন কার্ষ্য গাপ হয় সহজেই নিরূপণ করিতে 
পারিবেন। 





পরিশিষ্ট । 





জন্তধন্মী মানব । 





গঙ্ডিপ্রবর বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রসাদে বাঙ্গালি বালক 
“বোধোদয়” হইবামাত্র জানিতে পারে,--যে, মনুষ্য একটি 
জন্ত-বিশেষ। তাঁহার পর, আর দশ বতমর না যাইতেই করুণী- 
ময়ী ঠাকুরমার প্রসাদদে যখন একটি পষ্ট-বাস-জড়িত, হরিস্্রীঁ 
রঞ্জিত নয় বংসরের বালা-জন্ব আপনার শয্যা-ভাগিনী রূপে 
প্রাপ্ত হয়, তখন নরনারীর পশুভাব মে আপনার হাড়ে হাড়ে 
বুঝিতে থাকে । তাহার কিছু দিন পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি- 
গ্রস্ত যুবা_-ডারউইনের মন্ত্রশিষ্য। মন্গুষ্যের পশুত্ব--এখনত 
বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত । কাজেই স্বদেশী বিদেশী মহামহা। পণ্ডিত- 
গণের নির্দেশ অনুসারে, আর পিতামহীর প্রথর দৃতীত্বে, 
অনেকেই বুঝিয়াছেন, যে আঁমরা একরূপ জন্ত বিশেষ ;? আমরা 
নিতান্তই পশু-ধর্মাী। আমরা সেই পুরাণ কথাটা আবার নূতন 
করিয়া বলিবার চেষ্টা]! করিব,_-তোমরা কেহ রাগ করিও ন৯; 
করিলে, আমাদের কথাই প্রতিপন্ন হইবে ; রাগ__পশু-ধর্্ম। 
আর রাগই বা করিবে কেন? বালক কাল হইতে উপধু্পরি 
এত শিক্ষা পাইয়াও, যদি? মহুষ্যের পশুত্বে তোমার দনদেহ থাকে 
তবে তোমার গৃহ প্রতিটিত ই্টদেবতার সগ্মুথে এই প্রবন্ধ পাঠ 
করিও, তিনি অবশ্ত “বিশেষণে সবিশেষ” তোমাকে বুঝাইয়া 
দিবেন। ভাহাতেও যদি কিছু সনেহ অবশিষ্ট থাকে, তবে 
এই প্রবন্ধ লেখকের সহিত একবার দেখা করিও) সকল দন্দেহ 
মিটিয়া যাইবে। 


১৪২ ত্রিধারা 





ক্ুগ প্রভৃতি নানারূপ মন্থয্য অন্ত আছে। সকল প্রকার পশু 
্মাঁর বা পক্ষা-ধস্মীর লক্ষণ বুকাইতে গেলে পুবী বেড়ে যায় ? 
আমরা ছুই একটি উদাহরণ দিব মাত্র। বিচক্ষণ পাঠক পাঠিকা 
স্বজন বন্ধু বান্ধবের সহিত জু-বাগানে গিয়া ষঈকের লহিত আম- 
দানি মিলাইয়া ক্ষোভ মিটাইবেন। 
_ তত্র পক্ষী-ধন্্ী। 

প্রথমে, পুরাণেতিহাস প্রসিদ্ধ, সর্ব-পরিচিত শুকপক্ষীকেই 
দৃষ্টান্ত স্বরূপে গ্রহণ করা যাউক। 

শৌকেয় শ্রেণীস্থ মনুষ্য দেখিলেই বলা যায়। এই শৌকেয় 
শ্রেণীস্থ লোককেই লোক শৌখীন বলে। কিন্তু শৌথীন ন! 
বলিয়া শৌকীন বলিলেই ঠিক ব্যাকরণ-ছুরন্ত হয়। ইহাদের 
নাকটি বকফুলের কুঁড়ির মত টাকল, বাকাল, ঘোরাল। চোখ- 
গুলি ছোট ছোট, কুঁচের মত, যেন মিটি মিটি জলিতেছে। গাটি 
বেশ চোমরান ; মাথাটি বেশ আচড়ান ? সর্বদাই গাত্র পরিদ্কীর 
রাখিতে ব্যন্ত। প্রায়ই শিকলে বাধা! আছেন, তখন চাল 
ছোলা লইয়াই মনত; ন! হয়, মন্দিরের কোটরে, তখন দেব- 
দেবতার মাথায় নৃত্য করিতেছেন। চিরজীবন শিকলে বীধ। 
আছেন, কিন্ত আপনার কুটি ছাড়েন না; ছোলার খোসা ন 
ফেলিয়া খাইতে পারেন না; ছুধের সর একটু বাসী হইলে, 
অমনই সেই বাঁকা নাক আরও বাঁকাইয়া ববেন। ইহার নাম 
শৌকীন বা শৌখীন কুচি। 

যে বোল শিখাইয়া দিবে, শৌকীন বাবুরা, দেখিবে, তালে, 
বেতালে,_ সময়ে, অসময়ে, কেবল তাহাই কপ-চাইতেছেন। 


জস্ত-ংঙ্্া মানব । 5১৪৩ 





রাধাকুষ্খই বলুন, আর কালী-কল্পতরুরই নাম করুন, অথবা 
শিব-জগদগুরু বলিয়াই চীৎকার করুন,_দেব-দেবতার জ্ঞান 
ইহাদের সকল সময়েই সমান; দেব-দেবতার উপর ভক্তিও 
সেইরূপ ;_তক্তি করেন, ভাল বাদেন কেবল ফাড়টি আর 
ভাঁড়টি। সেই মিটি মিটি কুট কুটে চোঁথ ছুটি দিয়। ধানটি 
ছোঁলাটি অনবরতই পরীক্ষা করিতেছেন ; সেই বাঁকা ঠোঁট 
দিয়া “অপতা নির্বিশেষে” ছোলাগুলির খোসা ছাড়াইতেছেন ; 
আর নিকটে কেহ আসিলেই, সেই চক্ষতে একবার আড় চোখে 
দেখিয়া বলিতেছেন-_“রাধাকুষ্ণ” “রাধাকৃষ্ণ |” ইহাকফেই বলে, 
শৌকীন বা শৌখীন ভক্তি । 
ছেলে পিলে, কাছে গেলে, কঠোর ঠোকরে রক্তপাত 
করিতে শুকলাল বড় মজবৃত। শৌকীন বাবুর! বলেন, যে 
বালক বালিকার শাসনই গৃহ সংসারের সার ধর্ম) নিকটে 
গে পাইলেই ঠোৌঁকর দিবে । আঁর সবল লোঁকে ধরিলেই, 
ট্যা ট্যা করিয়া চীৎকার করিবে ; তথন রাঁজনীতিজ্ঞরা' বলেন, 
যে চীৎকারিই শৌকীন পলিটিক্স। শুকরাজ চিরজীবন শিকল 
' কাটিতেই নিধুক্ত ; পরিশ্রম প্রায়ই বৃথা হয়; কচিৎ যদি শিকল 
কাটা হইল, তাঁহা হইলে হয়ত নিজে তাঁহা বুকিতে পারেন নাঃ 
কর্ত। আদিয়! হাসিতে হাঁসিতে ধরিয়া ফেলিলেন, আর শিকলটি 
খুব মজবুত করিয়া দিলেন। আর না হয়ত, কাটা শিকল 
পায়ে বাঁধা একবার উড়িয়া গাঁছে বসিতেই, ভালে জড়ায় 
গেল। আবার ধরিয়। আনিল; অথবা অনাহারে মরিলেন ; 
কিন্বা শিকারীতে মারিয়া ফেলিল। পায়ে শিকল লাগান 
শোথীন শ্বাধীনতা৷ এই রূপই জালিবে। 


১৪৪ তরিধারা 





গুক-সংবাদের একটি পুরাণ গল্প মনে পড়িল। একজন 
জুয়াচোর একটি শুক পাখীকে একটি মাত্র বোল শিখাইয় 
বাজারে বিক্রয় করিতে লইয়! যায়। পাখীটি কেবল মাত্র বলিতে 
পারিত--“্তাহাতে সন্দেহ কি?” একজন ক্রয়ারথাঁ জিজ্ঞাসা 
করিল; “এই পাখীটির দাম কত হইবে?” বিক্রেতা বলিল, 
পপাচ শত টাক ; হয়, না হয়, পাখীকেই জিজ্ঞাসা করুন|” 
্রয়ার্থা বলিল, “কেমন, তৃতি। তোমার মূল্য অত হইবে কি ?” 
পাখী বলিল, “তাহাতে সন্দেহ কি?" লোকটি বিশ্মিত হইয়া, 
পাঁচশত টাকা দিয়াই পাখীটি বাড়ী লইয়া! গেল; তাহার পর 
বুঝিল, যে পাখীটি এ একটি মাত্র বোল জানে । তখন একই 
বোলে কাঁণ ঝালাঁপালা হইলে, পাখীর নিকটে দীড়াইয়। 
অর্ধস্কট স্বরে বলিল, “আমি কি নির্বোধ!" পাখী বলিল, 
“তাহাতে সন্দেহ কি?” ইহ! শুনিয়া পক্ষী-ক্রেতা যেমন 
কপালে ঘ1 মারিয়া হাস্য করিয়াছিল, আজি আমরাও সেইরূপ 
কপাঁলে ঘা মারিয়া, সেইরূপ হালিয়া বলিভেছি-__“আমর। এত 
টাকা দিয়া যে একটি মাত্র বোল কিনিতেছি, আমরা কি 
নির্বোধ!” ঞ& গুন চারিদিক হইতে শৌখীন ভায়ারা এক- 
জোটে বক্র ঠেঁটে বলিতেছেন,--“তাহাতে আর মনোহ কি?” 

এইরূপ কাক, পেচক, কু্ুট প্রভৃতি নান] জাতীয় পক্ষী- 
ধন্ধ্ণ মানব আছে। 


তত্র পশু-ধম্মী। 


পশুর রাত স্বরূপ গৃহ-পালিত বিড়াল গৃহীত হইল । 
বাঙ্গালায় বিড়াল-ধন্ব্ পুরুষ বিস্তর আছেন; তবে চতুষ্পদ 


জন্ত-ধন্মট মানব । ১৪৫ 





ও দ্বিপদ বিড়ালে একটু প্রভেদ আছে। চতুষ্পদের এলাকা, 
অধিকার, ও আবদীর,_-ভিতর বাড়ীতেই বেশী; আর দ্বিপদের 
দখল, দাবি, দৌরাম্মা--বহিব্ণটিতে অধিক! অন্তর বাঁটিতে 
দেখিবেন, একটু বেলা হইয়াছে, আর বিড়াল অমনই গৃহিণীর- 
গরোঁলমলে ঠেশ, দিয়া, খুরিয়। ফিরিয়া কেবলই তীহার পদ-যুগলের 
মধ্য দিয়! যাতায়াত করিতেছে ; আর বিনআ্ সলোম লাঙগ,ল 
মঞ্চালনে তাহার পদ-সেবা করিতেছে। বাহিরে দেখিবেন» 
কর্তার দক্ষিণে বামে দুই জন পুরুষ-মীর্জার বপিয়! আছেন; 
একজনের হস্তে “বঙ্গবাঁপী' ; তিনি মধ্যে মধ্যে কর্তার চুলকণা 
গুলি খুঁটিয়া দিতেছেন। চক্রবত্তর উহাতে বড় আমোদ হয়। 
অপর দিকে পাঁল মহাশয় স্বয়ং পাখার বাতাস খাইতেছেন বটে 
কিন্তু দূতীর গুণে বীজনী কর্তার দিকেই অভিনারিকা। গৃহস্থ 
রোমশের লাঙ্গল-সেবাঁর, আর বহিস্থে চক্রবর্তীর টুলকানি 
খু'টিতে স্পৃহার, এবং পাল মহাঁণয়ের পাখার ভঙ্গির--একই 
কারণ ।--নময়ে_ কীটাটা, ও' ডাটা » মীছটা, যুড়াট!। 
বিড়াল বড় বাস্ত-প্রিয়। বাস্ততে বন্ত থাকিলে বিড়াঈ 
" কখন তাহা ছাঁড়িতে বা ভুলিতে পারে না । থোলের ভিতর 
পুরে, নান! লাঞ্ছনা করে, উড়ে মালীর মাথায় দিয়া, (বিড়াল 
কাল তাহার মাছ থাইয়াছিল, তাই তাহার এত ত্যাগন্বীকার ) 
_ বিড়ালকে গ্রামান্তর করিয় দিয়া আইস; একদিন পরে দেখিবে 
বিড়াল শুষ্ক মুখে, কুক্ষ দেহে, একটু ভয়ে, একটু আহ্লাদে, অর্ধ 
নিমীলিত চক্ষে অন্তর বাটির গৌঁজলা দিয়া মুখ বাড়াইতেছে। 
এদিকেও দেখ, চক্রবর্ীকে শত গঞ্জনা দিয়া, নবীন বাবুর সঙ্গে 
গ্রাড়ীতে চাপাইয়া, বেহারে কণ্টাকটের কার্ধ্য করিতে দেশাস্ত+ 


১৩ 


5৪৬ ত্রিধার' 





রিত কর! গেল ; দশ দিন পরে দেখবে চক্রবর্তী, তেমনই শু 
মুখে, রুক্ষ দেহে, বৈটকখানাঁয় উ*কি মারিতেছেন। বলেন, 
পপটোল 'নাই, উচ্ছে নাই_কেবল কীকুড়, রাজিদিন পেট 
গড়. গড়, করে, সেখানে কি থাকা যায়?” 

বিড়াল বড় বৌচা। স্বণা পিত নাই বলিলেই হয় । খোকার 
ছধের বাটিতে মুখ দিয়াছিল বলিয়া, এই মাত্র গৃহিণী তাহার 
সেই ছুর্জয়-দমন পাকান বালার বাঘযুখো খোঁব্না দিয়া তাহার 
ধোৌতামুখ ভৌতা করিয়া দিয়াছেন; কিন্তু আবার এঁ দেখ-- 
এখনই ফিরিয়া আসিয়াছে; স্কলের ছেলেদের পাতের পার্থ 
জানু গাড়িয়া বসিয়া আছে। চক্রবত্র/ বরফ খাইয়াছিলেন 
বলিয়া, কর্তা কি লাঞ্ুনাই না করেন! সকলেই মনে করিয়া- 
ছিল, ত্রাক্গণ আর দশ দিন এ মুখে হবে না,_-ত1 কৈ? সন্ধ্যার 
পর বেই সমানে আসিয়। কর্তার পার্থে তেমনই জলযোগ হইল । 
আহা পেটের দায়ে যাহার] এত নির্বণ তাহারা চতুষ্পদই হউক, 
আর দ্বিপদই হউক, কে তাহাদের উপর দয়! না করিবে বল? 
_ বিড়াল বড় আয়েপী। খাওয়া আর শোয়া-ঞ্জই দুইটাই 
তাহার জীবনের প্রধান কর্্ন। যেটুকু বসিয়া থাকা-_তাহা 
হয়, কেবল খাবার প্রত্যাশায় বা উমেদারীতে ; না হয় আঁচাই- 
বার জন্ত। অন্তঃপুরে দেখিবে, এই গ্রীশ্মের দিনে, বিড়াল 
নীচে তলার নিভৃত ঠাণ্ডা মেজেতে পড়িয়া অকাতরে নিদ্র। 
ধাইতেছে ; বহির্বাটিতে দেখিবে, পাল মহাশয় নীচের বৈটক- 
খানার পাশের ঘরে, পাটি বিছাইয়। নাসিকী-ধ্বনি করিতে- 
ছেন। শীতকালে দেখিবে, অস্তঃপুরে আথছায়া আধরৌক্ডে 
শুইয়া বিড়াল লেজ নাড়িতেছে; বহির্বাটিতে পাল মহাশয় 


জন্ত-ধন্মী মানব । ১৪৭ 





রৌদ্রে পীঠ দিয়া, তামাকুর অস্ত্েষ্টি করিতেছেন । হা গেট! 
তোমার দায়ে এ হেন বিলাসীকেও ইন্দুরের বিবর পার্থে ওত. 
করিয়া বিয়া খাকিতে হয়! তোমার দায়ে পাল মহাশয়কেও 
পাক করিতে দেখিয়াছি! 

বিড়াল ভও-তপন্বী। রান্নাঘরের বারান্দার কোণে চক্ষু 
মুদিয়া বনিয়। চতুষ্পদ বিড়াল কিসের ধ্যান করে, তা কি তোমরা 
জান না? না, কর্তার জল খাবারের ঘরে গিয়া সন্ধ্যার সময় 
চক্রবর্ভা মহাশয় কিসের আহিক করেন, তাহা তোমরা বুঝ না? 
তোমরা! জানও নব, বুঝও সব; কেবল জাতীয় অহস্কারের 
বশব্ণ হইয়াই না, দ্বিপদে ও চতুষ্পদে প্রভেদ কর। বাস্তবিক 
পাল চক্রবর্তীর সহিত পুবি, মেনীর কোন প্রকৃতিগত প্রতেদ 
আছে কি? 

এইরূপ ছাগ, মেষ, শূন, গব প্রভৃতি নানাবিধ-গৃহ-পালিত 
পশজাতীয় মানব বঙদেশে যত্র তত্র দেখিতে পাওয়া যায়। 
পুতিগন্ধময় পদ্ব-পলৃল-প্রির পুরুষ-শৃকরেরও অভাব নাই; 
নীলীভাঙে গতিত পুরুষ-শৃগালও মধ্যে মধ্যে দেখা যায়। 
এমন ঝিছীতর বিস্তীর্ণ চিড়িয়াখানায় ছুই একটি সিংহ শারদ, লও 


আছে। 
- তত্র সর্প-ধন্মী। 
সর্প-স্বভাব মানবেরও অভাব নাই। একহারা, লিক লিকে 
ছিপূ ছিপে চেহারা; মে শরীর যেন কিছুতেই ভাঙ্গেও না, 
মচ্কায়ও না। গায়ের চামড়া-_পাতলা, চিকণ ও মস্ণ, অথচ 
চাকা চাঁক। দাদে ভরা; হাতের পায়ের নলি সরু নক; অত 
কখন ভর! থাকে না ঃ-_চিরদিনই পাত খোলার মত পড়িয়াই 


5১৪৮ ত্রিধারা। 





আছে; চলিবে,-আকা) ফঈীড়াইবে--ঘাড় বাকাইয়া ; কথা 
কহ্িবে অতি ক্ষীণস্বরে? হাসিবে - একদিকে, এক পাশে একটু 
খানি; আর.যখন চাহিবে--তাহার সেই চাহনীতেই তাহার 
খলম্বভাবের পূর্ণ প্রতিভাত হইবে | সেই তীব্র, তীক্ষ, 
বক্রগতি বিষ-বিছ্যুত্তের চাহুনীতেই বুঝা যায়,সে তাহার অন্তরের 
অন্তর হইতে কণামাত্র বিষ উদশীরণ করিয়া, তোমার অন্তরে 
অমৃত, গরল, যাহাই থাকুক সে সেই বিষ তোমার অন্তরে ইঞ্জে্ট 
করিয়া, তোঁমার পরীক্ষা করিবে । তুমি সংসারের নুতন ব্রতী, 
সেই বিষে তোমার শিরা সকল সড়.সড়, করিবে, মাথায় সৃছ 
বিম্কিনি আনিবে; দেই বিষচক্ষ তোমার অমৃতময় বলিয়া 
বোধ হইবে, খলের পীরিতি তখন তোমার কাছে সরলের প্রণক্ন 
বলিয়া মনে হইবে। আ'র তুমি সংসারের ঘাগী, ষাত হাটের 
কাণাকড়ি,--সর্পধন্ষ্ণ মানবের এরূপ বিষ-পিচকারী তোমার 
উপর কতবার হইয়াছে; তুমি ভূক্তভোগী ; সেই পরিচিত্ত 
দৃষ্টিতে তুমি মনে মনে হাগিবে, মনে মনে বলিবে, 'দাঁদা উহাতে 
আর আমাদের কিছু হয় না,বছদিন হইল, আমর! উহার কাটান 
ওথধ (৪00130$০) খাইয়া! আপ্তসার করিয়া রাখিয়াছি। 

খলন্বভাব মানব কখন রাজপথের মধ্য দিয়! চলিতে পারে 
না। খ অলিতে গলিতে ; আশে পাশে ; আনাচে কানাচে । 
সন্ধ্যার পর ইহাদের নখের বিহার, ও সুখের বিচরণ। বিষ- 
বাস্ুতক্ষণেই ইহাদের শরীরের পুর এবং হৃদয়ের ্কু্তি। 
.েখানে কুৎসা, নিন্দা, কলহ, ঘ্োষাদ্বেষি, রীষারীষি, সেইখানেই 
বিষজীবন কোণে বসিয়! মুচকি মুচকি হাসিতেছে ; আর মধ্যে 
মধ্যে মহানন্দে ছিন্ন জিদ্বা চুক্চুক করিতেছে। কিন্তু এক 


জন্ব-ধন্মী মানব । ১৪৯ 


স্থানে কখনই ছুই দণ্ড স্থির থাকিতে পারিবে না। স্মুড়ি নুড়ি, 
গুড়ি গুড়ি আসিয়া বদিবে, আর একটু পরেই তেমনই স্থৃড়ি 
শ্থৃড়ি অলক্ষিত ভাবে চলিয়া যাইবে । পথে হাওয়া খাওয়া-_ 
তাঁও তন্রপ | পথের ধারে ধারে, প্রাচীরের পাশে পাশে চলিবে। 
কোথাও গান বাজনা হইতেছে, সেইখানে একবার থমৃকিয়া 
্রাড়াইবে, একবার জানাল! দিয়া উকি মারিবে, একবার গায়- 
কের প্রতি সেই তীব্রদৃষ্টি নি:ক্ষেপ করিবে, সতাস্থ কাহারও 
সহিত চোথে চোখে হইলে অমনই 0০০0. 79017) ৪0৪ 1 
বলিয়া রিয়া পড়িবে । খল কখন মজলিসি হয় না। আবার, 
কোথাও দীন ছুঃখী দিনাস্তে ছুটি অন্ন প্রস্তত করিয়া আহার 
করিবার উদ্যোগ করিতেছে। সেই সময় সর্পধর্মথা গিয়া! তাহাকে 
জিজ্ঞাসা করিবে "ছুখী-রাম তোমার বড় মেয়ে মরেছে-+সে 
আজ কতদিন হে?” প্রশ্নকারির উত্তরের কোন প্রয়োজন 
নাই। কিন্তু ছুখীরামের অর্থ অন্ন উদরস্থ হইল না। খলের 
চরিত্র এইরূপ। 

বলিহারি, বাইবেলের কবিকে । সয়তানকে সর্পধন্ম্ণ করিয়া 
সংসারের কি গুহ কথাই কবিত্বে প্রকাশ করিয়াছেন? খলই 
সয়তান। চোর, লম্পট, মিথ্যুক, ঘাতৃক,_সংসারে শতবিধ 
পাপী আছে; কিন্ত খলকে পাপী বলিলে হয় না, মহাপাপী বলি- 
লেও কুলায় না । খল--সয়তান। যে পাপ করে, নেই পাপী, 
আর যে পাপ হয়, তাহাকে কি পাপী বলিলে বুঝা যায়? সে 
সয়তান। তোমার ভাল দেখিয়! খল ব্যক্তি যে সকল সময়েই 
তোমার মন্দ করিবে, এমন কথা নাই ও কিছুই করিবে নাঃ 
পাপের বাহিক কার্ধ্য কিছুই করিবে ন1; কিন্তু সে নিজে আপ- 


৯৫০. _. জিধারা 


নাকে আঁপনি পাপে পরিণত করিবে ; পাপের দহনে আপনি 
দগ্ধ হইতে থাঁকিবে ; খলের জীবনই এইরূপ । 
বাইবেলের কবির বর্ণনা এইবূপ,-_যে সয়তান বিশ্ববিধাতার 
বিরোধী । সে আভা সহিতে পারে মা, শোভা দেখিতে পারে 
না, কোথাও সুখ দেখিলে তাহার কষ্ট হয়। কাজেই সয়তান, 
এই অনন্ত অভ্র স্ুখ-প্রত্রবণ সংসারের বিধাতার বিরোধী ॥ 
কিন্ত বিরোধী হইয়া কি করিবে ! সেত তাহার মহামহিম। স্পর্শ 
করিতে পারে না, স্ৃতরাঁং সয়তান অষ্টার উপর আক্রোশ করিয়া 
হ্ট্ির সার মানবের অধঃপতন সাধন করিল; তোমার চতু- 
স্পার্শস্থ ছোটখাট সয়তানের৷ অদ্যাপি দেখ, তাহাই করিতেছে । 
ভোমার কিছু করিতে ন| পারিলেই, তোমার কৃতিত্ব ন্ট করিতে 
ব্যগ্। 
বিধাতার বিচিত্র রহস্যময় সংসারে সর্পধন্ব্ণর সবত্রই গণ্ি- 
বিধি । কোন্‌ স্থান দিয়া তোমার নন্দনকাননে সে আসা যাওয়া 
করে, তাহার তুমি কিছুই জান না। তাহার পর তোমার 
সরল সহধর্শিণীকে ভুলাইয়! নে যখন তোমার সর্বনাশ সাধন 
র&তখনই তোঁমার চমক হয় ও টনক নড়ে । তোমার অধঃ- 
পতনেই সর্পধন্ম্র অভীষ্ট সিদ্ধি এবং পরম আহ্লাদ । এই যে 
রঙে কুট্ফুটে, চোখে ফুট্ছুটে, চেহারায় ছিপ্ছিপে, মেজাজে 
ভিজে ভিজে-_মন্থরা দাসী, সন্ধ্যার সময় তোমার গৃহে শষ্য! 
করিতে: গিয়া! তোমার সরলা সহধর্ষিণীর কাছে ধাড়াইয়৷ ফিনি 
ফিসি প্রত্যহ কি কথা বলে,_-উহাকে তুমি কখন বিশ্বাস করিও 
না। সর্পধর্শিণিদের মত অমন ঘর ভাঙ্গানি আর নাই। সোণীর 
সংসার ছারখার করিয়াই উহাদের আনন্দ); যত শী 





জন্ত-ধর্ম্ মানব । ১৫১ 


৯০৯ 


পার, তোমার নন্দনকানন হইতে এ সয়তান সর্পিহীকে দুর 
করিবে। 

সর্প স্যায়, গোঁধা, গিরগিটে, ইন্দর, ছুচুদরী প্রভৃতি 
নানারূপ সরীস্থপধন্থাঁ মানব আছে। | 

ভূমি নিজে যদি মানবধন্ব্ণ মানব হও, তাহ! হইলে এই 
অপূর্বব চিড়িয়াখানা তোমার আনন্দের উপবন। উহার বৈচি- 
ত্র্যেই তোমার আনন্দ হইবে। টিয়াকে ছুটি ছোলা, ময়নাকে 
একটু ছাতু, বুলবুলিকে একটি তেলাকুচ-_বিড়ালকে একখানি 
কীটা, কুকুরকে একটু হাড়, হরিণকে ছুটি ঘাস-_দিতে পারিলেই 
আরও আনন্দ”_-আরও মজ|। যথাসাধ্য সকলকেই পালন 
করিবে; ভবের চিড়িয়াখানায় অমন মজ! আর কিছুতে নাই-- 
তবে বাইবেলের কবির উপদেশ কখন ভুলিও না দুধ দিয়া 
কথন কালসাপ পুধিও না। খলকে কথন প্রশ্রয় দিও না। 
সর্পধন্থীর উপর অভিসম্পাত ম্মরণ করিয়া, তুমি তাহাকে 
পদাঘাতে দুর করিও। 





০5848 
নিন € 





বিজ্ঞাপন। 
চন্্রনাথ বাবুর নিয়লিখিত পুস্তকগুলি আমার নিকট 
প্রাপ্তব্য- 
শকৃত্তলাতত্ব ( দ্বিতীয় সংস্করণ ) রঃ ১ সি 


ফুল ও ফল ৯৯৫ ৮5 ৪5 ও 
পতি বান (দিয় মর) ** ৮05 


গার্স্থযগাঠ (তৃতীয় মংস্করণ) . *, ৮০10 
গার্হস্থ্য স্বাস্থ্যবিধি (দ্বিতীয় সংস্করণ ) .. ৫ %০ 


প্রথম নীতিপুস্তক | যন্তস্থ ) 

ত্রিধারা ৫ 5 ৮১৭ 

হিন্দু বা হিলূর প্রকৃত ইতিহাস (মনত) ৭ * 
শরীগুরুদাঁদ চট্টোপাধ্যায়, 


২০১, কর্ণওয়ালিস গ্রীট।